এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে তখন ম্যাচের ৭৩ মিনিট। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ডান পায়ে শট নিলেন। বল চলে গেল পোস্টের অনেক বাইরে দিয়ে। মাথা নিচু, দুই হাত কোমরে, মুখে বিরক্তির ছাপ। গ্যালারিতে কঙ্গো ডিআরের সমর্থকদের উল্লাস। টিভির পর্দার সামনে বসে থাকা অনেকের মনেও তখন একই প্রশ্ন, এ কি সেই রোনালদো?
কঙ্গোর সঙ্গে ১-১ ড্র করে বিশ্বকাপ শুরু করেছে পর্তুগাল। জোয়াও নেভেসের গোলে এগিয়ে গিয়েও জয় ধরে রাখতে পারেনি দলটি। আর আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন অধিনায়ক রোনালদো।
আল জাজিরার হিসাবে, পুরো ম্যাচে তাঁর বলের স্পর্শ ছিল মাত্র ২৫ বার, যা পর্তুগালের শুরুর একাদশের যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে কম। তিনটি শট নিয়েছিলেন, কিন্তু একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেননি। নিজের ২৩ বিশ্বকাপ ম্যাচের মধ্যে এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্পর্শের ম্যাচ।
সমালোচনাও এসেছে দ্রুত। ফক্স টিভিতে কথা বলতে গিয়ে সাবেক ফরাসি তারকা থিয়েরি অঁরি রোনালদোকে স্বার্থপর বলেছেন, ‘দলের গোল দরকার, তোমার নয়।’ সাবেক ঘানা মিডফিল্ডার কেভিন-প্রিন্স বোয়াটেং এসবিএস স্পোর্টে বলেছেন, ‘এখন রোনালদোর উচিত সরে দাঁড়িয়ে তরুণদের জায়গা দেওয়া আর শেষ ১৫-২০ মিনিটে নেমে প্রভাব ফেলা।’ কোচ রবার্তো মার্তিনেজকেও ছাড় দেননি বিবিসির বিশ্লেষক ক্রিস সাটন, তাঁর মতে মার্তিনেজ প্রয়োজন হলেও রোনালদোকে তুলে নিতে দ্বিধায় থাকেন।
তবে মার্তিনেজ তাঁর অধিনায়কের পাশেই দাঁড়িয়েছেন। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘যে ম্যাচে গোল দরকার, সেখানে বিশ্বের সেরা গোলদাতাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার কোনো মানে হয় না।’

তবু পরিসংখ্যান কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলছে। ২০২২ বিশ্বকাপে ঘানার বিপক্ষে গোল করার পর বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে টানা ১০ ম্যাচে গোল পাননি রোনালদো। বিশ্বকাপে তাঁর গোলখরা এখন পাঁচ ম্যাচের। আর ওপেন প্লে থেকে বড় কোনো আসরে তাঁর শেষ গোলটা ২০২১ সালের ইউরোতে, জার্মানির বিপক্ষে, তখন বয়স ছিল ৩৬।
মেসির ছায়া, আবার
এই ম্যাচেই অবশ্য একটা ইতিহাস গড়েছেন তিনি। ৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপের ম্যাচ শুরু করা সবচেয়ে বয়স্ক আউটফিল্ড খেলোয়াড় এখন রোনালদো। পাশাপাশি লিওনেল মেসির সঙ্গে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলা মাত্র ৩জন ফুটবলারের তালিকায়ও নাম লিখিয়েছেন।
কিন্তু ভাগ্যের খেলা কঠিন। ঠিক একদিন আগেই আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছেন মেসি, সেদিন ছুঁয়েছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড (পরে এখন সবার উপরে)। আর পরদিন রোনালদো হারিয়েছেন ছয় বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম খেলোয়াড় হওয়ার সুযোগ। একজনের হ্যাটট্রিক, পরদিন আরেকজনের নীরবতা। 
দুজনের সেই পুরোনো ছায়াযুদ্ধ এক ম্যাচের ব্যবধানে আবার সামনে এসে দাঁড়াল।
কিন্তু গল্পটা কি শুধু একটি ম্যাচের?
