এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে মাঠে এখনো বল গড়ায়নি, রেফারির বাঁশিও বাজেনি। কিন্তু এরই মধ্যে ফিফা প্রায় ৮.৯ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব নিশ্চিত করে ফেলেছে।
আগামী ১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে শুরু হবে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই আসর। ১৯ জুলাইয়ের ফাইনাল পর্যন্ত ৩৯ দিনে ৪৮টি দেশ খেলবে ১০৪টি ম্যাচ। কিন্তু বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতাগুলোর একটি ইতোমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। আর সেই প্রতিযোগিতা মাঠে নয়, হয়েছে বিশ্বের নামকরা সব কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের বোর্ডরুমে।
কার লোগো মাঠের পাশে দেখা যাবে, কোন ব্র্যান্ড বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শকের সামনে নিজেদের তুলে ধরবে, কারা ফিফার আনুষ্ঠানিক অংশীদার হবে, সেই লড়াই শেষ হয়েছে অনেক আগেই। আর সেই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছে মাত্র ১৫টি প্রতিষ্ঠান। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম ফিফার সব স্পন্সরশিপ স্লট পুরোপুরি বিক্রি হয়ে গেছে।
এখন ফুটবল শুধু ফুটবল নয়, এটি বিশ্বের কোটি কোটি চোখের জন্য সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনী মঞ্চও বটে।
৮.৯ বিলিয়ন ডলার কোথা থেকে আসছে?
বিশ্বকাপের আয় মূলত তিনটি বড় খাত থেকে আসে। সম্প্রচার স্বত্ব, স্পন্সরশিপ এবং টিকিট ও আতিথেয়তা প্যাকেজ।
বাজার বিশ্লেষকদের (Ampere Analysis) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপে সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি থেকে আসতে পারে প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার। স্পন্সরশিপ থেকে ২.৪ থেকে ২.৭ বিলিয়ন ডলার। আর টিকিট বিক্রি ও আতিথেয়তা প্যাকেজ থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ বিশ্বকাপের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ স্টেডিয়াম নয়, বলও নয়। সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো দর্শক।
পৃথিবীর আর কোনো ক্রীড়া আসর একসঙ্গে এত মানুষের নজর কেড়ে নিতে পারে না। সেই কারণেই সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানগুলো বিলিয়ন ডলার খরচ করে সম্প্রচার স্বত্ব কিনে। একই কারণে বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে মাঠের পাশে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করে।
ফুটবল থেকে ব্যবসা: গত ১৬ বছরের যাত্রা
বিশ্বকাপ যে শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, বরং একটি বৈশ্বিক ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত হয়েছে, তা বোঝা যায় আয়ের পরিসংখ্যানেই।
ফিফার বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ চক্রে ফিফার আয় ছিল প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার। ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪.৮ বিলিয়ন ডলারে। ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপ সেই অঙ্ক নিয়ে যায় ৫.৪ বিলিয়ন ডলারে। কাতার ২০২২ বিশ্বকাপে আয় প্রথমবারের মতো ৭.৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে।
এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই রেকর্ডও ভাঙতে যাচ্ছে।
এর পেছনে রয়েছে তিনটি বড় কারণ। অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা ৩২ থেকে বেড়ে ৪৮ হওয়া, ম্যাচ সংখ্যা ৬৪ থেকে বেড়ে ১০৪ এ পৌঁছানো এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে উত্তর আমেরিকার বিশাল ক্রীড়া বাজারের সম্পৃক্ততা।
মাত্র ১৬ বছরে বিশ্বকাপের অর্থনীতি আড়াই গুণেরও বেশি বড় হয়েছে।

আমেরিকার হাতে চাবিকাঠি
২০২৬ বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক গল্পে যুক্তরাষ্ট্র একটি আলাদা অধ্যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো মোট স্পন্সরশিপ আয়ের প্রায় ৫২ শতাংশের জোগান দিচ্ছে। কাতার বিশ্বকাপে এই হার ছিল প্রায় ৩৬ শতাংশ।
ব্যাংক অব আমেরিকা কিংবা ডোরড্যাশের মতো নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশ তার একটি বড় কারণ।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রচার স্বত্বের মূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কারণ আমেরিকা শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন বাজারই নয়, সবচেয়ে ব্যয়বহুল ক্রীড়া সম্প্রচার বাজারগুলোরও একটি।
এই পরিবর্তন একটি বড় বাস্তবতার দিকেও ইঙ্গিত করে। ফুটবলের জন্ম ইউরোপে, কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক বাজার ধীরে ধীরে আটলান্টিকের অন্য পাশে সরে যাচ্ছে।
তিন স্তরের রাজত্ব: কারা চালাচ্ছে কর্পোরেট বিশ্বকাপ?
ফিফার স্পন্সরশিপ কাঠামো অনেকটা ফুটবলের পিরামিডের মতো। যত ওপরে উঠবেন, তত বেশি সুযোগ, তত বেশি প্রভাব, তত বেশি মূল্য। সবচেয়ে উপরে রয়েছে ফিফার বৈশ্বিক অংশীদাররা। এই স্তরে আছে অ্যাডিডাস, কোকা-কোলা, আরামকো, হুন্দাই-কিয়া, লেনোভো, কাতার এয়ারওয়েজ এবং ভিসা।
এর নিচে রয়েছে বিশ্বকাপভিত্তিক স্পন্সররা। এই তালিকায় আছে ম্যাকডোনাল্ডস, ব্যাংক অব আমেরিকা, ফ্রিটো-লে, হিসেন্স, মেংনিউ, ইউনিলিভার এবং ভেরাইজন।
আরেকটি স্তরে রয়েছে আঞ্চলিক সহযোগীরা। তাদের মধ্যে আছে এয়ারবিএনবি, ডোরড্যাশ, দ্য হোম ডিপো, আমেরিকান এয়ারলাইন্স এবং ভ্যালভোলিন।
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একচেটিয়া অধিকার। মানে যখন ভিসা ফিফার অংশীদার, তখন মাস্টারকার্ড সেই জায়গা পাবে না। যখন কোকা-কোলা আছে, তখন পেপসির জন্য মাঠের দরজা কার্যত বন্ধ। মানে ব্যবসার প্রতিযোগিরা এখানেও প্রতিযোগি। এই একচেটিয়া উপস্থিতিই স্পন্সরশিপকে এত দামী করে তুলেছে।

