এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজল ১২০ মিনিট পেরিয়ে। স্কোরবোর্ডে আর্জেন্টিনা ৩, কেপ ভার্দে ২। সংখ্যাটা বলছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা জিতেছে। কিন্তু মাঠের ছবিটা অন্য গল্প বলছিল।
কেপ ভার্দের খেলোয়াড়েরা কেউ ঘাসের ওপর বসে পড়েছেন, মাথা নুইয়ে। কেউ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। আর গ্যালারিতে, যেখানে সমর্থকদের সংখ্যা হাতে গোনা, সেখান থেকে ভেসে আসছিল করতালি। শুধু কেপ ভার্দের কোণ থেকে নয়, স্টেডিয়ামজুড়ে।
মাঠভর্তি নীল-সাদা আর্জেন্টাইন সমর্থকও উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছিলেন হেরে যাওয়া সেই দলটিকে, যারা তাদের প্রিয় দলকে ঘাম ঝরিয়ে ছেড়েছে।
এই বিদায় কোনো সাধারণ পরাজয় নয়। প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের একটি দ্বীপদেশ, নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে এসে, গ্রুপ পর্বে স্পেন-উরুগুয়ে-সৌদি আরবের বিপক্ষে অপরাজিত থেকে নকআউটে উঠল। তারপর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে টেনে নিয়ে গেল অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত।
ট্রফি জয়ের মতো পর্যায়ে এখনও তারা যাননি, কিন্তু এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি হৃদয় বোধহয় তারাই জিতেছে।
প্রাচীরের আরেক নাম ‘ভোজিনহা’
কেপ ভার্দের রূপকথা যদি একজন মানুষের কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেই মানুষটির নাম ভোজিনহা। চল্লিশ বছর বয়সী গোলকিপার, যাঁর নাম বিশ্বকাপের আগে ইউরোপের বড় লিগের দর্শকও চিনতেন না।
শুরুটা হয়েছিল উদ্বোধনী ম্যাচেই। ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে গোটা ম্যাচে তিনি সাতটি সেভ করলেন, ফল দাঁড়াল ০-০। ইএসপিএনের ম্যাচ রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বকাপে নিজের অভিষেক ম্যাচেই ভোজিনহা হয়ে গেলেন ম্যান অব দ্য ম্যাচ, আর কেপ ভার্দের ওই ড্র হয়ে গেল টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় অঘটন।
কিন্তু তাঁর সেরা রাতটি জমা ছিল শেষের জন্য। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নকআউটে ভোজিনহা করলেন আটটি সেভ, যার চারটিই মেসির শট থেকে। এওএলের রিপোর্ট বলছে, ৭৩ মিনিটে মেসির এক ফ্রি-কিক গোটা স্টেডিয়ামকে অবাক করে দিয়েছিল, কিন্তু ভোজিনহা ঠিক আঙুল ছুঁইয়ে সেটা ফিরিয়ে দেন। ম্যাচ যখন টাইব্রেকারের দিকে গড়াচ্ছিল, তখন ধারাভাষ্যকারদের মুখে একটাই কথা, আর্জেন্টিনা কি সত্যিই ভোজিনহার সঙ্গে পেনাল্টিতে যেতে চায়?
