এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
১৪ জুন রাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনের মাঠে যা ঘটতে যাচ্ছে, সেটা ফুটবলের রূপকথা ছাড়া আর কিছু নয়। ক্যারিবিয়ান সাগরের বুকে ক্ষুদ্র এক দ্বীপরাষ্ট্র ‘কুরাসাও’, যেখানকার মোট জনসংখ্যা মাত্র দেড় লাখের মতো, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখছে। আর প্রথম ম্যাচেই তাদের প্রতিপক্ষ চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি।
আয়তন আর জনসংখ্যা দুই হিসেবেই কুরাসাও বিশ্বকাপের ইতিহাসে যোগ্যতা অর্জন করা সবচেয়ে ছোট দেশ। তাদের ডাগআউটে বসে থাকবেন ৭৮ বছরের ডাচ কোচ ‘ডিক আদভোকাট’, যিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক কোচ হতে যাচ্ছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, ৪৪৪ বর্গকিলোমিটার আকারের দেড় লাখ মানুষের একটা দ্বীপ ( ঢাকা সিটির চেয়ে একটু বড়) কীভাবে গোটা দুনিয়ার সেরা দলগুলোর সঙ্গে এক মঞ্চে এসে দাঁড়াল? উত্তরটা একটা শব্দেই লুকিয়ে আছে, ‘অভিবাসন’।
কুরাসাওর ২৬ জনের দলের প্রায় সবাই, ২৫ জনই জন্মেছেন নেদারল্যান্ডসে। কুরাসাও দীর্ঘদিন ডাচ শাসনের অধীনে ছিল। এখনো এটি নেদারল্যান্ডস রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত একটি স্বায়ত্তশাসিত দেশ। আর সেই সূত্রে ডাচ মাটিতে জন্মানো ও বেড়ে ওঠা কুরাসাও-বংশোদ্ভূত ফুটবলাররা আজ বাপ-দাদার দ্বীপের জার্সি গায়ে চাপিয়েছেন। শুধু স্থানীয়ভাবে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়দের নিয়ে কুরাসাওর বিশ্বকাপে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হতো। প্রবাসী প্রজন্মই বদলে দিয়েছে গোটা হিসাব।

আর কুরাসাওতে প্রবাসী খেলোয়াড় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মরক্কো পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিপক্ষে এমন দুর্দান্ত ফুটবল খেলল যে ১-১ গোলে ড্র করে ফিরল। আর সেই মরক্কোও বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে এমন শুরুর একাদশ নামাল যাদের প্রত্যেকের জন্ম দেশের বাইরে, ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম আর কানাডায়।
দুটো একদম আলাদা গল্প, কিন্তু পদ্ধতি একটাই। বিদেশে জন্মানো ফুটবলাররা শুধু স্কোয়াডের গভীরতাই বাড়ায় না, তারা বদলে দিতে পারে একটা গোটা দেশের খেলার মান আর ধরন।
বিশ্বকাপের এক চতুর্থাংশ খেলোয়াড় খেলছেন জন্মভূমির বাইরে
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্রেশন অবজারভেটরির গবেষণা বলছে, এবারের বিশ্বকাপে বাছাই হওয়া ১,২৪৮ জন খেলোয়াড়ের প্রায় এক চতুর্থাংশ, অর্থাৎ ২৩.৬ শতাংশ জন্মেছেন এমন এক দেশে যেদেশের হয়ে তারা খেলছেন না। টেলিমুন্ডোর বিশ্লেষক হাইমে মাসিয়াসের হিসাবে সংখ্যাটা ২৮৯ জন, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
ব্যাপারটা একদম নতুনও নয়, ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপেও প্রায় ১২ শতাংশ খেলোয়াড় খেলেছিলেন জন্মভূমি ছাড়া অন্য দেশের হয়ে। ১২ শতাংশ থেকে আজকে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে প্রায় ২৪ শতাংশে পৌঁছানোই বিশ্বায়নের বদলে দেওয়া ফুটবল মানচিত্রের প্রতিচ্ছবি।
