এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
বিশ্বকাপ এলেই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ফ্যানদের মধ্যে তর্ক শুরু হলে বেশিরভাগ সময় কয়েক মিনিটের মধ্যে পরিসংখ্যান শেষ হয়ে যায়, তারপর শুরু হয় অন্য গল্প। ‘ব্রাজিলকে জার্মানির দেওয়া ৭ গোল’, নয়তো ‘ম্যারাডোনার হাত দিয়ে দেওয়া গোল’ নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে আলোচনা। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ফ্যানদের আলোচনার রসদ আসলে দুই দলের অতীত সাফল্য আর ব্যর্থতায়। একশ বছর ধরে দুই প্রতিবেশী এমন সব কাণ্ড ঘটিয়েছে, যা নিয়ে নেটফ্লিক্স-অ্যামাজনে সিরিজ বানালে স্ক্রিপ্ট শেষ হবে, কিন্তু গল্প শেষ হবে না।
মরক্কোর বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করে ২০২৬ সালের মিশন শুরু করেছে ব্রাজিল, আর ১৭ জুন ভোরে (বাংলাদেশ সময়) আলজেরিয়ার বিপক্ষে শিরোপা রক্ষার অভিযানে মাঠে নামছে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। আসলে বাংলাদেশে সবেমাত্র শুরু হলো ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ফ্যানদের খুনসুটির মহাউৎসব।
ফ্যানদের এই খুনসুটির রসদ জোগাতেই ফিরে দেখা যাক দুই দলের শতবর্ষের দারুণ কিছু ঘটনা।
যে ম্যাচের নামই হয়ে গেল ‘লজ্জার ম্যাচ’ (১৯৩৭)
ঝগড়াটা কবে শুরু, জানতে চাইলে ইতিহাসবিদরা দেখিয়ে দেন ১৯৩৭ সালের এক বিকেল। কোপা আমেরিকার শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ, বুয়েনস আইরেসের গ্যালারি থেকে ব্রাজিলের কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের দিকে উড়ে আসছে জঘন্য বর্ণবাদী গালি। মাঠের ভেতরে চলছে লাথি-গুঁতোর উৎসব।
অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনা ২-০ তে এগিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ম্যাচ-পরবর্তী বিতর্ক এতটাই বড় হয় যে ব্রাজিলের সংবাদপত্রগুলো পরদিন ম্যাচটার নাম দেয় ‘লজ্জার ম্যাচ’। বুঝতেই পারছেন, সম্পর্কের শুরুটাই হয়েছিল ডিভোর্স দিয়ে।
গোলরক্ষক নেই, ডিফেন্ডার নেই, তবু পেনাল্টি নিতে হবে (১৯৩৯)
ম্যাচের শেষ মুহূর্ত, স্কোর ২-২, রেফারি ব্রাজিলকে দিলেন পেনাল্টি। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা এত ক্ষেপে গেলেন যে প্রতিবাদ-টতিবাদ বাদ দিয়ে সোজা মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। পুরো দল। গোলরক্ষকসহ। এখন রেফারি পড়লেন বিপদে, নিয়ম বলছে খেলা শেষ করতে হবে। তখন ব্রাজিলের খেলোয়াড় দৌড়ে এসে শট নিলেন সম্পূর্ণ ফাঁকা গোলপোস্টে। গোওওল! ব্রাজিল জিতল ৩-২ এ। ১৯৩৯ সালের এই ঘটনাটি ছিল রোকা কাপের (Copa Roca) ম্যাচ, পুরো নাম Julio Roca Cup। এটি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মধ্যে অনিয়মিতভাবে আয়োজিত একটি দ্বিপক্ষীয় টুর্নামেন্ট ছিল।
ফুটবল ইতিহাসে এমন পেনাল্টি আর দ্বিতীয়টি নেই, যেখানে গোলরক্ষকের একমাত্র কাজ ছিল অনুপস্থিত থাকা। আর্জেন্টাইনরা অবশ্য আজও বলেন, ‘ওটা জয় না, ওটা একটা প্রহসন।’
ভাঙা পা আর হাজার দর্শকের মাঠ দখল (১৯৪৬)
এই পর্বটা হাসির নয়, ভয়ের। বুয়েনস আইরেসে কোপার ম্যাচে ব্রাজিলের জাইরের ভয়ংকর ট্যাকলে মড়মড় করে ভাঙল আর্জেন্টাইন অধিনায়ক সালোমনের পা। ব্যথায় কাতরানো অধিনায়ককে দেখে গ্যালারির বাঁধ ভাঙল, হাজার হাজার দর্শক নেমে এল মাঠে, ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের তখন প্রাণ নিয়ে দৌড়ানোর অবস্থা।
পুলিশ এসে কোনোমতে সামাল দিল, ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনা জিতল ২-০ গোলে। কিন্তু ক্ষতটা এত গভীর ছিল যে এরপর প্রায় দশ বছর দুই দল একে অন্যের ছায়াও দেখেনি। ভাবা যায়? সুপারক্লাসিকো এক দশক বন্ধ ছিল রাগারাগি করে!