পুরো টুর্নামেন্টের হিসাব আরও চমকপ্রদ। স্কোয়াকার তথ্য অনুযায়ী, চার ম্যাচে ৭৪টি শট সামলে ভোজিনহা সেভ করেছেন মোট ১৮টি, যা এবারের বিশ্বকাপে তৃতীয় সর্বোচ্চ। তাঁর ওপরে আছেন কেবল প্যারাগুয়ের ওর্লান্দো হিল (১৯) আর কুরাসাওয়ের এলোই রুম (২০)। আর অপটার পরিসংখ্যান বলছে, ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী গোলকিপারদের মধ্যে এক বিশ্বকাপে এর চেয়ে বেশি সেভ কেবল দুজনেরই আছে, ইংল্যান্ডের পিটার শিলটন (১৯৯০) আর ইতালির দিনো জফ (১৯৮২)। স্পেন ও সৌদি আরবের বিপক্ষে দুটি ক্লিনশিটও রাখেন তিনি।
মজার ব্যাপার, ‘ভোজিনহা’ নামটার অর্থ পর্তুগিজ ও কেপ ভার্দিয়ান ক্রেওলে ‘দাদিমা’। ছোটবেলায় মাঠে ধাক্কা খেয়ে রাগ করে দাদা-দাদির কাছে ছুটে যেতেন বলে বড় ছেলেরা তাঁকে এই নামে খেপাত। মিন্দেলো শহরে জন্ম নেওয়া এই গোলকিপারের ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার স্পেন ম্যাচের আগে ছিল হাতে গোনা কয়েক হাজার, আর্জেন্টিনা ম্যাচের পর তা দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখে। ততক্ষণে তিনি শুধু কেপ ভার্দের নয়, গোটা বিশ্বকাপের এক প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
পাঁচ লাখ মানুষের একটি স্বপ্ন
সংখ্যাটা একবার ভাবার মতো। কেপ ভার্দের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ, যেটা বাংলাদেশের একটি বড় উপজেলার সমান। আয়তন মাত্র চার হাজার বর্গকিলোমিটারের একটু বেশি। উইকিপিডিয়া ও ফিফার তথ্য বলছে, নকআউট পর্বে ওঠা দেশগুলোর মধ্যে আয়তনে কেপ ভার্দেই সবচেয়ে ছোট।
এই ছোট্ট দেশটাকে একটু মিলিয়ে দেখুন আমাদের অঞ্চলের সঙ্গে। ভারত, চীন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, এই চারটি দেশের মোট জনসংখ্যা পৃথিবীর প্রতি তিনজনের একজন। অথচ এই বিশাল জনসমুদ্রের কেউ ২০২৬ বিশ্বকাপের মূল পর্বে নেই। আর সেখানে গোটা কেপ ভার্দের চেয়ে বেশি মানুষ থাকেন ঢাকার একেকটি এলাকায়। তবু বিশ্বকাপের নকআউটে খেলা দলের নাম কেপ ভার্দে, বাংলাদেশ নয়। জনসংখ্যা যে ফুটবলে কোনো নিশ্চয়তা দেয় না, এই এক পরিসংখ্যানই তা বুঝিয়ে দেয়।
টুর্নামেন্টে ঢোকার সময় ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে কেপ ভার্দের অবস্থান ছিল ৬৭। ২০১০ সালে স্লোভাকিয়ার পর তারাই প্রথম অভিষিক্ত দল, যারা প্রথম বিশ্বকাপে এসেই নকআউটে উঠল। এবারের চার নবাগত দলের মধ্যে কুরাসাও, জর্ডান, উজবেকিস্তান গ্রুপেই থেমে গেছে। কেবল কেপ ভার্দেই পেরিয়েছে বাধার দেয়াল।
অভিবাসীদের দেশ, ফুটবলেরও দেশ
কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় শক্তির কথা বুঝতে হলে দেশটার মানচিত্রের বাইরে তাকাতে হবে। আটলান্টিকে পশ্চিম আফ্রিকা উপকূলের এই দ্বীপপুঞ্জের মূল ভূখণ্ডে যত মানুষ থাকেন, তার চেয়ে বেশি কেপ ভার্দিয়ান ছড়িয়ে আছেন বিশ্বজুড়ে। পর্তুগাল, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, এমন নানা দেশে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে উঠেছে বিশাল প্রবাসী সম্প্রদায়।
