বোস্টনের ফক্সবরো স্টেডিয়াম, জার্মানি-প্যারাগুয়ের নকআউট পর্বের ম্যাচ। জোনাথান তাহ বল বসালেন ১২ গজ দূরের সাদা স্পটে। কিছুক্ষণ আগেই ভিএআর তাঁর হেডে করা গোল বাতিল করেছে, নইলে জার্মানি হয়তো এতক্ষণে জয়ের উৎসব করত। এখন সাডেন ডেথ, তাঁর পায়েই দলের ভাগ্য। দৌড় দিলেন, শট নিলেন, আর বল ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে পড়ল গ্যালারিতে। পরের শটে প্যারাগুয়ের হোসে কানালে ভুল করলেন না। চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি বিদায়, তাও রাউন্ড অব ৩২ থেকে, তাও ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৩১ ধাপ পেছনের এক দলের কাছে।

একই দিনে হাজার মাইল দূরে মেক্সিকোর মন্টেরেইতে আরেক পরাশক্তির সর্বনাশ করল সেই একই ১২ গজ। মরক্কোর কাছে টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নিল নেদারল্যান্ডস।
এক রাতেই দুই ইউরোপীয় জায়ান্টের বিদায়, দুটোই টাইব্রেকার বা পেনাল্টি শুটআউটে। ফুটবল আবার মনে করিয়ে দিল, ৯০ মিনিটে যত কৌশলই থাকুক, শেষ বিচার মাঝে মাঝে হয় সবচেয়ে নির্মম আদালতে। যেখানে উকিল নেই, আপিল নেই। আছেন শুধু একজন শুটার, একজন গোলকিপার, আর মাঝখানে ১২ গজের শূন্যতা।
কেন এত কঠিন এই ১২ গজ?
কাগজে-কলমে পেনাল্টি শুটারের জন্য সহজতম কাজ। গোলপোস্ট ৮ গজ চওড়া, ৮ ফুট উঁচু। অনুশীলনে পেশাদার ফুটবলাররা এই শট প্রায় মিসই করেন না। তাহলে বিশ্বকাপের মঞ্চে সেরাদের পা কেঁপে যায় কেন?
উত্তর লুকিয়ে আছে মাথার ভেতরে। নরওয়ের ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানী গেইর জর্ডেট বছরের পর বছর শুটআউট নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন, ব্যর্থতার বড় কারণ দক্ষতার অভাব নয়, চাপের মুখে আচরণ বদলে যাওয়া। যে খেলোয়াড় রেফারির বাঁশির পর তাড়াহুড়ো করে শট নেন, যিনি গোলকিপারের দিকে না তাকিয়ে চোখ নামিয়ে রাখেন, তাঁর মিস করার সম্ভাবনা অনেক বেশি। জর্ডেটের ভাষায় এটা ‘এড়িয়ে যাওয়ার মনস্তত্ত্ব’, কঠিন মুহূর্তটা যত দ্রুত সম্ভব শেষ করে ফেলার তাড়া। সেই তাড়াই ডেকে আনে সর্বনাশ।
মজার ব্যাপার, এই লড়াইয়ে গোলকিপারের হারানোর কিছু নেই। শট ঠেকাতে না পারলে কেউ তাঁকে দোষ দেয় না, ঠেকালে তিনি জাতীয় বীর। শুটারের হিসাব ঠিক উল্টো। গোল করলে সেটা ‘স্বাভাবিক’, মিস করলে সেই মুখ মানুষ মনে রাখে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তাই পেনাল্টি আসলে স্কিলের পরীক্ষা নয়, সাহসের পরীক্ষা। ওই ৩০ সেকেন্ডে জিততে হয় নিজের ভয়ের বিরুদ্ধে।
২০২৬: এক রাতের দুই ট্র্যাজেডি
