আর্লিং হালান্ড: মাঠে দানব, বাইরে শান্ত-মিষ্টি বালক

বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচের সময় খেলোয়াড়রা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, ফুটবল মাঠে উত্তেজনা ও স্পোর্টস মনোভাব ফুটে উঠেছে।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ
মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামের দিকে এখন গোটা ফুটবল দুনিয়া তাকিয়ে। আর একটা কথা বারবার মনে পড়ে। যে ছেলেটা মাঠে নামলে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ঘুম উড়ে যায়, সেই একই ছেলে আগের রাতে হয়তো স্ন্যাপচ্যাটে শ্রেকের ফিল্টার লাগিয়ে নিজের নাক দেখাচ্ছিল।
আর্লিং হালান্ড ঠিক এখানেই আলাদা। একদিকে গোলমেশিন, আরেকদিকে ইন্টারনেটের সবচেয়ে আদুরে মজার মানুষ।
ব্রাজিলের স্বপ্ন যেদিন থামল
আর্লিং হালান্ড বাংলাদেশের অনেক মানুষের বুক ভেঙে দিয়েছে।
রাউন্ড অব সিক্সটিনে নরওয়ে বনাম ব্রাজিল। খাতা-কলমে অসম লড়াই। কিন্তু মাঠে নেমে হালান্ড দুইবার ব্রাজিলের জালে বল পাঠালেন, আর ২-১ গোলে হেরে ব্রাজিল বিদায় নিল বিশ্বকাপ থেকে।
উয়েফা ডটকমের খবর অনুযায়ী, এই জয়ে নরওয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে, যা দেশটার ইতিহাসে আগে কখনো হয়নি।
ব্রাইনের সেই ছেলেটা
নরওয়ের এক ছোট্ট শহরে, নাম ব্রাইন। হালান্ডকে বুঝতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে স্তাভাঙ্গার থেকে ৩২ কিলোমিটার দক্ষিণে, লম্বা শীতে ঢাকা এক শহর।
আর্লিংয়ের জন্ম অবশ্য নরওয়েতে নয়, ইংল্যান্ডের লিডসে, ২০০০ সালের ২১ জুলাই। উইকিপিডিয়ার তথ্য বলছে, তখন তার বাবা আল্ফ-ইঙ্গে হালান্ড খেলতেন লিডস ইউনাইটেডে। তিন বছর বয়সে পরিবার ফিরে আসে ব্রাইনে, আর সেখানেই ফুটবলের সঙ্গে ছেলেটার প্রথম বন্ধুত্ব।
বাবা আল্ফি হালান্ড নিজেও কম বড় নাম ছিলেন না। নটিংহাম ফরেস্ট, লিডস, ম্যানচেস্টার সিটিতে খেলেছেন, আর ১৯৯৪ বিশ্বকাপে নরওয়ের হয়ে মাঠেও নেমেছিলেন। মজার ব্যাপার, সেই ১৯৯৪ বিশ্বকাপও হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। ইএসপিএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আর্লিং বলেছিলেন, বাবা যে দেশে বিশ্বকাপ খেলেছিলেন সেখানেই তার প্রথম বিশ্বকাপ, এটা তার কাছে আলাদা এক ব্যাপার।
কিন্তু এই গল্পে একটা কষ্টের জায়গা আছে। থেসেলিব্রিটিফ্যামিলি ডটকমের খবর মনে করিয়ে দেয়, ২০০১ সালে রয় কিনের এক প্রতিশোধের ট্যাকল কার্যত শেষ করে দেয় আল্ফির ক্যারিয়ার। আর্লিংয়ের বয়স তখন মাত্র আট মাস। মানে ছেলেটা বাবাকে কখনো খেলতে দেখেইনি। বাবাকে সে চিনেছে অন্যভাবে, নিজের এজেন্ট হিসেবে, উপদেষ্টা হিসেবে, ক্যারিয়ারের প্রতিটা বড় সিদ্ধান্তের মানুষ হিসেবে।
মা গ্রি মারিতা ব্রাউতও সাধারণ কেউ ছিলেন না। নব্বইয়ের দশকে তিনি ছিলেন নরওয়ের হেপ্টাথলন চ্যাম্পিয়ন, পরে শিক্ষকতা করেছেন।
