একটু অতীতে ফিরে যাই, ২০২২ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের খেলায় মুখোমুখি ক্রোয়েশিয়া বনাম বেলজিয়াম।
রেফারি পেনাল্টি দিলেন ক্রোয়েশিয়ার পক্ষে। লুকা মড্রিচ কিক নিতে বল রাখলেন স্পটে। তারপর থেমে গেল সব। রেফারি গেলেন VAR চেক করতে। জানা গেল দেজান লভরেন বিল্ডআপের সময় অফসাইডে ছিলেন। সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি সেটাই খুঁজে বের করল। এলো পেনাল্টি বাতিলের সিদ্ধান্ত!
কীভাবে অফসাইড হয়েছে? স্ক্রিনে যে গ্রাফিক দেখানো হলো, সেখানে দুটো ভার্টিক্যাল লাইনের মাঝে লভরেনের শরীরের একটি অংশ এগিয়ে ছিল। এতটাই সামান্য যে খালি চোখে তা বোঝা প্রায় অসম্ভব।
স্টেডিয়ামে দর্শকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় উঠেছিল। কেউ বলল, এটা ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ অফসাইড সিদ্ধান্ত। কেউ বলল, প্রযুক্তি ফুটবলকে হাস্যকর করে তুলছে। কিন্তু মেশিন তার সিদ্ধান্ত বদলায়নি।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে সেই প্রযুক্তি আরও উন্নত সংস্করণ হয়ে মাঠে নামছে। আরও নির্ভুল আরও দ্রুত ও আরও অপ্রতিরোধ্য।

বলের ভেতরে যা আছে
ফুটবলের ইতিহাসে বল সবসময়ই ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চামড়া, রাবার, বাতাসের সমন্বয়ে একটি গল্পের অধ্যায়।
২০২৬ বিশ্বকাপের বলের নাম ট্রাইওন্ডা। ‘ট্রাই’ মানে তিন, আর ‘ওন্ডা’ স্প্যানিশ ভাষায় ঢেউ। খেলা যেহেতু তিনটি দেশে হচ্ছে, তাই তিন দেশের তিনটি ঢেউ। তবে এই বলের সবচেয়ে বড় গল্প এর নাম নয়, গল্পটা লুকিয়ে আছে এর ভেতরে।
ট্রাইওন্ডার বলে রয়েছে অ্যাডিডাসের Connected Ball Technology। একটি AI-চালিত চিপ, যা ম্যাচ চলাকালীন রিয়েল-টাইম ডেটা সংগ্রহ করে এবং পাঠায়। এই সেন্সর প্রতি সেকেন্ডে ৫০০টি ডেটা পয়েন্ট পাঠায়, অর্থাৎ প্রতি দুই মিলিসেকেন্ডে একটি করে রিডিং। মানুষের চোখের পলক পড়তে যত সময় লাগে, তার মধ্যেই এই চিপ প্রায় ২৫০টি মাপজোক নিয়ে ফেলে।
২০২২ বিশ্বকাপের বলে চিপটি ছিল বলের একেবারে কেন্দ্রে। ট্রাইওন্ডায় সেটিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে একটি প্যানেলের ভেতরে বিশেষভাবে তৈরি স্তরে। ভারসাম্য ঠিক রাখতে বাকি তিনটি প্যানেলে রাখা হয়েছে কাউন্টারব্যালেন্সিং ওজন।
পাকিস্তানের শিয়ালকোটে তৈরি হয়েছে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল ‘ট্রাইওন্ডা’। প্রায় ১০ মিলিয়ন ট্রাইওন্ডা বল তৈরির কাজ পেয়েছে পাকিস্তানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ফরওয়ার্ড গ্রুপ। অ্যাডিডাসের সঙ্গে চুক্তি করে তারা এই বলগুলো তৈরি করেছে। শুধু এবারের বিশ্বকাপ নয়, ১৯৯০ সাল থেকে প্রায় প্রতিটি বিশ্বকাপেই ফুটবল গেছে শিয়ালকোট থেকে।

অফসাইড প্রযুক্তির সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি ছিল, ঠিক কোন মুহূর্তে বলটি খেলোয়াড়ের পায়ে স্পর্শ করল। ক্যামেরা সিস্টেম খেলোয়াড়দের অবস্থান আগেও ট্র্যাক করতে পারত, কিন্তু বল ছোঁয়ার নির্ভুল মুহূর্ত নির্ধারণ করা ছিল কঠিন। ট্রাইওন্ডার চিপ সেই মুহূর্তটিই ধরে ফেলে।