পেলে বনাম ম্যারাডোনা, মাঠের বাইরের মহাযুদ্ধ
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথ এক সময় শুধু দুই দেশের ম্যাচ ছিল। তারপর সেটি রূপ নিল দুই ফুটবল দর্শনের যুদ্ধে। একদিকে পেলে, তিন বিশ্বকাপ জয়ী ফুটবলের রাজা। অন্যদিকে দিয়েগো ম্যারাডোনা, বিদ্রোহী প্রতিভা, যিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করছিলেন লাতিন আমেরিকার নতুন নায়ক হিসেবে।
মজার ব্যাপার হলো, দুই কিংবদন্তি কখনো বিশ্বকাপে মুখোমুখি হননি। অথচ তাদের নিয়ে যত তর্ক হয়েছে, অনেক ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচও বোধহয় তত বিতর্ক তৈরি করতে পারেনি। আর্জেন্টাইনদের কাছে ম্যারাডোনা ছিলেন রাস্তার ছেলে, জনগণের প্রতিনিধি। ব্রাজিলিয়ানদের কাছে পেলে ছিলেন সাফল্য, সৌন্দর্য আর শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক।
কে সেরা? এই প্রশ্নে পরিবার ভেঙেছে কি না জানা নেই, তবে বন্ধুত্ব নষ্ট হয়েছে অসংখ্য। আজকের মেসি-রোনালদো বিতর্কের বহু আগেই দক্ষিণ আমেরিকা পেলে-ম্যারাডোনা যুদ্ধে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। আর সত্যি বলতে, সেই যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।
রোজারিওতে ফুটবল হয়নি, হয়েছিল কুস্তি (১৯৭৮)
ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ, দ্বিতীয় রাউন্ডে মুখোমুখি দুই চিরশত্রু। যারা সেদিন সুন্দর ফুটবল দেখতে টিভি ছেড়েছিলেন, তারা ঠকেছেন। নব্বই মিনিট ধরে চলল লাথি, কনুই, ধাক্কা আর চোখ রাঙানি। বল মাঝে মাঝে আসত অতিথি শিল্পীর মতো। ফলাফল গোলশূন্য ড্র, কিন্তু ম্যাচটা ইতিহাসে ঢুকে গেল বিশ্বকাপের অন্যতম নির্মম লড়াই হিসেবে। সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে সেবার ট্রফিটা অবশ্য আর্জেন্টিনাই নিয়েছিল, নিজেদের মাটিতে, নিজেদের প্রথম।
২১ বছরের ম্যারাডোনার মেজাজ বিস্ফোরণ (১৯৮২)
স্পেন বিশ্বকাপে সবাই অপেক্ষায়, এবার বিশ্ব দেখবে নতুন জাদুকরকে। কিন্তু ব্রাজিলের জিকো-সক্রেটিসদের সামনে আর্জেন্টিনা তখন ৩-১ এ চিড়েচ্যাপটা। হতাশায় ফুটতে থাকা ২১ বছরের ম্যারাডোনা শেষ দিকে যা করলেন, তা ফুটবল নয়, মার্শাল আর্ট। বাতিস্তার তলপেট বরাবর ফ্লাইং কিক, সরাসরি লাল কার্ড, মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়লেন ভবিষ্যৎ ঈশ্বর।
ব্রাজিল ফ্যানরা আজও খোঁচা দেন, ‘তোমাদের ঈশ্বরের বিশ্বমঞ্চে প্রথম স্মরণীয় কীর্তি কিন্তু একটা লাথি।’
সেই বিখ্যাত পানির বোতল, যা আজও রহস্য (১৯৯০)
সুপারক্লাসিকোর সবচেয়ে সিনেমাটিক গল্প এটাই। ইতালি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিল সেদিন আর্জেন্টিনাকে রীতিমতো চেপে ধরেছে, পোস্টে বল লাগছে, গোল আসছে না। হঠাৎ মাঝমাঠ থেকে ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত দৌড়, চার ডিফেন্ডারকে টেনে এনে নিখুঁত পাস, কানিজিয়ার গোল। ব্রাজিল বাদ।