এই প্রবাসী নেটওয়ার্কই তাদের জাতীয় দলের মেরুদণ্ড। বোলাভিপের হিসাব বলছে, বিশ্বকাপের স্কোয়াডের অন্তত ১৫ জন খেলোয়াড়েরই জন্ম কেপ ভার্দের বাইরে। সবচেয়ে বেশি খেলোয়াড় এসেছেন নেদারল্যান্ডস থেকে, এরপর পর্তুগাল, ফ্রান্স আর আয়ারল্যান্ড।
ক্লাব-ঠিকানার দিকে তাকালেই ছবিটা পরিষ্কার হয়। রক্ষণের ভরসা লোগান কস্তা খেলেন স্পেনের ভিয়ারিয়ালে, যিনি স্কোয়াডে ইউরোপের সেরা পাঁচ লিগের একমাত্র প্রতিনিধি। ডাবলিনে জন্ম নেওয়া রবার্তো ‘পিকো’ লোপেস এখনো খেলেন আয়ারল্যান্ডের শ্যামরক রোভার্সে। কোয়ালিফাইং পর্বের চার গোল করা দাইলন লিভরামেন্তো পর্তুগালের কাসা পিয়ার ফরোয়ার্ড। মাঝমাঠের ইয়ামিরো মন্তেইরো বেড়ে উঠেছেন নেদারল্যান্ডসে, খেলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের এমএলএসেও।
এই অভিবাসী গল্পের সবচেয়ে ঝলমলে চরিত্র সিডনি লোপেস কাবরাল, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে চোখধাঁধানো গোলটি যাঁর পা থেকে এসেছে। ২০০২ সালে নেদারল্যান্ডসের রটার্ডামে তাঁর জন্ম, বাবা-মা দুজনই কেপ ভার্দের সান্তিয়াগো দ্বীপের। ফুটবলে হাতেখড়ি নেদারল্যান্ডসের এফসি টোয়েন্টে আর সুইডেনের হেলসিংবর্গের বয়সভিত্তিক দলে।
কোভিডের সময় ক্লাবহীন হয়ে পড়ে একসময় নেমে গিয়েছিলেন জার্মানির নিচু ডিভিশনে, তারপর ধাপে ধাপে ভিক্টোরিয়া কোলন, পর্তুগালের এস্ত্রেলা দা আমাদোরা হয়ে বেনফিকা, আর এখন ধারে তুরস্কের ত্রাবজোনস্পোরে।
মজার ব্যাপার, লোপেস মূলত একজন রাইট বা লেফট-ব্যাক, রক্ষণের লোক। তাঁর বড় ভাই রডনি লোপেস কাবরালও এই কেপ ভার্দে দলেরই খেলোয়াড়। আর উরুগুয়ের বিপক্ষে দেশের বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোলটি করা কেভিন পিনাও এই একই প্রবাসী পরম্পরার সন্তান।
সবার মধ্যে ব্যতিক্রম অধিনায়ক রায়ান মেন্দেস, যিনি খাঁটি ঘরের ছেলে। কেপ ভার্দের মিন্দেলো শহরে জন্ম, দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা আর সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার। ঘরে বেড়ে ওঠা মেন্দেস আর প্রবাসে গড়ে ওঠা কাবরাল-দুয়ার্তেরা মিলেই দলটার নাম ‘তুবারোয়েস আজুইস’, মানে নীল হাঙর।
ছোট দেশ, কিন্তু বড় ডায়াস্পোরা, এই সমীকরণটাই কেপ ভার্দের গোপন পুঁজি।
টাকার নয়, পরিকল্পনার জয়
কেপ ভার্দের কোনো বিলিয়ন ডলারের ফুটবল অর্থনীতি নেই। ঝাঁ-চকচকে একাডেমি নেই, লক্ষ দর্শকের স্টেডিয়াম নেই। তাদের কোচ বুবিস্তা নিজেই ম্যাচের পর মনে করিয়ে দিয়েছেন, তাঁর দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড় ইউরোপের অভিজাত লিগে খেলেন না।
তাহলে এই সাফল্য এল কোথা থেকে? এল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থেকে। প্রবাসে ছড়িয়ে থাকা প্রতিভা খুঁজে বের করা, ইউরোপের ক্লাব-কাঠামোর সঙ্গে সংযোগ রাখা, একটা সংগঠিত জাতীয় দল গড়ে তোলা, এই ধৈর্যের বিনিয়োগই ফল দিয়েছে।