সবচেয়ে চমকপ্রদ সংখ্যাগুলো অবশ্য লুকিয়ে আলাদা আলাদা দলের ভেতরে। অক্সফোর্ডের হিসাবে এবার ৪৮ দলের অন্তত আটটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ খেলোয়াড়েরই জন্ম দেশের বাইরে। শীর্ষে থাকা দলগুলো এমন:
কুরাসাও দলে ৯৬%, ডিআর কঙ্গো দলে ৮৫% এবং মরক্কো দলে ৭৩% খেলোয়াড়ই ওইসব দেশের বাইরে জন্মেছেন |

প্রবাহটা কোনদিক থেকে কোনদিকে
এই তথ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো প্রবাহ, কোন দেশ থেকে খেলোয়াড় যাচ্ছেন কোন দেশে। আর এখানে সবার আগে আসে ফ্রান্সের নাম। গবেষক মাসিয়াসের হিসাবে শুধু ফ্রান্সে জন্মানো ৭৫ জন খেলোয়াড় এবার খেলছেন অন্য দেশের হয়ে, মূলত তিউনিসিয়া, হাইতি, আলজেরিয়া, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট আর ঘানার জার্সিতে। এটা কাকতালীয় নয়, ফ্রান্সের সঙ্গে উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকার ঔপনিবেশিক সম্পর্কের সরাসরি ফসল। ঠিক যেমন কুরাসাও-নেদারল্যান্ডস সম্পর্ক, কিংবা ইংল্যান্ডের সঙ্গে আফ্রিকা-ক্যারিবিয়ানের সাবেক উপনিবেশগুলোর যোগ। শতবর্ষের অভিবাসন ও ঔপনিবেশিক ইতিহাসের মানচিত্রই যেন আজ ফুটে উঠছে ফুটবলের মাঠে।
এত কিছু সম্ভব হচ্ছে ফিফার যোগ্যতার নিয়মের কারণে, যা শোনা যত কড়া আসলে তত নয়। কারও বাবা-মা কিংবা এমনকি একজন দাদা-দাদি বা নানা-নানি বিদেশে জন্মালেই সেই দেশের হয়ে খেলার যোগ্যতা মেলে, সেখানে কখনো বসবাস না করলেও। আর ২০২১ সালের পর নিয়ম আরও কিছুটা শিথিল হওয়ায় ইউরোপের একাডেমিতে বেড়ে ওঠা অনেক তরুণের পক্ষে বাপ-দাদার দেশকে বেছে নেওয়া সহজ হয়েছে।

অক্সফোর্ডের গবেষণায় দেখা গেছে, মরক্কোর বিদেশে জন্মানো খেলোয়াড়দের প্রায় অর্ধেক শুরু থেকেই মরক্কোকে বেছেছেন। এর পেছনে কয়েক দশকের অভিবাসন-ইতিহাস আর শিকড়ের টান। অনেক খেলোয়াড়কেই একসময় প্রশ্নটির মুখোমুখি হতে হয়, ‘আমি আসলে কোথাকার?’
ক্রোয়েশিয়ার ইভান রাকিতিচের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সুইজারল্যান্ডে, অথচ তিনি বেছে নিয়েছিলেন ক্রোয়েশিয়াকে, কারণ তার ভাষায়, মন বলেছিল ক্রোয়েশিয়ার হয়েই খেলা উচিত। জন্মভূমি একটা, শিকড় আরেকটা, এই দোটানাই আজকের ফুটবলের সবচেয়ে মানবিক গল্প।
এই ফুটবল অভিবাসন কি সত্যিই কাজের
স্বাভাবিক প্রশ্ন, এত প্রবাসী খেলোয়াড় নিয়ে কি সত্যিই দল ভালো করে? বিষয়টি নিয়ে গবেষণা সীমিত হলেও প্রাপ্ত তথ্য বলছে, উত্তরটা অন্তত আংশিকভাবে ‘হ্যাঁ’। ১৯৭০ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত প্রতিটি বিশ্বকাপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যে দলে বিদেশে জন্মানো খেলোয়াড় বেশি, তারা গড়ে টুর্নামেন্টে তত বেশি দূর এগোয়। এর কারণ দুটি, এক, অভিবাসন খেলোয়াড় বাছাইয়ের পরিধি বাড়ায়, আর দুই, বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী থেকে বিভিন্ন পজিশনের জন্য মানানসই খেলোয়াড় পাওয়া সহজ হয়। কুরাসাও বা মরক্কোর ক্ষেত্রে এটাই মূল কথা, ছোট জনসংখ্যার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে তারা হাত বাড়িয়েছে ইউরোপের সেরা একাডেমিগুলোর দিকে।