একদমই নয়। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল ক্যারিয়ারের মালিক পর্তুগিজ মহাতারকা রোনালদো।
উইকিপিডিয়ার তথ্য বলছে, ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে রোনালদোর গোলসংখ্যা ৯৭৩, যা পেশাদার ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১৪৩ গোল নিয়ে তিনি পুরুষ ফুটবলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। পর্তুগালের হয়ে ২২৯টি ম্যাচ, এটিও বিশ্বরেকর্ড। চ্যাম্পিয়নস লিগে তাঁর ১৪০ গোল এখনো অক্ষত। পাঁচবার জিতেছেন ব্যালন ডি’অর, ক্যারিয়ারে ট্রফি ৩৫টি, যার মধ্যে পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা।
বিশ্বকাপের মঞ্চেও তাঁর স্মরণীয় মুহূর্তের অভাব নেই।
ফক্স স্পোর্টসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে ইরানের বিপক্ষে গোল করে তিনি হয়েছিলেন পর্তুগালের সবচেয়ে কমবয়সী বিশ্বকাপ গোলদাতা, ২১ বছর ১৩২ দিনে। ২০১৮ সালে রাশিয়ায় স্পেনের বিপক্ষে সেই অবিস্মরণীয় হ্যাটট্রিক। আর ২০২২ সালে ঘানার বিপক্ষে গোল করে হয়ে যান টানা পাঁচ বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম পুরুষ খেলোয়াড়।
মাঠের বাইরেও আলোচনায় আছেন তিনি। এ বছর প্রথমবারের মতো ফোর্বসের বিলিয়নিয়ার তালিকায় উঠেছেন রোনালদো, ১.২ বিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে।
আর মাঠে ছুটছেন আরেকটি স্বপ্নের দিকে, প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে ১০০০ গোলের মাইলফলক।
বাংলাদেশের সমর্থকদের চোখে
বাংলাদেশে পর্তুগালের সমর্থক সংখ্যা কখনোই কম ছিল না। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা কিংবা রংপুর, দেশের নানা প্রান্তে অসংখ্য মানুষ রোনালদোর জন্যই পর্তুগালকে সমর্থন করেন। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার চিরচেনা বিভাজনের ভিড়েও পর্তুগালের জার্সি এ দেশে কম দেখা যায় না, আর তার বড় কারণ এই একজন মানুষ। তাঁদের কাছে রোনালদো শুধু একজন ফুটবলার নন, একটা প্রজন্মের স্মৃতি আর আবেগের নাম।
তাই কঙ্গোর সঙ্গে ড্রয়ে হতাশা থাকলেও আশা শেষ হয়ে যায়নি। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নামছে পর্তুগাল, এরপর অপেক্ষা করছে কলম্বিয়া।
উজবেকিস্তানের কোচ ফাবিও কানাভারো অবশ্য আগেই সতর্ক করে রেখেছেন তাঁর দলকে, ‘বক্সে এই ধরনের খেলোয়াড়কে একা ছেড়ে দেওয়া যায় না। কর্নার থেকেও ক্রিশ্চিয়ানো গোল করে ফেলতে পারে।’
৪১ বছরের একটি শরীর, পেছনে ৯৭৩ গোলের ভার, আর সামনে ছয় বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম খেলোয়াড় হওয়ার হাতছানি। রোনালদোর ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় হয়তো শুরু হয়ে গেছে, কিন্তু গল্পের শেষ লাইনটি এখনো লেখা হয়নি।
আরও পড়ুন:
পর্ব ১: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: মাঠে খেলা শুরুর আগেই বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা
পর্ব ২: বিশ্বকাপের বিলিয়ন ডলারের জার্সি বাণিজ্যে কেন নেই বাংলাদেশ?
পর্ব ৩: বল থেকে রেফারি: ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রযুক্তি যেভাবে বদলে দিচ্ছে সবকিছু
পর্ব ৪: ফুটবলের আড়ালে ক্ষমতার লড়াইয়ে আমেরিকা-চীন ও উপসাগরীয় শক্তি
পর্ব ৫: বিশ্বকাপের ৯৬ বছরে প্রথমবার, যে কীর্তি তিন ফুটবল মহাতারকার
পর্ব ৬: বিশ্বকাপে এশিয়ার ঝড়: জর্ডান-উজবেকিস্তান পারলে, বাংলাদেশ কেন নয়?
পর্ব ৭: পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের যে গল্পগুলো অনেকেই জানেন না
পর্ব ৮: জার্মানির বিপক্ষে কেমন করবে ২৫ প্রবাসী খেলোয়াড়ে সমৃদ্ধ ‘কুরাসাও’
পর্ব ৯: ড্র-জ্বর ছড়াচ্ছে বিশ্বকাপে, রেহাই পাচ্ছে না কোনো পরাশক্তিই
পর্ব ১০: ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার যেসব ঘটনায় হাসবেন-কাঁদবেন আবার ঝগড়াও করবেন
পর্ব ১১: ২০২৬ বিশ্বকাপের ১৩ তারকা, যাদের বাবারাও খেলেছিলেন বিশ্বকাপ