প্রকল্পটির স্থপতি বুবিস্তা নিজে একসময় ছিলেন সেন্টার-হাফ। ধাপে ধাপে তিনি এই দলটাকে দাঁড় করিয়েছেন। ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর এসোয়াতিনিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে যখন কেপ ভার্দে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ নিশ্চিত করল, সেটা ছিল বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা কাঠামোরই স্বাভাবিক পরিণতি, হঠাৎ পাওয়া কোনো লটারি নয়।
অঘটনের পর অঘটন
গ্রুপ এইচে কেপ ভার্দের যাত্রাটা ছিল যেন ধারাবাহিক চমকের এক সিরিজ।
শুরুতেই ফেবারিট স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিল তারা, ভোজিনহার সেই সাত সেভের রাতে। এরপর উরুগুয়ের বিপক্ষে ২১ মিনিটে ৩০ গজি ফ্রি-কিকে কেভিন পিনার গোলে এল দেশের বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোল, ম্যাচ শেষ হলো ২-২ ড্রয়ে। শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে আরেকটি ০-০। তিন ম্যাচে তিন ড্র, একটিতেও হার নেই।
স্পেনের পেছনে থেকে রানার্সআপ হয়ে কেপ ভার্দে পৌঁছে গেল নকআউটে, ইয়াহু স্পোর্টসের ভাষায় নকআউটে ওঠা ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ।
তারপর মায়ামিতে সেই রাত। ২৯ মিনিটে মেসির গোলে পিছিয়ে পড়ে কেপ ভার্দে, কিন্তু ৫৯ মিনিটে দেরোই দুয়ার্তের সমতায় ম্যাচ গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। ৯২ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্তিনেস আবার আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন। আর তারপরই সেই মুহূর্ত, ১০৩ মিনিটে বাঁ প্রান্তে পিঠ ফিরিয়ে বল পেয়ে মাক আলিস্তারকে কাটিয়ে বক্সের কিনার থেকে সিদনি লোপেস কাবরালের বাঁকানো শট ‘দিবু’ মার্তিনেসকে পরাস্ত করে জড়িয়ে গেল জালের ওপরের কোণে। ২-২, যাকে টিএনটি স্পোর্টস বলল ‘সর্বকালের অন্যতম সেরা বিশ্বকাপ গোল’।

শেষমেশ ১১১ মিনিটে মেসির কর্নারে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর হেড দিনেই বোর্হেসের গায়ে লেগে আত্মঘাতী গোলে ৩-২। আর্জেন্টিনা জিতল, কিন্তু হাঁপাতে হাঁপাতে।
আর্জেন্টিনা মোটেও স্বস্তি পায়নি
সবচেয়ে বড় স্বীকৃতিটা এল প্রতিপক্ষের ড্রেসিংরুম থেকেই। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি সোজাসুজি বললেন, ‘প্রতিপক্ষকে কৃতিত্ব দিতেই হবে। মানুষ যখন বলে সহজ প্রতিপক্ষ বলে কিছু নেই, কেপ ভার্দে আজ প্রমাণ করল তারা সত্যিই দারুণ এক দল।’
স্কালোনির আরেকটি মন্তব্য যেন গোটা রাতের সারমর্ম, ‘আর্জেন্টাইন হওয়া মানে কী? কষ্ট পাওয়া। কেপ ভার্দে দুই শ ভাগ দিয়েছে, আর ফুটবলে এটাই ব্যবধান কমিয়ে দেয়।’ যে দল দুবার সমতা ফিরিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ঘামিয়ে ছেড়েছে, তাদের সম্পর্কে বিজয়ী কোচের এই কথাগুলোই বলে দেয়, ম্যাচটা কতটা কঠিন ছিল।