গল্পটা এখানে শেষ হলে তাও হতো। বছরখানেক পর বোমা ফাটল, অভিযোগ উঠল আর্জেন্টিনার বেঞ্চ থেকে ব্রাজিলের ডিফেন্ডার ব্রাঙ্কোকে দেওয়া পানির বোতলে নাকি মেশানো ছিল ঘুমের ওষুধ! ব্রাঙ্কো নিজে বললেন, পানি খাওয়ার পর তাঁর শরীর ছেড়ে দিচ্ছিল।
ফিফা কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগটি প্রমাণ করতে পারেনি। কিন্তু লোককাহিনির মতো গল্পটা দুই দেশের ফুটবল সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। আর ম্যারাডোনা? বহু বছর পর এক টিভি অনুষ্ঠানে এমন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন যে বিতর্কটা নতুন করে জ্বলে ওঠে। সত্য-মিথ্যা আজও প্রমাণ হয়নি, কিন্তু ‘এল বিদন’ বা বোতল-কাণ্ড ছাড়া সুপারক্লাসিকোর কোনো আড্ডাই সম্পূর্ণ হয় না।
ব্রাজিলেরও আছে নিজস্ব ‘হ্যান্ড অব গড’ (১৯৯৫)
ব্রাজিল ফ্যানরা ম্যারাডোনার হাতের গোল নিয়ে খোঁচা দিলে আর্জেন্টিনা ফ্যানদের হাতে একটা ব্রহ্মাস্ত্র আছে, তুলিও। ১৯৯৫ কোপার কোয়ার্টার ফাইনালে ২-১ এ পিছিয়ে থাকা ব্রাজিলের স্ট্রাইকার তুলিও বুক আর হাত দিয়ে বল নামিয়ে দিব্যি গোল করে ফেললেন, রেফারি সানন্দে মেনেও নিলেন। সমতা ফিরিয়ে ব্রাজিল টাইব্রেকারে জিতে গেল।
আর্জেন্টাইনরা আজও ফোঁস করে ওঠেন, ‘আমাদেরটা ছিল ঈশ্বরের হাত, তোমাদেরটা ‘চোরের হাত’।’
উৎসবের কেক কেটে ফেলার আগেই… (২০০৪)
কোপা আমেরিকার ফাইনাল, ৯৩তম মিনিট, আর্জেন্টিনা ২-১ এ এগিয়ে। আকাশি-সাদা গ্যালারিতে কেউ কেউ কেঁদে ফেলেছেন আনন্দে, ফোনে বাড়িতে খবর যাচ্ছে, ‘আমরা চ্যাম্পিয়ন!’ ঠিক সেই মুহূর্তে বক্সের ভেতর বল পেলেন আদ্রিয়ানো। বাঁ পায়ের একটা গোলা, আর পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর সমতা।
ভেঙে পড়া আর্জেন্টিনা টাইব্রেকারে আত্মসমর্পণ করল, কাপ গেল ব্রাজিলের ঘরে।
ফেবারিটদের কাঁদানোর রাত (২০০৭)
সেবারের কোপা ফাইনালের আগে সবাই ধরে নিয়েছিল ট্রফি আর্জেন্টিনার। রিকেলমে দুর্দান্ত ফর্মে, পাশে উনিশ-কুড়ি বছরের এক জাদুকর, নাম লিওনেল মেসি। ওদিকে ব্রাজিল নেমেছিল কাকা-রোনালদিনহোকে ছাড়াই, প্রায় দ্বিতীয় সারির দল নিয়ে। তারপর যা হলো, ফুটবলের পুরোনো প্রবাদটাই সত্যি হলো, কাগজে খেলা হয় না, খেলা হয় মাঠে। ৩-০ গোলের নির্মম জয়ে কাপ নিল ব্রাজিল।
ম্যাচ শেষে তরুণ মেসির মুখের হতাশা দেখে অনেক আর্জেন্টিনা সমর্থক তখনই বুঝে গিয়েছিলেন, এই ছেলেটাকে নিয়ে তাদের আনন্দের জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে।
মনে রাখার মতো গানের খোঁচা (২০১৪)
ব্রাজিলের মাটিতে বিশ্বকাপ, আর সেখানে লাখো আর্জেন্টাইন হাজির হলো একটা গান নিয়ে। সুরটা ধার করা, কিন্তু কথাগুলো বিষমাখা তীর, ‘ব্রাজিল, বলো তো কেমন লাগে, নিজের ঘরে বাবাকে দেখলে?’