তবে এর একটা শক্ত পাল্টা-যুক্তিও আছে, আর সেটা আমাদের খুব চেনা। অক্সফোর্ড গবেষক আবার নিজেই মনে করিয়ে দিচ্ছে, আর্জেন্টিনা ২০২২ বিশ্বকাপ জিতেছিল স্কোয়াডে একজনও বিদেশে-জন্মানো খেলোয়াড় ছাড়া। অভিবাসী বা প্রবাসী ফুটবলার খেলার মান বাড়াতে পারে, কিন্তু শিরোপার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। এটি অবশ্য নতুন নয়, ফিফার হিসাবে বিদেশে জন্মে বিভিন্ন দেশের হয়ে বিশ্বকাপজয়ী ২২ জনের ১১ জনই ইতালির, ১৯৩৪ সালে ইতালি তো ৭ জন বিদেশে-জন্মানো খেলোয়াড় নিয়েই বিশ্বকাপ জিতেছিল।
এই গল্প এখন বাংলাদেশেরও
দূরের ফুটবল মনে হলেও এই গল্পের সঙ্গে আমাদের যোগ এখন সরাসরি। ঠিক যে কৌশলে কুরাসাও বা মরক্কো বদলে গেছে, সেই একই পথে হাঁটছে বাংলাদেশও।
ডেনমার্কের উন্নত ফুটবল পরিবেশ থেকে আসা অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়ার দেখানো পথে আসতে শুরু করেছেন বহু প্রবাসী খেলোয়াড়। ইংল্যান্ডের লাফবোরোতে জন্মানো, লেস্টার সিটিতে বেড়ে ওঠা হামজা চৌধুরী এখন খেলছেন বাংলাদেশের হয়ে, যার শিকড় হবিগঞ্জে। কানাডার এডমন্টনে জন্মানো শামিত শোম, যার শিকড় শ্রীমঙ্গলে, একসময় কানাডার হয়ে খেলেও এখন লাল-সবুজ জার্সিতে। সঙ্গে যোগ দিয়েছেন ইতালিতে বেড়ে ওঠা ফাহামিদুল ইসলাম, রায়ান ও কিউবা ব্রাদার্সসহ আরও কয়েকজন। তাদের অন্তর্ভুক্তির পর ট্রান্সফারমার্কটের হিসাবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে মূল্যবান জাতীয় দলে পরিণত হয়েছে, আর স্টেডিয়ামে ফিরেছে এমন ভিড় যা বছরের পর বছর দেখা যায়নি।
মজার ব্যাপার, এই প্রবাসী খেলোয়াড়রা শুধু দলের মানই বাড়াচ্ছেন না, বদলে দিচ্ছেন সমর্থকদের মনও। বাংলাদেশের এক একটি জয়ের পরে বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে তারা। কুরাসাও, মরক্কো কিংবা বাংলাদেশ, গল্পটা শেষ পর্যন্ত একই। জন্ম যেখানেই হোক, হৃদয় যে দেশের জার্সিকে আপন বলে, মাঠে শেষ পর্যন্ত সেই জার্সিই গায়ে ওঠে। আর গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে ‘জাতীয় দল’ শব্দটার মানেও বুঝি নতুন করে লেখা হচ্ছে ঠিক এভাবেই।
আগের পর্বগুলো পড়ুন:
পর্ব ১: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: মাঠে খেলা শুরুর আগেই বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা
পর্ব ২: বিশ্বকাপের বিলিয়ন ডলারের জার্সি বাণিজ্যে কেন নেই বাংলাদেশ?
পর্ব ৩: বল থেকে রেফারি: ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রযুক্তি যেভাবে বদলে দিচ্ছে সবকিছু
পর্ব ৪: ফুটবলের আড়ালে ক্ষমতার লড়াইয়ে আমেরিকা-চীন ও উপসাগরীয় শক্তি
পর্ব ৫: বিশ্বকাপের ৯৬ বছরে প্রথমবার, যে কীর্তি তিন ফুটবল মহাতারকার
পর্ব ৬: বিশ্বকাপে এশিয়ার ঝড়: জর্ডান-উজবেকিস্তান পারলে, বাংলাদেশ কেন নয়?
পর্ব ৭: পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের যে গল্পগুলো অনেকেই জানেন না