আর কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তা? পরাজিত ড্রেসিংরুমে বসে তিনি বললেন, ‘অনুভূতিটা বিষণ্নতার। আমরা দুঃখ পেয়েছি, কারণ এত কাছে গিয়ে ছিটকে গেলাম। কিন্তু আমার খেলোয়াড়দের নিয়ে আমি গর্বিত। আমরা ছোট দেশ হতে পারি, কিন্তু বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিপক্ষে আমরা খেলতে পারি।’ যোগ করলেন, ‘আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দুই গোল করার সাহস আর কোনো দল দেখাতে পারত বলে আমার মনে হয় না।’
বিশ্বজুড়ে ভালোবাসার বন্যা
ফলটা হওয়ার আগেই কেপ ভার্দে জিতে নিয়েছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের হৃদয়। সিএনএন এই ম্যাচকে ডাকল ‘ডেভিড বনাম গোলিয়াথ’ বলে। কেউ লিখল ‘ফেয়ারিটেল’, কেউ বলল টুর্নামেন্টের ‘সারপ্রাইজ প্যাকেজ’। ইয়াহু স্পোর্টসের ভাষায়, স্পেনের সঙ্গে সেই ০-০ ড্রই কেপ ভার্দেকে বিশ্বের মানচিত্রে তুলে এনেছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঢেউ উঠল একই সুরে। বহু নিরপেক্ষ দর্শকের কাছে কেপ ভার্দে হয়ে উঠল ‘সবার দ্বিতীয় প্রিয় দল’। যে দলটার হারে গোটা স্টেডিয়াম উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়, তাকে আর কী বলা যায়, ‘পিপলস চ্যাম্পিয়ন’ ছাড়া?
জার্সিতে লেখা ‘মেড ইন বাংলাদেশ’
কেপ ভার্দের এই রূপকথার সঙ্গে বাংলাদেশেরও আছে এক মিষ্টি যোগসূত্র। স্পেনের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে ভোজিনহারা যে জার্সি পরে খেলেছিলেন, তাতে লেখা ছিল ‘মেড ইন বাংলাদেশ’।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও দ্য ডেইলি স্টারের তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কভিত্তিক ব্র্যান্ড ক্যাপেলি স্পোর্টের হয়ে জার্সিগুলো তৈরি করেছে ঢাকার গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড অ্যাসেম্বলিং (জিএমএ)। ঘাম শোষণকারী কুলম্যাক্স কাপড় সরবরাহ করেছে ইয়ংওয়ান করপোরেশনের ঢাকা কারখানা। জিএমএ’র তথ্যে সংবাদে জানা গেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অর্ডার পেয়ে মার্চের মধ্যেই ৫ হাজার খেলোয়াড়ের জার্সি ও প্রায় ১৩ হাজার ফ্যান জার্সি রপ্তানি করা হয়। জার্সির নকশায় কেপ ভার্দের ১০টি দ্বীপকে যুক্ত করা একটি ফ্লাইট-পাথের নকশাও রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশের দল বিশ্বকাপে না থাকলেও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ঠিকই ছিল এবারের সবচেয়ে আলোচিত দলগুলোর একটির জার্সিতে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশের তৈরি সেই জার্সিই কেপ ভার্দের রূপকথার নীরব সঙ্গী হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটা কী
কেপ ভার্দের গল্প বাংলাদেশের জন্য একইসঙ্গে অনুপ্রেরণা ও বাস্তবতার আয়না।
আমাদের দেশে অনেকের ধারণা, বিশ্বকাপে যেতে হলে বিশাল জনসংখ্যা, বিপুল অর্থ আর ইউরোপের মতো অবকাঠামো দরকার। কেপ ভার্দে সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের একটি দেশ যদি সঠিক পরিকল্পনায় বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠতে পারে, তাহলে ১৬-১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশ কেন পারবে না, সেই প্রশ্ন এখন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।
