মাঠের ঘাসে গুঁড়ি মেরে বসে পড়েছেন একজন, মুখ ঢাকা দুই হাতে। সতীর্থরা ঘিরে ধরেছেন, কেউ কাঁধে হাত রাখছেন, কেউ টেনে তুলতে চাইছেন। কিন্তু নেইমার উঠছেন না। ৫ জুলাইয়ের রাতে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রেফারির শেষ বাঁশিটা যখন বাজল, তখন শুধু একটা বিশ্বকাপ-স্বপ্নই ভাঙল না, ভাঙল এক তারকার ষোলো বছরের একটা আন্তর্জাতিক অধ্যায়ও।
ম্যাচের পরপরই ব্রাজিলের টেলিভিশন গ্লোবোকে ভেজা গলায় নেইমার বলে দিলেন সেই কথা, যার জন্য কেউই আসলে প্রস্তুত ছিল না। ‘আমি চেষ্টা করেছি, চেষ্টা করেছি। এখানেই শুরু করেছিলাম, এখানেই শেষ করলাম। সব শেষ এবার।’ কথাটার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত বৃত্ত। 
২০১০ সালের আগস্টে এই মেটলাইফেই যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে সেলেসাওয়ের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল আঠারো বছরের নেইমারের, প্রথম আন্তর্জাতিক গোলটাও এসেছিল সেই ম্যাচেই।
ঠিক ষোলো বছর পর একই ঘাসে দাঁড়িয়ে দেশের হয়ে খেলার ইতি টানলেন তিনি। মেটলাইফ থেকে মেটলাইফ।
শেষ ম্যাচটা অবশ্য তাঁর নিজের হাতে ছিল না। কাফের চোট সামলে বদলি হিসেবে নেমেছিলেন দ্বিতীয়ার্ধে, নরওয়ের আরলিং হলান্ডের জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে হেরে শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নেয় ব্রাজিল। শেষ দিকে একটা পেনাল্টি শোধ করেন নেইমার, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি। ১৯৯০ সালের পর এটাই পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের সবচেয়ে আগেভাগে বিশ্বকাপ-বিদায়। তবে এই একটা রাতের হিসাব দিয়ে নেইমারকে মাপা যাবে না। তাঁকে মাপতে হলে ফিরে তাকাতে হবে গোটা একটা প্রজন্মের দিকে।
রেকর্ডে মোড়া এক ক্যারিয়ার
সংখ্যাগুলোই বলে দেয় তিনি কী ছিলেন। ১৩০ ম্যাচ, ৮০ গোল, ৫৯ অ্যাসিস্ট। পেলের ৭৭ গোলকে পেছনে ফেলে তিনিই এখন ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা, আর ম্যাচের হিসেবে কেবল কাফুর (১৪২) পরেই দ্বিতীয়। শুধু তা-ই নয়, চারটি আলাদা বিশ্বকাপে (২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬) গোল করা মাত্র দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান তিনি, প্রথমজন সেই পেলেই। নরওয়ের বিপক্ষে বিদায়ী পেনাল্টিটাও ছিল তাঁর ৮০তম গোল, আবার ২০২৩ সালের পর জাতীয় দলের জার্সিতে প্রথম। প্রায় তিন বছরের গোলখরা কাটল বিদায়ের রাতেই, যেন গল্পটা নিজেই একটা কাব্যিক শেষ খুঁজে নিল।
যে দেশে দশ নম্বর জার্সিটার ওজন পেলে আর রোনালদিনহোর কাঁধ থেকে নেমে আসে, সেই ভার এক দশকের বেশি সময় একা বয়ে গেছেন নেইমার। মেসি আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর যুগে বিশ্বফুটবলের তৃতীয় নামটা তিনিই, এই কথা একসময় প্রায় প্রশ্নাতীত ছিল।
দেশের জন্য যা দিয়ে গেলেন