ফক্সবরোতে জার্মানি-প্যারাগুয়ে ম্যাচ শেষ হয়েছিল ১-১ সমতায়। হুলিও এনসিসোর গোলে পিছিয়ে পড়ে কাই হাভার্টজের হেডে সমতায় ফেরে জার্মানি। এরপর শুটআউটে হাভার্টজ আর নিক ভলটেমাদে দুজনেই ব্যর্থ প্যারাগুয়ের গোলকিপার অরলান্দো গিলের সামনে। ম্যানুয়েল নয়্যার ফাবিয়ান বালবুয়েনার শট ঠেকিয়ে দলকে বাঁচিয়ে রাখলেও শেষরক্ষা হয়নি। তাহর শট আকাশে উড়ল, আর ইতিহাস লেখা হয়ে গেল: বিশ্বকাপে এই প্রথম পেনাল্টি শুটআউটে হারল জার্মানি। যে দল টাইব্রেকারকে বানিয়ে ফেলেছিল নিজেদের সম্পত্তি, ১৯৭৬ ইউরো ফাইনালের পর বড় টুর্নামেন্টে টানা ছয়টি শুটআউট জিতেছিল যারা, তারাই ভেঙে পড়ল সবচেয়ে অচেনা প্রতিপক্ষের সামনে। ম্যাচ শেষে গিল জানালেন তাঁর সাফল্যের রহস্য, প্রতিটি জার্মান শুটারের খুঁটিনাটি আগেই বিশ্লেষণ করে রেখেছিলেন তিনি।
মন্টেরেইয়ের গল্প আরও করুণ, কারণ সেখানে জড়িয়ে আছে রক্তের উত্তরাধিকার। অতিরিক্ত সময়ের শেষদিকে ডাচ কোচ রোনাল্ড কুমান মাঠে নামান জাস্টিন ক্লুইভার্টকে। ম্যাচ শেষে কুমান নিজেই বলেছেন, শুটআউটের কথা ভেবেই এই বদল, কারণ জাস্টিন পেনাল্টিতে দলের সেরাদের একজন। অথচ সেই জাস্টিনের শটই লাগল পোস্টে। কুইন্টেন টিমবার মারলেন বাইরে, ক্রিসেনসিও সামারভিলের দুর্বল শট ঠেকালেন ইয়াসিন বোনো। ইসমাইল সাইবারির শেষ শটে মরক্কো চলে গেল শেষ ষোলোয়।
জাস্টিনের বাবার নামটা মনে আছে তো? প্যাট্রিক ক্লুইভার্ট। ২০০০ ইউরোর সেমিফাইনালে ইতালির বিপক্ষে ম্যাচের মধ্যেই পেনাল্টি মিস করেছিলেন, সেই ম্যাচও নেদারল্যান্ডস হেরেছিল টাইব্রেকারে। ছাব্বিশ বছর পর ছেলের পায়ে ফিরে এল বাবার অভিশাপ। ডাচদের পরিসংখ্যান এখন রীতিমতো দুঃস্বপ্ন: ইতিহাসে ১০ শুটআউটের ৮টিতেই হার, আর টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ থেকে বিদায় সেই পেনাল্টিতেই।
ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম মুহূর্তগুলো
বিশ্বকাপে টাইব্রেকার বা পেনাল্টি শুটআউটের বয়স মাত্র চার দশক। এর মধ্যেই সে জমিয়ে ফেলেছে চোখের জলের বিশাল এক সংগ্রহ।
শুরু ১৯৮২ সালে, সেভিয়ার সেই মহাকাব্যিক সেমিফাইনালে। পশ্চিম জার্মানি বনাম ফ্রান্স, ৩-৩ গোলের রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম শুটআউট। ম্যাচের মধ্যে ফরাসি ডিফেন্ডার প্যাট্রিক বাতিস্তোঁকে ভয়ংকরভাবে আহত করা জার্মান গোলকিপার হারাল্ড শুমাখারই শেষে হয়ে উঠলেন টাইব্রেকারের নায়ক। ফুটবল সেদিনই বুঝে গেল, এই নতুন নিয়ম শুধু ফলাফল নয়, নাটকও উপহার দেবে।