এই বিশ্বকাপে হালান্ড জার্সির পিঠে লিখিয়েছেন ‘ব্রাউত হালান্ড’, মায়ের পদবিটাও যেন সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামছেন।
ঘরের মানুষ হালান্ড
মাঠের বাইরে হালান্ডের ব্যক্তিগত জীবনটা বেশ ঘরোয়া আর নিরিবিলি। তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী ইসাবেল হাউগসেং ইয়োহানসেন।
ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, ইসাবেলও ব্রাইনের মেয়ে, নিজেও ছিলেন ফুটবলার। কিশোর বয়সে দুজনের পরিচয়, সেই থেকে একসঙ্গে পথচলা। তারা এখনো বিয়ে করেননি, তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তাদের ঘরে আসে প্রথম সন্তান, এক ছেলে।
সম্পর্কটা নিয়ে দুজনেই বেশ চুপচাপ, প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করেন। ইসাবেল খুব কমই সাক্ষাৎকার দেন।
হালান্ডের বড় ভাই আস্তর পড়ছেন ফিনান্স নিয়ে, বড় বোন গাব্রিয়েল কাজ করেন চিকিৎসা পেশায়। মোটের ওপর একটা খেলাপাগল পরিবার, যেখানে প্রচারের চেয়ে নিজেদের ভেতরের বন্ধনটাই বড়।
ক্লাবের গোলমেশিন
জাতীয় দলের আগে হালান্ড কিন্তু ক্লাব ফুটবলেই বনে গেছেন এক আতঙ্কের নাম।
শুরুটা ব্রাইন আর মোলদেতে। এরপর ২০১৯ সালে রেড বুল সালজবুর্গ, যেখানে জেতেন অস্ট্রিয়ান লিগ আর কাপ। ২০২০ সালে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড, সেখানে ২০২১ সালে জেতেন জার্মান কাপ। তারপর ২০২২ সালে ৬ কোটি ইউরোতে ম্যানচেস্টার সিটিতে, আর প্রথম মৌসুমেই জিতে নেন প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ আর চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রেবল।
সংখ্যাগুলো রীতিমতো অবিশ্বাস্য। উইকিপিডিয়ার তথ্য বলছে, প্রথম মৌসুমেই তিনি প্রিমিয়ার লিগে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ৩৬ গোলের রেকর্ড গড়েন, আর সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে সেই মৌসুমে করেন ৫২ গোল। প্রিমিয়ার লিগের দ্রুততম ১০০ গোলের রেকর্ডও তার, ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর ফুলহ্যামের বিপক্ষে মাত্র ১১১ ম্যাচেই তিনি এই মাইলফলক ছোঁন, যেখানে অ্যালান শিয়ারারের লেগেছিল ১২৪ ম্যাচ।
ইয়াহু স্পোর্টসের হিসাব অনুযায়ী, সিটির হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তার গোল ১৫০ ছাড়িয়েছে, আর প্রিমিয়ার লিগে ১২৬ ম্যাচে গোল ১০৭টা। এমনকি ২০২৫ সালের জুনে জুভেন্টাসের বিপক্ষে ক্লাব বিশ্বকাপে তিনি ছুঁয়ে ফেলেন ক্যারিয়ারের ৩০০তম গোল, একুশ শতকে যা এমবাপের পরেই সবচেয়ে কম বয়সে।
চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমেও থামেননি। ফুটিস্ট্যাটসের তথ্য অনুযায়ী, এই মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ৩৫ ম্যাচে তার গোল ২৭টা, দলের সর্বোচ্চ। ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তা নেই, কারণ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি সিটির সঙ্গে চুক্তি বাড়িয়েছেন একেবারে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত।
২৮ বছরের অপেক্ষা, তারপর
নরওয়ে সর্বশেষ বিশ্বকাপ খেলেছিল ১৯৯৮ সালে। এক প্রজন্ম বড় হয়ে গেছে নিজের দেশকে বিশ্বকাপে না দেখে। হালান্ড নিজেও এর বাইরে ছিলেন না। ২০১৯ সালে অভিষেকের পর ইউরো ২০২০, কাতার বিশ্বকাপ, ইউরো ২০২৪, একের পর এক টুর্নামেন্টে নরওয়ে বাছাইপর্বেই আটকে গেছে।
এবার গল্পটা উল্টে গেল। উয়েফা বাছাইয়ে নরওয়ে আটটা ম্যাচ খেলে আটটাতেই জিতেছে, ৩৭ গোল করেছে, খেয়েছে মোটে পাঁচটা। ফুটআফ্রিকা ডটকমের খবর জানাচ্ছে, ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর সান সিরোতে ইতালিকে ৪-১ গোলে হারিয়ে নরওয়ে টিকিট নিশ্চিত করে, যে ম্যাচে হালান্ড জোড়া গোল করেন। বাছাইপর্বে তার গোল ১৬টা, ইউরোপে যা আর সবার চেয়ে দ্বিগুণ।
মূল পর্বেও দাপট থামেনি। গ্রুপ পর্বে ইরাক আর সেনেগালকে হারানোর পর ফ্রান্সের কাছে ৪-১ গোলে হারে নরওয়ে, তবে সেই ম্যাচে হালান্ডকে বিশ্রামে রাখা হয়েছিল। ফক্স স্পোর্টসের খবর অনুযায়ী, সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে হালান্ড নরওয়েকে নকআউটে তোলেন, আর ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম দেশটা গ্রুপ পর্ব পার হয়।
রাউন্ড অব থার্টি টুতে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচটা যখন প্রায় ড্রয়ের পথে, তখন ৮৬ মিনিটে হালান্ডের গোল নরওয়েকে ২-১ ব্যবধানে জিতিয়ে দেয়। তারপর তো ব্রাজিল।
এই বিশ্বকাপে চার ম্যাচ খেলে হালান্ডের গোল সাতটা, গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে তিনি একদম সামনের সারিতে, মেসি আর এমবাপের সঙ্গে। শুধু তা-ই নয়, টানা ১৪টা আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল করার এক অবিশ্বাস্য ধারাও ধরে রেখেছেন।
এবার সামনে ইংল্যান্ড। ১১ জুলাই শনিবার মিয়ামি গার্ডেন্সের হার্ড রক স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে নরওয়ে আর ইংল্যান্ড। জিতলে নরওয়ে উঠে যাবে ইতিহাসের প্রথম সেমিফাইনালে।
উটপাখির দৌড় আর আদুরে কুকুর
এবার আসা যাক অন্য হালান্ডের কাছে, যাকে নিয়ে ইন্টারনেট পাগল।
তার দৌড় নিয়ে গোটা একটা মিমের জগৎ তৈরি হয়ে গেছে। ছয় ফুট চার ইঞ্চির শরীরটা যখন গতিতে ছোটে, ভক্তরা সেটাকে তুলনা করেন উটপাখির দৌড় বা ভিডিও গেমের গ্লিচের সঙ্গে। মজার ব্যাপার হলো হালান্ড নিজেও এই মজায় শামিল, রাগ করার বদলে হাসতে হাসতে ট্রলটা মেনে নেন।