নেইমারের সবচেয়ে বড় অবদান হয়তো একটা ট্রফির চেয়েও বড়। ২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর ব্রাজিলের ফুটবল যখন আত্মবিশ্বাসের তলানিতে, তখন সেলেসাওকে আবার মাথা তুলে দাঁড় করানোর কাজটা মূলত তাঁকেই সামলাতে হয়েছে। ২০১৩ কনফেডারেশন্স কাপ জিতেছেন ঘরের মাঠে, হয়েছেন টুর্নামেন্টসেরা।
তবে দেশের মানুষের কাছে তাঁর সবচেয়ে দামি উপহার সম্ভবত ২০১৬-র রিও অলিম্পিক। ফুটবলের জন্মভূমি হয়েও অলিম্পিক সোনা যে দেশের কোনোদিন ঘরে ওঠেনি, ফাইনালে সেই জার্মানিরই বিপক্ষে টাইব্রেকারে শেষ শটটা জালে জড়িয়ে ব্রাজিলকে প্রথম অলিম্পিক ফুটবল-সোনা এনে দিয়েছিলেন নেইমারই।

ঘরের মাঠে, ২০১৪-র ক্ষত শুকানোর মলমও ছিল ওই এক গোল। বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার হয়ে যে গ্ল্যামারটা তিনি ব্রাজিলের সঙ্গে জুড়েছিলেন, তাতে গোটা একটা প্রজন্ম হলুদ জার্সির প্রেমে পড়েছে নতুন করে।
অধরাই থেকে গেল স্বপ্ন
তবু গল্পটা একটুখানি অপূর্ণ। যাঁকে ভাবা হয়েছিল বিশ্বকাপ-জয়ের নায়ক, তাঁর শোকেসে বিশ্বকাপ নেই, ব্যালন ডি’অরও নেই। আর এই অপূর্ণতার পেছনে সবচেয়ে বড় খলনায়কের নাম চোট। ২০১৪-র ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার হুয়ান সুনিগার হাঁটুর গুঁতোয় মেরুদণ্ডে চিড়, স্ট্রেচারে মাঠছাড়া, সেখানেই থেমে যায় তাঁর স্বপ্নের দৌড়।
২০২২-এ ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে পেলেকে ছোঁয়া গোল করেও টাইব্রেকারে বিদায়, আবার সেই চেনা কান্না। এরপর ২০২৩-এর অক্টোবরে এসিএল ছিঁড়ে দীর্ঘ পুনর্বাসন, আর এবার মে মাসে সান্তোসে কাফের চোট, যা তাঁকে এই বিশ্বকাপে নামিয়ে দেয় নিছক দুই ম্যাচের বদলি খেলোয়াড়ে।
কোচ কার্লো আনচেলত্তি অবশ্য একে শেষ ভাবছেন না। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এই হার শেষ নয়, বরং নতুন এক চক্রের শুরু।’ প্রজন্মবদলের এই ক্ষণে ব্রাজিলকে এগিয়ে নেওয়ার ভার এবার ভিনিসিয়াস, রাফিনিয়া আর এনড্রিকদের কাঁধে।
বাংলাদেশেও এই বিদায়ের ধাক্কাটা কম নয়। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার চিরন্তন বিভাজনে হলুদ-সবুজ শিবিরের কাছে এক প্রজন্ম বড় হয়েছে নেইমারকে দেখেই। জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁকে আর দেখা যাবে না, এই সত্যিটা মেনে নিতে বাংলাদেশের শহরগ্রামের অনেক সমর্থকের বুক ভার হয়ে থাকবে দীর্ঘসময়।
নেইমার হয়তো বিশ্বকাপটা কোনোদিন ছুঁতে পারেননি। তবু এক দশকের বেশি সময় ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন তিনিই, দিয়ে গেছেন অলিম্পিক সোনা, একটা প্রজন্মের স্বপ্ন আর অজস্র মুগ্ধতার মুহূর্ত। মাঠের ঘাসে বসে থাকা সেই কান্নাভেজা মুখটাই হয়তো তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে নিখুঁত প্রতীক, প্রতিভায় ভরপুর, কিন্তু স্বপ্নপূরণে একটুখানি অপূর্ণ।