১৯৯০ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার নৈপুণ্যে (তাঁর দৌড় ও ক্যানিজিয়ার গোলে) ব্রাজিলের বিদায়কে স্মরণ করিয়ে দিতেই আসলে ওই গান। রিওর সৈকত থেকে সাও পাওলোর মেট্রো, সর্বত্র সেই গান।
ব্রাজিলিয়ানরা সেবার জার্মানির কাছে সেমিতে ৭-১ গোলে হারার পরে সেই গান আরও তীব্র হয়ে আসে। অন্যরকম এক বৈরি পরিবেশ দেখা দেয় দুই দেশের ফ্যানদরে মধ্যে।
শত্রুর মন্দিরে মেসির রাজ্যাভিষেক (২০২১)
মারাকানা স্টেডিয়াম ব্রাজিলিয়ানদের কাছে মন্দিরের মতো। সেই মন্দিরেই কোপার ফাইনালে দি মারিয়ার আলতো এক চিপে স্বাগতিকদের হারিয়ে দিল আর্জেন্টিনা। ২৮ বছরের শিরোপা-খরা ঘুচল, আর মেসি পেলেন দেশের জার্সিতে প্রথম ট্রফি।
ম্যাচ শেষে নেইমারের কান্না আর মেসির সঙ্গে তাঁর আলিঙ্গনের ছবিটা অবশ্য দুই দলের ফ্যানদেরই বুকে লেগেছিল। ওই এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, যুদ্ধটা মাঠেই থাক, বন্ধুত্বটা থাক মাঠের বাইরে। তারপর অবশ্য সবাই আবার ফেসবুকে ঝগড়ায় ফিরে গেছেন।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বনাম সুপারক্লাসিকো (২০২১)
ফুটবল ম্যাচ বন্ধ হয় বৃষ্টিতে, দাঙ্গায়, কুয়াশায়। কিন্তু স্বাস্থ্য কর্মকর্তার অভিযানে? সাও পাওলোতে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যে মাঠে ঢুকে পড়লেন ব্রাজিলের স্বাস্থ্য দপ্তরের লোকজন, পেছনে পুলিশ। দাবি, আর্জেন্টিনার চার খেলোয়াড় কোভিড কোয়ারেন্টিনের নিয়ম ভেঙেছেন, এক্ষুনি তাদের নিয়ে যাওয়া হবে।
মাঠের মধ্যে শুরু হলো ধস্তাধস্তি, হতভম্ব মেসি দল নিয়ে হাঁটা দিলেন ভেতরে, ম্যাচ পরিত্যক্ত। গোটা দুনিয়া টিভির সামনে বসে ভাবল, এ কী দেখলাম! সুপারক্লাসিকোর গল্পের ঝুলিতে যোগ হলো অদ্ভুততম অধ্যায়, যে ম্যাচে একটাও গোল হয়নি, কিন্তু নাটক হয়েছে ভরপুর।
গ্যালারিতে যুদ্ধ, মাঠে ইতিহাস (২০২৩)
মারাকানায় বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচ, জাতীয় সংগীত চলাকালেই গ্যালারিতে দুই দলের সমর্থকদের তুমুল মারামারি, পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জ। গ্যালারিতে ছিলেন খেলোয়াড়দের পরিবার-পরিজনেরাও। পরিস্থিতি দেখে মেসি সিদ্ধান্ত নিলেন, এই অবস্থায় খেলা নয়। পুরো দল নিয়ে চলে গেলেন ড্রেসিংরুমে।
আধঘণ্টা পর পরিস্থিতি শান্ত হলে খেলা শুরু, আর সেই ম্যাচেই ওতামেন্দির হেডে ১-০ গোলের জয়। সঙ্গে ইতিহাস, বিশ্বকাপ বাছাইয়ে নিজের মাঠে ব্রাজিলের প্রথম হার। আর্জেন্টিনা ফ্যানদের কাছে জয় প্লাস রেকর্ড ভাঙা।
মেসিকে ছাড়াই ৪-১, আর একটা মন্তব্যের করুণ পরিণতি (২০২৫)
ম্যাচের আগে ব্রাজিলের রাফিনিয়া হুংকার দিলেন, ‘মাঠে ওদের গুঁড়িয়ে দেব, দরকার হলে মাঠের বাইরেও।’ ফুটবল-বিধাতা বোধহয় মুচকি হেসেছিলেন। বুয়েনস আইরেসে মেসিকে ছাড়াই নামা আর্জেন্টিনা ব্রাজিলকে ভাসিয়ে দিল ৪-১ গোলে। গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া রাফিনিয়ার সেই কথা ঘুরতে লাগল মিম হয়ে, লাখ শেয়ারে।
শিক্ষা একটাই, সুপারক্লাসিকোর আগে বড় কথা বলতে নেই।