তার স্ন্যাপচ্যাট অ্যাকাউন্ট দেখলে মনে হয় ভুল করে কোনো তারকার প্রাইভেট গ্রুপ চ্যাটে ঢুকে পড়েছেন। বোরড পান্ডার বর্ণনায়, নিউইয়র্কে ঘুরে বেড়ানো, অদ্ভুত ফেস ফিল্টার, নিজেকে শ্রেকের সঙ্গে তুলনা, সব মিলিয়ে অ্যাকাউন্টটা যেন একটা মিম পেজ। বেশির ভাগ তারকার যেখানে গোটা পিআর টিম প্রতিটা পোস্ট সাজিয়ে দেয়, হালান্ড সেখানে বেছে নিয়েছেন একদম এলোমেলো পথ।
স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড তাকে বলেছে ‘হাঁটাচলা করা এক স্ববিরোধী মানুষ’, মাঠে ভয়ংকর আর মাঠের বাইরে আদুরে কুকুরের মতো নরম। হার ওয়ার্ল্ড সিঙ্গাপুরের খবর জানাচ্ছে, চীনা ভক্তরা তাকে আদর করে ডাকেন ‘হা বাও’ মানে ‘হা বেবি’, আবার মাঠের হিংস্রতার জন্য নাম দিয়েছেন ‘নর্ডিক সাইবর্গ’।
মজাটা আরও জমে যখন সেলিব্রিটিরাও এতে জড়ান। শিকাগোস্টারমিডিয়ার খবর অনুযায়ী, নাইকির এক বিজ্ঞাপনে অভিনেতা চ্যানিং টাটাম হালান্ড সেজেছিলেন, ব্লন্ড পরচুলা আর নরওয়ের লাল জার্সি পরে। ব্যাপারটা এখানেই থামেনি, ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচেও নাকি সেই সাজেই গ্যালারিতে হাজির হয়েছিলেন টাটাম।
আর জয়ের পর নরওয়ের সেই ‘ভাইকিং রো’ উদযাপন তো এখন টুর্নামেন্টের প্রতীক হয়ে গেছে। খেলোয়াড়েরা একসঙ্গে বসে ভাইকিং নৌকার ভঙ্গিতে দাঁড় টানেন, আর হালান্ড মাথায় চাপান ভাইকিং হেলমেট।
‘আমরা চ্যাম্পিয়ন হব না’
কিন্তু এত হইচইয়ের ভেতরও হালান্ডের সবচেয়ে বড় গুণ বোধহয় তার বিনয়।
গ্রুপ পর্বে ফ্রান্সের বিপক্ষে নামার আগে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এই বিশ্বকাপ কি তার আর নরওয়ের হতে যাচ্ছে? ফক্স স্পোর্টসের খবর অনুযায়ী, হালান্ড সোজা জবাব দেন, ‘২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা আর গ্রুপ পর্ব পার হওয়া, হ্যাঁ এটুকু বলা যায়। কিন্তু বিশ্বকাপ জেতা, একদমই না। একটু বাস্তববাদী হই চলুন।’
এই কথায় কোনো ভান নেই। ইএসপিএনকে তিনি বলেছিলেন, তার মূল লক্ষ্য ছিল শুধু বিশ্বকাপে ওঠা, এখন বাকি সবকিছুই তার কাছে বাড়তি পাওনা।
মাঠের বাইরে মানুষটা আরও সাদামাটা। হার ওয়ার্ল্ডের খবর বলছে, ফুটবলের চাপ থেকে মাথা ঠান্ডা করতে হালান্ড ছুটে যান খামারে, ট্রাক্টর চালান, গরুকে খাওয়ান। অবসরের পরিকল্পনাও ভেবে রেখেছেন, ব্রাইনে ফিরে একটা ছোট খামার, কিছু গরু-ছাগল, ব্যস।
তার গোলেই ব্রাজিলের বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাতে তার ভক্তের সংখ্যা কমেনি, বরং দিন দিন বাড়ছে। মাঠে দানব, মাঠের বাইরে দুষ্টু এক ছেলে, এই দুই মিলিয়েই গোটা দুনিয়া এখন তাকিয়ে থাকে পরের গোলটার জন্য, আর পরের মিমটার জন্যও। ১১ জুলাই মিয়ামিতে বল গড়ালেই জানা যাবে, গল্পটা আর কত দূর যায়।
আরও পড়ুন:
পর্ব ১: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: মাঠে খেলা শুরুর আগেই বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা
পর্ব ১৯: যে মাঠে শুরু, সেই মাঠেই বিদায়