১৯৯০ সালে তুরিনের সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে মিস করলেন ইংল্যান্ডের স্টুয়ার্ট পিয়ার্স আর ক্রিস ওয়াডল। সেই ম্যাচেই হলুদ কার্ডে ফাইনাল খেলার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া পল গাসকয়েনের কান্না আজও বিশ্বকাপের অন্যতম আবেগঘন ছবি। ইংল্যান্ডের পেনাল্টি-দুঃখের সেই শুরু। ১৯৯৮ সালে সেন্ট এতিয়েনে ডেভিড ব্যাটির মিসে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে সেই দুঃখ পেল নতুন অধ্যায়।
তবে পেনাল্টি ট্র্যাজেডির কথা উঠলেই সবার আগে ভেসে ওঠে একটাই ছবি। ১৯৯৪, পাসাডেনার রোজ বোল, বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিল বনাম ইতালি। পুরো টুর্নামেন্টে ইতালিকে প্রায় একা টেনে আনা রবার্তো বাজ্জিও দাঁড়ালেন স্পটে। শট উড়ে গেল ক্রসবারের ওপর দিয়ে।
ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন, আর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বাজ্জিও হয়ে গেলেন ফুটবলের চিরকালীন বিষাদের প্রতীক। পরে অবশ্য বাজ্জিও বলেছিলেন, পেনাল্টি মিস করে শুধু তারাই, যাদের শট নেওয়ার সাহস আছে।
২০০৬ সালে বার্লিনের কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মান গোলকিপার ইয়েনস লেহমান মোজায় গুঁজে রেখেছিলেন এক টুকরো কাগজ। আর্জেন্টাইন শুটারদের পছন্দের দিক লেখা সেই ‘চিটশিট’ দেখে দেখে ঠেকালেন দুটি শট।
আর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ তো ছিল এমিলিয়ানো মার্টিনেজের একার মঞ্চ। কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে স্নায়ুযুদ্ধে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়া, তারপর ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে কোলো মুয়ানির শট পা দিয়ে ঠেকানো, টাইব্রেকারে কিংসলে কোমানের শট রুখে দেওয়া।
ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফাইনালের ফয়সালা হয়েছিল এই ১২ গজেই, মেসির হাতে উঠেছিল সোনার ট্রফি। ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে সেই রাতের উল্লাস নিশ্চয়ই এখনও ভোলেননি দেশের আর্জেন্টিনা ভক্তরা।

নায়কও জন্ম দেয় এই টাইব্রেকার
মুদ্রার অন্য পিঠও আছে। যে ১২ গজ কারও জীবনে অভিশাপ, কারও জন্য তা অমরত্বের সিঁড়ি। ১৯৯০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় পছন্দের গোলকিপার সের্হিও গয়কোচিয়া যুগোস্লাভিয়া আর ইতালির বিপক্ষে টানা দুই শুটআউটে সেভ করে দলকে একাই তুললেন ফাইনালে। ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার দমিনিক লিভাকোভিচ জাপান আর ব্রাজিলের বিপক্ষে দুই শুটআউটে চারটি শট ঠেকিয়ে দেশকে নিলেন সেমিফাইনালে। শুমাখার, লেহমান, মার্টিনেজ, প্রত্যেকেই প্রমাণ, শুটআউট গোলকিপারদের জন্য ইতিহাসে ঢোকার শর্টকাট।
‘পেনাল্টি একটা লটারি’, সত্যি নাকি মিথ?