আসল সুপারক্লাসিকো হয় বাংলাদেশের ছাদে আর চায়ের দোকানে
মজার ব্যাপার হলো, যে দেশটা কখনো বিশ্বকাপের মূল পর্বেই খেলেনি, বিশ্বকাপ এলে সেই বাংলাদেশের রক্তচাপই বোধহয় সবচেয়ে বেশি ওঠানামা করে। এখানে কিলোমিটার লম্বা পতাকা বানানো হয়, পুরো বাড়ি রং হয়ে যায় হলুদ-সবুজ বা আকাশি-সাদায়, ভাইয়ে ভাইয়ে ভাগ হয়ে যায় খাবার টেবিল। এক ভাই ব্রাজিল তো আরেক ভাই জেদ করেই আর্জেন্টিনা, এ দেশের ঘরে ঘরে চেনা দৃশ্য। কেউ বাজি ধরেন মাথা ন্যাড়া করার, কেউ পছন্দের দল হারলে কয়েক দিন মুখ দেখাদেখি বন্ধ রাখেন প্রতিবেশীর সঙ্গে।
আর এই পাগলামির খবর এখন আর সীমান্তে আটকে নেই। প্রতি বিশ্বকাপেই বাংলাদেশের কিলোমিটারজোড়া পতাকা, দল বেঁধে খেলা দেখা আর সমর্থকদের আবেগের ছবি জায়গা করে নেয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। দক্ষিণ আমেরিকার দুই দল নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার এক দেশের এই উন্মাদনা দেখে খোদ ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মানুষও অবাক হন, ভাবেন, এত দূরের একটা দেশে আমাদের জন্য এত ভালোবাসা এল কোথা থেকে! ফুটবলের এই অদ্ভুত ভৌগোলিক জাদুটার কোনো ব্যাখ্যা বিজ্ঞানে নেই।
শেষ কথা: ঝগড়াটাই তো ভালোবাসা
একশ বছর পেরিয়ে গেল, তবু এই তর্কের মীমাংসা হলো না। ব্রাজিল ফ্যান টেবিলে পাঁচ আঙুল তুলে বলবেন, ‘পাঁচ বিশ্বকাপ, কথা শেষ।’ আর্জেন্টিনা ফ্যান শান্ত গলায় ছুড়ে দেবেন একটাই প্রশ্ন, ‘সর্বশেষ বিশ্বকাপটা কার ঘরে?’ তারপর আবার শুরু, ম্যারাডোনা না পেলে, মেসি না নেইমার, বোতলের পানি না তুলিওর হাত।
সম্ভবত এটাই এই দ্বৈরথের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। কারণ যেদিন চায়ের দোকানে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে আর ঝগড়া হবে না, সেদিন হয়তো ফুটবল তার সবচেয়ে রঙিন গল্পগুলোর একটি হারিয়ে ফেলবে। তত দিন পর্যন্ত ঝগড়া চলুক, পতাকা উড়ুক, আর বিশ্বকাপের রাতগুলো জেগে থাকুক।
(ফিচারটি তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘পারপ্লেক্সিটি’, ‘ক্লড’ ও ‘ডেল-ই’ ব্যবহার করা হয়েছে)
আরও পড়ুন:
পর্ব ১: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: মাঠে খেলা শুরুর আগেই বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা
পর্ব ২: বিশ্বকাপের বিলিয়ন ডলারের জার্সি বাণিজ্যে কেন নেই বাংলাদেশ?
পর্ব ৩: বল থেকে রেফারি: ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রযুক্তি যেভাবে বদলে দিচ্ছে সবকিছু
পর্ব ৪: ফুটবলের আড়ালে ক্ষমতার লড়াইয়ে আমেরিকা-চীন ও উপসাগরীয় শক্তি
পর্ব ৫: বিশ্বকাপের ৯৬ বছরে প্রথমবার, যে কীর্তি তিন ফুটবল মহাতারকার
পর্ব ৬: বিশ্বকাপে এশিয়ার ঝড়: জর্ডান-উজবেকিস্তান পারলে, বাংলাদেশ কেন নয়?
পর্ব ৭: পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের যে গল্পগুলো অনেকেই জানেন না
পর্ব ৮: জার্মানির বিপক্ষে কেমন করবে ২৫ প্রবাসী খেলোয়াড়ে সমৃদ্ধ ‘কুরাসাও’
পর্ব ৯: ড্র-জ্বর ছড়াচ্ছে বিশ্বকাপে, রেহাই পাচ্ছে না কোনো পরাশক্তিই