বলটা এখন আর নিছক গোলাকার বস্তু নয়। এটা একটা সাক্ষী।
<
h4>১২৪৮ জন খেলোয়াড়ের ডিজিটাল ছায়া
বিশ্বকাপের বলের চিপ শুধুমাত্র একটি অংশ, এবারে প্রযুক্তির ব্যবহার হবে খেলোয়াড়দের নিয়েও। ২০২৬ বিশ্বকাপে ৪৮টি দেশের ১,২৪৮ জন খেলোয়াড়ের প্রত্যেককে ডিজিটালি স্ক্যান করা হবে।
প্রতিটি স্ক্যান থেকে তৈরি হবে একটি সুনির্দিষ্ট থ্রি-ডি মডেল। প্রতিটি স্ক্যান করতে সময় লাগে প্রায় এক সেকেন্ড। এই এক সেকেন্ডেই ধরা পড়ে খেলোয়াড়ের শরীরের প্রতিটি অংশের সুনির্দিষ্ট মাপ। মেসির কাঁধের প্রস্থ, এমবাপ্পের বাহুর দৈর্ঘ্য, ভিনিসিয়াসের পায়ের আঙুলের অবস্থান, সবকিছুই চলে যায় ডিজিটাল মডেলের ভেতরে।
এই থ্রি-ডি মডেলগুলো ব্যবহার করা হবে সেমি-অটোমেটেড অফসাইড ভিএআর রিপ্লেতে। আগের মতো জেনেরিক কম্পিউটার মডেলের বদলে এবার দেখা যাবে সেই খেলোয়াড়েরই ডিজিটাল প্রতিরূপ। এই প্রযুক্তি ইতিমধ্যে পরীক্ষা করা হয়েছে ২০২৫ সালের ফিফা ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে, কাতারের দোহায়। সেখানে সফল হওয়ার পর এবার সেটি ব্যবহার করা হচ্ছে মূল বিশ্বকাপে।

লেনোভো’র (Lenovo) ভূমিকা: পর্দার পেছনের পরিচালক
এই পুরো প্রযুক্তি ব্যবস্থার কেন্দ্রে আছে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ‘লেনোভো’, যেটা সাধারণ ফুটবল সমর্থকদের আলোচনায় খুব একটা আসে না। এটি একটি চীনা প্রযুক্তি এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পার্সোনাল কম্পিউটার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান।
২০২৬ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল টেকনোলজি পার্টনার হিসেবে লেনোভো তৈরি করেছে ‘ফুটবল এআই (Football AI)’ নামে একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি প্যাকেজ। এর তিনটি মূল অংশ হলো ফুটবল এআই প্রো, থ্রি-ডি প্লেয়ার অ্যাভাটার এবং আপডেটেড রেফারি ভিউ সিস্টেম।
ফুটবল এআই প্রো হলো একটি জেনারেটিভ এআই সহকারী, যা ৪৮টি দলকে ম্যাচের আগে ও পরে বিশ্লেষণ সহায়তা দেবে। এটি ফিফার ফুটবল ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের ওপর তৈরি এবং কোটি কোটি ফুটবল ডেটা বিশ্লেষণ করে কাজ করে। এই টুল একসঙ্গে ২,০০০-এরও বেশি মেট্রিক্স বিশ্লেষণ করতে পারে এবং খুব দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরতে পারে। কোন খেলোয়াড় ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, কোন পাশ দিয়ে আক্রমণ বেশি হচ্ছে, প্রতিপক্ষের দুর্বলতা কোথায়, কোচিং স্টাফদের জন্য কয়েক মিনিটের মধ্যেই এসব প্রশ্নের উত্তর বের করে দিতে পারে এই সিস্টেম।
এই প্রযুক্তি ব্যবহারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হলো সমতা। ফুটবল এআই প্রো বিশ্লেষণ সুবিধা পাবে ৪৮টি দলের প্রত্যেকটি, একই মাত্রায়। আর্জেন্টিনা আর উজবেকিস্তান, ব্রাজিল আর নিউজিল্যান্ড, সবাই একই প্রযুক্তিগত সহায়তা পাবে। বিশ্বকাপের মতো অসম প্রতিযোগিতায় এটাকে ছোট হলেও তাৎপর্যপূর্ণ এক ধরনের সমতার চেষ্টা বলা যায়।
