দশ দিন পরই বাজবে রাশিয়া বিশ্বকাপের বাঁশি। ২০টি বিশ্বকাপ পেরিয়ে এসেছে ফুটবল মহাযজ্ঞের যাত্রাপথ। প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল উরুগুয়ে। আগের আসরগুলোর পরতে পরতে ঠাসা রোমাঞ্চকর নানা গল্প। চ্যানেল আই অনলাইনের পাঠকদের ধারাবাহিকভাবে ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে ইতিহাসের ধূলিজমা সেসব পাতায়। আজ থাকছে সাউথ আফ্রিকা বিশ্বকাপ ২০১০’র কথা-
বল ঘুরছে পায়ে পায়ে, এক-এক ছোঁয়ার ছন্দে। ১০ জন ‘শিল্পী’ ছুটছেন, সমান্তরাল দূরত্বে, সবুজ ঘাসের ক্যানভাসে। ২০১০ বিশ্বকাপের কথা উঠলেই সামনে আসে এই ছবিটি। ওয়ান-টু-ওয়ান ফুটবল কত সহজে, কত শৈল্পিক উপায়ে খেলা যায় চ্যাম্পিয়ন স্পেন সেটি বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে যায়, টিকিটাকার শিহরণে।
বিশ্বকাপের আদ্যোপান্ত
আফ্রিকান দেশগুলোর ভেতর থেকে প্রথম দেশ হিসেবে ২০১০ সালে বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পায় সাউথ আফ্রিকা। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপ জেতার পর বাকি বিশ্বকাপগুলো গেছে আগে কোনো না কোনো সময়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়া দেশে। সাউথ আফ্রিকা বিশ্বকাপে এসে নতুন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্প্যানিশদের পায় ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর।
সাউথ আফ্রিকা এই আসরের আয়োজক দেশ হওয়ার পর অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। কারণ সেই সময় দেশটির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অতটা ভালো ছিল না। শেষ পর্যন্ত তারা সফল বিশ্বকাপ আয়োজন করে নিজেদের ‘যোগ্যতা’র প্রমাণ রাখে। স্পেন বনাম নেদারল্যান্ডস ফাইনাল দেখতে মাঠে চলে আসেন কিংবদন্তি নেলসন ম্যান্ডেলা।
ফিরে দেখা: বিশ্বকাপ-১৯৩০, বিশ্বকাপ-১৯৩৪, বিশ্বকাপ-১৯৩৮, বিশ্বকাপ-১৯৫০, বিশ্বকাপ-১৯৫৪,
বিশ্বকাপ-১৯৫৮, বিশ্বকাপ-১৯৬২, বিশ্বকাপ-১৯৬৬, বিশ্বকাপ ১৯৭০, বিশ্বকাপ-১৯৭৪,
বিশ্বকাপ-১৯৭৮, বিশ্বকাপ-১৯৮২, বিশ্বকাপ-১৯৮৬, বিশ্বকাপ-১৯৯০, বিশ্বকাপ-১৯৯৪, বিশ্বকাপ-১৯৯৮, বিশ্বকাপ-২০০২, বিশ্বকাপ-২০০৬

২০০৮ সালে স্পেন ইউরো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকেই বিশ্বকাপ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকে। বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত এক প্রকার অপ্রতিরোধ্য ছিল দলটি। ২০০৬ সাল থেকে ৫৪ ম্যাচের ৪৯টিতে জয় আর মাত্র দুটিতে হার নিয়ে সাউথ আফ্রিকা পাড়ি দেয় তারা।
কিন্তু অবাক করার বিষয় হল এই স্পেন বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই অঘটনের শিকার হয়। সুইজারল্যান্ড তাদের ১-০ গোলে হারিয়ে দেয়। টুর্নামেন্ট শেষে স্পেন প্রমাণ করে ‘সকাল সব সময় সারাদিনের পূর্বাভাস দেয় না!’ ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে নিজেদের প্রথম ম্যাচ হেরেও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় ইনিয়েস্তারা।
ইতালি, ফ্রান্সের দ্রুত বিদায়
ওই সময়ের ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ইতালি এবং রানার্সআপ ফ্রান্স প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয়। উভয় দলই কোনো ম্যাচ জিততে ব্যর্থ হয়।
কোয়ার্টারে ইউরোপের রাজত্ব
কোয়ার্টার ফাইনালে ইউরোপের দলগুলো একচেটিয়া রাজত্ব করে। জার্মানি বিদায় করে আর্জেন্টিনাকে। স্পেন বিদায় করে প্যারাগুয়েকে। নেদারল্যান্ডস পিছিয়ে থেকেও ব্রাজিলকে হারিয়ে দেয়। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে শুধু ঘানা উঠে আসে সেমিতে। তারা হারায় উরুগুয়েকে। শেষ পর্যন্ত ফাইনালে উঠে আসে স্পেন আর নেদারল্যান্ডস।