হেরে যাওয়া কোচদের প্রিয় সান্ত্বনা এই কথা। কিন্তু গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। ভাগ্যই যদি সব হতো, জার্মানি দশকের পর দশক শুটআউট জিতত না, নেদারল্যান্ডসও বারবার হারত না।
জর্ডেটসহ একাধিক গবেষকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রস্তুতি, শট নেওয়ার ক্রম, শুটারের শরীরী ভাষা আর চাপ সামলানোর অনুশীলন ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখে। গিল যেমন নেমেছিলেন প্রতিটি জার্মান শুটারের ভিডিও বিশ্লেষণ করে, লেহমান যেমন নেমেছিলেন কাগজের টুকরো নিয়ে।
অন্যদিকে মরক্কো ম্যাচের পর ডাচ কিংবদন্তি পিয়েরে ভ্যান হুইডঙ্ক ক্ষোভ ঝেড়েছেন নিজের দেশের শুটারদের অদ্ভুত রান-আপ নিয়ে। তাঁর সোজা কথা, বল বসাও, স্বাভাবিক দৌড়ে এসো, শট নাও। অর্থাৎ লটারি নয়, পেনাল্টি এমন এক পরীক্ষা যার প্রশ্ন আগে থেকেই জানা। শুধু উত্তর লিখতে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার হলে বসে।
ফুটবল ম্যাচে ৯০ মিনিটে একজন খেলোয়াড় বহু ভুল করে আবার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু ইতিহাস অনেক সময় তাঁকে মনে রাখে মাত্র একটি শটের জন্য। টাইব্রেকারের ১২ গজের সেই পথ কাউকে বানায় কিংবদন্তি, কাউকে বানায় আজীবনের ট্র্যাজেডির প্রতীক। বিশ্বকাপের পেনাল্টি শুটআউট তাই শুধু গোলের হিসাব নয়, মানুষের সাহস, ভয়, আত্মবিশ্বাস আর ভেঙে পড়ার সবচেয়ে নির্মম পরীক্ষাগুলোর একটি। ২০২৬ বিশ্বকাপ মাত্র শেষ ষোলোয় পা রেখেছে। কে জানে, এই নির্মম আদালতের কাঠগড়ায় সামনে আরও কাকে দাঁড়াতে হয়!
আরও পড়ুন:
পর্ব ১: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: মাঠে খেলা শুরুর আগেই বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা
পর্ব ২: বিশ্বকাপের বিলিয়ন ডলারের জার্সি বাণিজ্যে কেন নেই বাংলাদেশ?
পর্ব ৩: বল থেকে রেফারি: ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রযুক্তি যেভাবে বদলে দিচ্ছে সবকিছু
পর্ব ৪: ফুটবলের আড়ালে ক্ষমতার লড়াইয়ে আমেরিকা-চীন ও উপসাগরীয় শক্তি
পর্ব ৫: বিশ্বকাপের ৯৬ বছরে প্রথমবার, যে কীর্তি তিন ফুটবল মহাতারকার
পর্ব ৬: বিশ্বকাপে এশিয়ার ঝড়: জর্ডান-উজবেকিস্তান পারলে, বাংলাদেশ কেন নয়?
পর্ব ৭: পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের যে গল্পগুলো অনেকেই জানেন না
পর্ব ৮: জার্মানির বিপক্ষে কেমন করবে ২৫ প্রবাসী খেলোয়াড়ে সমৃদ্ধ ‘কুরাসাও’
পর্ব ৯: ড্র-জ্বর ছড়াচ্ছে বিশ্বকাপে, রেহাই পাচ্ছে না কোনো পরাশক্তিই
পর্ব ১০: ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার যেসব ঘটনায় হাসবেন-কাঁদবেন আবার ঝগড়াও করবেন
পর্ব ১১: ২০২৬ বিশ্বকাপের ১৩ তারকা, যাদের বাবারাও খেলেছিলেন বিশ্বকাপ
পর্ব ১২: ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো: হাজার গোলের পথে, আবারও জ্বলে ওঠার অপেক্ষায়
পর্ব ১৩: একজনে নির্ভরশীল নয়, পুরো দলের চেষ্টায় এগোচ্ছে ব্রাজিল
পর্ব ১৪: মেসি শুধু একা নন, আর্জেন্টিনায় আরও যারা জ্বলে উঠতে প্রস্তুত
পর্ব ১৫: অপরাজিত থেকেও বিশ্বকাপে ইরানের বিদায় যেন ‘বিতর্কের গল্প’
পর্ব ১৬: বিশ্বকাপ কে জিতবে, ৪ বিলিয়ন ডলারের প্রেডিকশন মার্কেটে এগিয়ে ‘৭ দেশ’