আরেকটি পরিবর্তন, যেটা নিয়ে তুলনামূলক কম আলোচনা হলেও ভবিষ্যতে অনেক বেশি হবে। লেনোভো রেফারির বডি ক্যামেরায় AI প্রযুক্তি সংযুক্ত করছে। অর্থাৎ এখন থেকে রেফারি যা দেখছেন, সেই কোণ থেকেও ফুটেজ রেকর্ড হবে। মাটি থেকে রেফারির উচ্চতায়, রেফারির দৃষ্টিরেখায়।
এটা একদিকে দারুণ। দর্শকরা দেখতে পাবেন রেফারি আসলে কোন অবস্থান থেকে সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলেন, স্বচ্ছতা বাড়বে। কিন্তু অন্যদিকে এটা একটু অস্বস্তিকরও। একজন মানুষ পেশাগতভাবে কাজ করছেন, তার চোখে ক্যামেরা, তার প্রতিটি পদক্ষেপ রেকর্ড হচ্ছে, বিশ্লেষণ হচ্ছে। এটা কতটা চাপ তৈরি করে, সেটাও ভাবার বিষয়।
তবে লেনোভোর ভূমিকা এখানেই শেষ নয়। ১৬টি স্টেডিয়ামের ডিজিটাল টুইন তৈরি করছে তারা। পাশাপাশি একটি ইন্টেলিজেন্ট কমান্ড সেন্টার পুরো টুর্নামেন্টের কার্যক্রম রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করবে। মাঠে খেলছে ফুটবলাররা, কিন্তু মাঠের বাইরে আরেকটা অদৃশ্য খেলা চলছে। সেটা ডেটার।
ডেটার আসল গন্তব্য: ট্রান্সফার মার্কেট
১,২৪৮ জন খেলোয়াড়ের থ্রি-ডি স্ক্যান, প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ ডেটা পয়েন্ট, ২,০০০-এর বেশি মেট্রিক্সের বিশ্লেষণ। এত ডেটা শুধু অফসাইড সিদ্ধান্তের জন্য? উত্তর হচ্ছে- ‘না’।
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরে এই ডেটার সবচেয়ে বড় ক্রেতা হবে ক্লাব ফুটবলের দুনিয়া। একজন খেলোয়াড় চাপের মুহূর্তে কতটা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন, ক্লান্তির পরেও তার স্প্রিন্টের গতি কতটুকু থাকে, বড় ম্যাচে তার পাসের নির্ভুলতা কমে কিনা, এই সব প্রশ্নের উত্তর এখন সংখ্যায় পাওয়া যাচ্ছে।
ইউরোপের বড় ক্লাবগুলো বহু বছর ধরে স্কাউটিংয়ে কোটি কোটি ডলার খরচ করে। চোখের দেখা, অভিজ্ঞতার বিচার, ম্যানেজারের পছন্দ। এই পুরো প্রক্রিয়াটা এখন বদলে যাচ্ছে। Opta, StatsBomb, Wyscout-এর মতো ডেটা কোম্পানি আগে থেকেই ক্লাব ফুটবলে ঢুকে পড়েছে। বিশ্বকাপের AI প্রযুক্তি সেই প্রক্রিয়াকে আরেক ধাপ এগিয়ে নেবে।
একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক। ধরুন উজবেকিস্তানের একজন মিডফিল্ডার বিশ্বকাপে চার ম্যাচে অসাধারণ খেলল। আগে কোনো ইউরোপিয়ান স্কাউট তাকে দেখেছে কিনা, সেটার ওপর নির্ভর করত পরের ক্যারিয়ার। এখন তার প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি ট্যাকল, প্রতিটি পাস রেকর্ড হয়ে আছে এবং সে মাঠের কোন অংশে বেশি সময় ধরে অবস্থান বা দৌড়ে ছিল তাও বোঝা যাবে। বার্সেলোনা বা রিয়াল মাদ্রিদের অ্যানালিটিক্স টিম সেটা রাতেই দেখতে পারবে।

এই বদলটা ছোট দেশের খেলোয়াড়দের জন্য সুযোগ। কিন্তু একই সাথে এটা একটা প্রশ্নও তুলছে। মানুষের খেলা দেখার যে আনন্দ, সেটা কি ধীরে ধীরে ডেটা শিটে পরিণত হচ্ছে?