কেপ ভার্দের সাফল্যের সূত্রও খুব জটিল নয়। প্রতিভা খুঁজে বের করা, তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় গড়ে তোলা, নিয়মিত প্রতিযোগিতার সুযোগ, শক্তিশালী কোচিং কাঠামো, প্রবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ এবং সবচেয়ে বড় কথা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। বাংলাদেশেরও বিপুল জনসংখ্যা, ফুটবলের প্রতি মানুষের আবেগ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বড় একটি প্রবাসী সম্প্রদায় রয়েছে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় উপাদান আমাদেরও আছে। এখন দরকার শুধু সঠিক পরিকল্পনা, ধারাবাহিকতা ও ধৈর্য।
বিশ্বকাপের ট্রফি শেষ পর্যন্ত একটি দেশই জিতবে। কিন্তু কোটি মানুষের ভালোবাসা? সেটা মাঝেমধ্যে এমন একটা দল জিতে নেয়, যারা ট্রফি ছুঁতেও পারে না। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই দলের নাম কেপ ভার্দে। তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নয়, কিন্তু নিঃসন্দেহে এই বিশ্বকাপের ইতিহাসে কেপ ভার্দেকে মনে রাখা হবে ‘পিপলস চ্যাম্পিয়ন’ নামে।
আরও পড়ুন:
পর্ব ১: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: মাঠে খেলা শুরুর আগেই বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা
পর্ব ২: বিশ্বকাপের বিলিয়ন ডলারের জার্সি বাণিজ্যে কেন নেই বাংলাদেশ?
পর্ব ৩: বল থেকে রেফারি: ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রযুক্তি যেভাবে বদলে দিচ্ছে সবকিছু
পর্ব ৪: ফুটবলের আড়ালে ক্ষমতার লড়াইয়ে আমেরিকা-চীন ও উপসাগরীয় শক্তি
পর্ব ৫: বিশ্বকাপের ৯৬ বছরে প্রথমবার, যে কীর্তি তিন ফুটবল মহাতারকার
পর্ব ৬: বিশ্বকাপে এশিয়ার ঝড়: জর্ডান-উজবেকিস্তান পারলে, বাংলাদেশ কেন নয়?
পর্ব ৭: পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের যে গল্পগুলো অনেকেই জানেন না
পর্ব ৮: জার্মানির বিপক্ষে কেমন করবে ২৫ প্রবাসী খেলোয়াড়ে সমৃদ্ধ ‘কুরাসাও’
পর্ব ৯: ড্র-জ্বর ছড়াচ্ছে বিশ্বকাপে, রেহাই পাচ্ছে না কোনো পরাশক্তিই
পর্ব ১০: ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার যেসব ঘটনায় হাসবেন-কাঁদবেন আবার ঝগড়াও করবেন
পর্ব ১১: ২০২৬ বিশ্বকাপের ১৩ তারকা, যাদের বাবারাও খেলেছিলেন বিশ্বকাপ
পর্ব ১২: ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো: হাজার গোলের পথে, আবারও জ্বলে ওঠার অপেক্ষায়
পর্ব ১৩: একজনে নির্ভরশীল নয়, পুরো দলের চেষ্টায় এগোচ্ছে ব্রাজিল
পর্ব ১৪: মেসি শুধু একা নন, আর্জেন্টিনায় আরও যারা জ্বলে উঠতে প্রস্তুত
পর্ব ১৫: অপরাজিত থেকেও বিশ্বকাপে ইরানের বিদায় যেন ‘বিতর্কের গল্প’
পর্ব ১৬: বিশ্বকাপ কে জিতবে, ৪ বিলিয়ন ডলারের প্রেডিকশন মার্কেটে এগিয়ে ‘৭ দেশ’
পর্ব ১৭: ফুটবলের নির্মম বিচার ‘টাইব্রেকার’: সেরা তারকাদের ব্যর্থতা আর কান্নার ইতিহাস