যেমন ছিল ফাইনাল
একজন ক্রীড়াপ্রেমীর কাছে এই বিশ্বকাপের ফাইনাল অতটা যুতসই ছিল না। ইংরেজ রেফারি হুয়ার্ড ওয়েব রেকর্ড ১৪ বার হলুদ কার্ড বের করেন! অতিরিক্ত সময়ে ডাচ ডিফেন্ডার জন হেইটিঙ্গাকে মাঠের বাইরে চলে যেতে হয়। স্প্যানিশরা এদিনও সেই টিকিটাকার উপর ভরসা করে এগুতে থাকে। কিন্তু কিছুতেই গোলের দেখা মিলছিল না। এক সময় মনে হচ্ছিল ম্যাচ পেনাল্টি শুটআউটে গড়াবে। এই ভাবনার মাঝে চলে আসে সেই ১০৯তম মিনিট। হেইটিঙ্গা ইনিয়েস্তাকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদকার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। সাত মিনিট বাদে ডাচদের নিস্তব্ধ করে দিয়ে ফ্যাব্রেগাসের পাস থেকে ম্যাচের একমাত্র গোলটি করেন ইনিয়েস্তা।
ধারাবাহিক স্পেন
এই বিশ্বকাপে স্পেন এক অভূতপূর্ব নজির রেখে যায়। নকআউট পর্বের চারটি ম্যাচ-দ্বিতীয় রাউন্ড, কোয়ার্টারফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল ১-০ গোলে জয়লাভ করে।

স্বাগতিকদের দুঃখ
স্বাগতিক সাউথ আফ্রিকা গ্রুপ ‘এ’ পর্বে মেক্সিকো এবং উরুগুয়ের নিচে অর্থাৎ তৃতীয় স্থানে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করে। ইতিহাসের প্রথম স্বাগতিক দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকে বাদ পড়ার কষ্ট পেতে হয় তাদের।
আসরে ফিরে আসা
নর্থ কোরিয়া ১৯৬৬ সালের পর এই বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়। হন্ডুরাস এবং নিউজিল্যান্ড খেলতে আসে ১৯৮২ সালের পর। আলজেরিয়া ফিরে আসে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের পর।
ভুভুজেলার আবির্ভাব
২০১০ বিশ্বকাপে আয়োজকরা ভুভুজেলা নামক এক বাঁশি নিয়ে বিপাকে পড়েন। ম্যাচের সময় বাঁশির বিকট শব্দে খেলোয়াড়দের সমস্যা দেখা দেয়। বেশ কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলও আপত্তি জানায়।
ভাইদের বিশ্বকাপ
এই বিশ্বকাপে হন্ডুরাস দলে একসঙ্গে তিন ভাই খেলে নজির সৃষ্টি করেন। তারা হলেন জেরি, জনি এবং উইসলন প্যালাসিওস।
প্রথম রাউন্ডে জার্মানি-ঘানা ম্যাচে দুই ভাই দুই দলে খেলে আরেক নজির সৃষ্টি করেন। জার্মানির হয়ে খেলেন জেরম বোয়াটেং। ঘানার হয়ে মাঠে নামেন কেভিন প্রিন্স বোয়াটেং।
আর যা আলোচিত
এই আসরে একমাত্র অপরাজিত দল ছিল নিউজিল্যান্ড। তিনটি ম্যাচ ড্র করে প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নেয় তারা। ইউরোপের ১৩ দেশের মধ্যে মাত্র ছয়টি দেশ দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলতে যায়। ১৯৮৬ সালের পর এই প্রথম এত কম সংখ্যক টিম শেষ ষোলোর টিকিট পায়।

টুর্নামেন্ট শুরুর প্রথম সপ্তাহে মাঠকর্মীরা বেতনভাতা বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনে গেলে দারুণ সমস্যায় পড়ে আয়োজকরা। সেই সময় পুলিশ দিয়ে কাজ সারতে হয়। পরে কর্মীরা কাজে যোগ দেন। কৃষ্ণবর্ণের আফ্রিকানদের উপস্থিতি মাঠে খুব একটা দেখা যায়নি। টিকিটের বেশি দামের কারণে অনেকেই খেলা দেখতে পারেননি। বিষয়টি নিয়ে সাউথ আফ্রিকায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ফাইনালে গোল করে জার্সি খুলে উদযাপন করেন। ইনিয়েস্তাকে সাধারণত এভাবে উদযাপন করতে দেখা যায় না। পরে জানা যায় তার অমন উদযাপনের কারণ। ২০০৯ সালের গ্রীষ্মে হার্টঅ্যাটাকে মারা যান এসপানিওলের অধিনায়ক ড্যানি জারকিউ। তার সম্মানে বুকে কিছু একটা লিখে আনেন ইনিয়েস্তা। সেটা দেখাতেই তিনি জার্সি খুলে উদযাপনে মাতেন।
এক নজরে ২০১০ বিশ্বকাপ
চ্যাম্পিয়ন: স্পেন, রানার্সআপ: নেদারল্যান্ডস। সেরা খেলোয়াড়: ডিয়েগো ফোরলান (উরুগুয়ে)। গোল্ডেন বুট: টমাস মুলার (জার্মানি)। সেরা তরুণ ফুটবলার: টমাস মুলার (জার্মানি)। সেরা গোলরক্ষক: ইকার ক্যাসিয়াস (স্পেন)। ফেয়ার প্লে পুরস্কার: স্পেন। দলগতভাবে সর্বোচ্চ গোল: জার্মানি (১৬)। একটিও গোল করেনি: হন্ডুরাস, আলজেরিয়া। দলগতভাবে সবচেয়ে বেশি গোল হজম করে উত্তর কোরিয়া (১২টি)। ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ গোল: টমাস মুলার, ডেভিড ভিয়া, ওয়েসলি স্নাইডার, ডিয়েগো ফোরলান (প্রত্যেকে পাঁচটি করে)। মোট গোল: ১৪৫টি। মোট হলুদ কার্ড: ২৪৬টি। মোট লাল কার্ড: ১৭টি।