লেনোভো থেকে গুগল জেমেনির শক্ত অবস্থান
একসময় বিশ্বকাপের বড় স্পনসর ছিল কোমল পানীয়, ব্যাংক, গাড়ি কিংবা তেল কোম্পানি। এখন সেই তালিকায় যোগ হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানিও। ফুটবলের নতুন মুদ্রা শুধু অর্থ নয়, ডেটাও।
লেনোভোর পাশাপাশি এবার AI দুনিয়া থেকে আরেকটি পরিচিত নাম গুগল জেমেনি এসেছে, যদিও ভিন্ন ভূমিকায়। তারা সরাসরি ফিফার প্রযুক্তি অংশীদার হিসেবে নয়। গুগল জেমেনি স্পন্সর করেছে আর্জেন্টিনা, ইরাক এবং মরক্কোর দলকে। আর্জেন্টিনার ট্রেনিং কিটে এখন জেমেনির লোগো দেখা যাচ্ছে।
তবে এখানে পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ। লেনোভো কাজ করছে মাঠের ভেতরের প্রযুক্তিতে, অফসাইড সিদ্ধান্তে, অবকাঠামোতে। জেমেনি এবারের বিশ্বকাপে কাজ করছে দর্শকের অভিজ্ঞতা, কনটেন্ট এবং ফ্যান এনগেজমেন্টের জগতে। দুটি ভিন্ন AI কোম্পানি, দুটি ভিন্ন কৌশলে কাজ করলেও তাদের একটিই গন্তব্য, আর তা হচ্ছে ফুটবল।
প্রযুক্তিতে যা ঠিক, প্রযুক্তিতে যা ঠিক না
এখন একটা সরাসরি প্রশ্ন করা যাক। AI-নির্ভর অফসাইড সিস্টেম কি সত্যিই সমস্যার সমাধান করছে?
কাতার ২০২২ বিশ্বকাপে VAR মোট ৮টি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল করেছে, ২টি ভুল অফসাইড সিদ্ধান্ত সংশোধন করেছে, ১০টি পেনাল্টি দিয়েছে এবং ১০টি গোল সরাসরি নিশ্চিত করেছে। সংখ্যার হিসেবে প্রযুক্তি এমন অনেক ভুল ধরেছে, যা আগে ধরা যেত না।
কিন্তু লভরেনের সেই ঘটনাটা মনে পড়ে। প্রযুক্তি বলল, লভরেন অফসাইডে ছিলেন। মাঠের রেফারি বললেন, পেনাল্টি দেওয়া ঠিক হয়েছে। স্ক্রিনে যে গ্রাফিক দেখানো হলো, তা দেখে কোন অংশটা অফসাইড ছিল সেটা বোঝাই যাচ্ছিল না। কিন্তু সিদ্ধান্ত বদলে গেল, কারণ প্রযুক্তি বলেছে।
এখানেই প্রশ্নটা জন্ম নেয়। যখন মেশিনের সিদ্ধান্ত মানুষের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে যায়, তখন কি আর তর্ক করার জায়গা থাকে?
একজন রেফারি ভুল করলে আমরা মানুষকে দোষ দিই। তাকে পরের ম্যাচে দায়িত্ব না-ও দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অ্যালগরিদম ভুল করলে তখন কাকে দায়ী করা হবে? অ্যাডিডাসকে? লেনোভো-গুগলকে? নাকি ফিফাকে?
প্রশ্নটা যতটা প্রযুক্তির, ততটাই জবাবদিহির।
আর এখান থেকেই শুরু হয় আরেকটি বড় বিতর্ক। ফুটবলপ্রেমীরা বহু বছর ধরে একটা কথা বলে আসছেন, এই খেলার সৌন্দর্য তার অনিশ্চয়তায়। ম্যারাডোনার সেই ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল, গেরার্ডের ২০০৫ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের সেই রাত, ফ্রান্সের ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জয়ের সময় জিদানের দুটি হেড। এসব মুহূর্তে বিতর্ক ছিল, ভুল ছিল, মানবিক সীমাবদ্ধতা ছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তগুলোই ফুটবলের ইতিহাস।
AI কি সেই ইতিহাস লেখার পদ্ধতি বদলে দেবে? যে গোলটা ০.৩ সেন্টিমিটার অফসাইডে বাতিল হলো, সেই গোলটা মানুষের চোখে ছিল বৈধ। তাহলে সত্যিটা কোনটা? মেশিনের দেখা সত্য, নাকি মানুষের অনুভব করা সত্য?
এটা কোনো সাধারণ প্রশ্ন নয়।
এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে এক বিশ্লেষণী লেখায় বলা হয়েছে, এবারের বিশ্বকাপকে আর শুধু একটি টুর্নামেন্ট বলা যাচ্ছে না। এটি ধীরে ধীরে একটি প্রযুক্তি-চালিত বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে। ডিজিটাল টুইন স্টেডিয়াম, AI-নির্ভর স্মার্ট ওয়েফাইন্ডিং, কমান্ড সেন্টার, প্রতিটি খেলোয়াড়ের ডিজিটাল প্রতিরূপ। বিশ্বকাপ এখন শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, একটি প্রযুক্তি অবকাঠামোও।
উপরের তথ্য আর আলোচনায় শেষ প্রশ্ন, ‘ফুটবল কি তাহলে ধীরে ধীরে একটি পণ্যে পরিণত হচ্ছে?’ এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। প্রযুক্তি অনেক ভুল কমাচ্ছে, এটা সত্য। আবার প্রযুক্তি খেলার কিছু মানবিক অনিশ্চয়তাও কমিয়ে দিচ্ছে, এটাও সত্য। এই দুই সত্যকে একসঙ্গে ধরে রাখাই সম্ভবত সবচেয়ে সৎ অবস্থান।
মাঠটা আগের মতোই সবুজ। গোলপোস্টও একই আছে। দর্শকদের উল্লাসও বদলায়নি। কিন্তু বলের ভেতরে, স্ক্রিনের আড়ালে, সার্ভারের গভীরে এখন কাজ করছে আরেকটা জগৎ। সেই জগতের ভাষা ‘ডেটা’। সেই জগতের খেলোয়াড় ‘অ্যালগরিদম’।

বল থেকে বোর্ডরুম, জার্সি থেকে ডেটা সেন্টার। আগের পর্বগুলো এবং এই লেখায় আমরা দেখেছি, বিশ্বকাপ আসলে শুধু ৯০ মিনিটের ফুটবল নয়। এটি বহু বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তথ্য এবং প্রভাবের এক বিশাল কাঠামো।
কিন্তু সবচেয়ে বড় গল্পটা হয়তো এখনো বলা হয়নি। সেটা হচ্ছে, বিশ্বকাপের মঞ্চে শুধু খেলোয়াড়রাই লড়ছে না। পর্দার আড়ালে চলছে আরেক প্রতিযোগিতা। প্রযুক্তি কোম্পানি বনাম প্রযুক্তি কোম্পানি। রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র, প্রভাব বনাম প্রভাব। একদিকে আমেরিকার প্রযুক্তি শক্তি। অন্যদিকে চীনের প্রযুক্তি ও উৎপাদন সাম্রাজ্য। কোথাও তেলের ডলার, কোথাও ডেটার ক্ষমতা। কোথাও কূটনীতি, কোথাও করপোরেট স্বার্থ।
বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল কি শুধু ফুটবলই আছে? নাকি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক ক্ষমতার এক বিশাল প্রদর্শনী মঞ্চে? সেই উত্তর, সেই গল্প, আর সেই অদৃশ্য শক্তির মানচিত্র নিয়ে পরের পর্ব।
(এই প্রতিবদেন তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘পারপ্লেক্সিটি’, ‘নোটবুক এলএম’ ও ‘ডেল-ই’ ব্যবহার করা হয়েছে)
আগের পর্বগুলো পড়ুন:
পর্ব ১: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: মাঠে খেলা শুরুর আগেই বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা
পর্ব ২: বিশ্বকাপের বিলিয়ন ডলারের জার্সি বাণিজ্যে কেন নেই বাংলাদেশ?