পুরনো মুখ, নতুন হিসাব
ফিফার সঙ্গে সবচেয়ে দীর্ঘ সম্পর্ক কোকা-কোলার।
১৯৭৮ সাল থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপে প্রতিষ্ঠানটির উপস্থিতি রয়েছে। টানা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বকাপ আর কোকা-কোলা যেন একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অ্যাডিডাসের সম্পর্ক আরও গভীর। তারা শুধু স্পন্সর নয়, বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বলও তৈরি করে।
তবে এবারের সবচেয়ে আলোচিত নাম আরামকো। সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিটি বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তাদের অংশগ্রহণ ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় বিতর্কও।
তেলের টাকায় ফুটবল কলুষিত
আরামকোকে ঘিরে সমালোচকদের প্রশ্ন সহজ। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সংকট নিয়ে যখন পুরো বিশ্ব উদ্বিগ্ন, তখন ফিফা কেন একটি তেল কোম্পানির কাছ থেকে বিপুল অর্থ গ্রহণ করবে?
সমালোচকদের একাংশ এটিকে ‘স্পোর্টসওয়াশিং’-এর উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ খেলাধুলার মাধ্যমে কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা।
ফিফার অবস্থান অবশ্য ভিন্ন। তাদের দাবি, এই বাণিজ্যিক আয় থেকেই বিশ্বের ২১১টি সদস্য দেশে ফুটবল উন্নয়নের অর্থ আসে। বিশ্বকাপের অর্থ ছাড়া তৃণমূল থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত ফুটবলের বর্তমান কাঠামো পরিচালনা করা কঠিন।
তর্ক-বিতর্ক যাই থাকুক, আরামকোর উপস্থিতি ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত ব্যবসায়িক ঘটনা হয়ে থাকবে।
বঞ্চিত হচ্ছে খেলোয়াড়রা ?
২০১৪ বিশ্বকাপে স্পন্সরশিপ থেকে ফিফার আয় ছিল প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলার। ২০১৮ সালে তা সামান্য বেড়ে হয় ১.৬৫ বিলিয়ন ডলার। কাতার বিশ্বকাপ চক্রে মার্কেটিং আয় পৌঁছায় ১.৮ বিলিয়ন ডলারে। আর এবার শুধু স্পন্সরশিপ থেকেই আসছে প্রায় ২.৭ বিলিয়ন ডলার।
তুলনার জন্য আরেকটি সংখ্যা দেখা যাক।
বিশ্বকাপজয়ী দল পাবে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার। রানার্সআপ পাবে প্রায় ৩৩ মিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ মাঠে যারা খেলছে, তাদের জন্য নির্ধারিত পুরস্কার অর্থের চেয়ে বহু গুণ বেশি অর্থ ঘুরছে স্পন্সরশিপ বাজারে। মাঠে যেসব খেলোয়াড় ঘাম ঝরাচ্ছে আর যাদের খেলা দেখতে দর্শক সময়-অর্থ খরচ করছে, তাদের চেয়ে অনেক বেশি পাচ্ছে যারা কোম্পানির লোগো ব্যবহার করতে দিচ্ছে।
আধুনিক ফুটবলের অর্থনীতির সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যগুলোর একটি সম্ভবত এই বিষয়টিই!

ম্যাচ খেলার দিনে আয়: আরেকটি বিপ্লব
স্পন্সরশিপের বাইরে আরেকটি সংখ্যা চমকে দেওয়ার মতো। টিকিট বিক্রি ও আতিথেয়তা প্যাকেজ থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপে আয় হতে পারে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। কাতার ২০২২-এ এই খাত থেকে আয় হয়েছিল প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বৃদ্ধি দুই শত শতাংশেরও বেশি।
এর কারণও পরিষ্কার।
নিউইয়র্ক, ডালাস, লস অ্যাঞ্জেলেস কিংবা আটলান্টার মতো শহরগুলোতে বিশাল ধারণক্ষমতার স্টেডিয়াম রয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর আমেরিকার দর্শকরা ক্রীড়া আয়োজন ঘিরে ব্যয় করতেও অভ্যস্ত। ফলে ম্যাচডে আয়েও নতুন রেকর্ডের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
শেষ প্রশ্ন
ফিফার এই বাণিজ্যিক সাফল্যকে দুইভাবে দেখা যায়। একদিকে বলা যায়, এই আয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফুটবলের উন্নয়নে ব্যয় হয়। তৃণমূল পর্যায় থেকে বিশ্বকাপের মতো আসর পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে সচল রাখতে এই অর্থ অবশ্যই দরকার।
অন্যদিকে প্রশ্নও আছে। এই অর্থের কতটা সত্যিই মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়? কতটা ব্যবহার যায় প্রশাসনিক ও কর্পোরেট ব্যয়ের পেছনে?
এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। তবে একটি বিষয় নিয়ে দ্বিমতের সুযোগ কম। ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের ইতিহাসে নয়, বৈশ্বিক ব্যবসার ইতিহাসেও একটি মাইলফলক হয়ে থাকতে যাচ্ছে।
টাকার গল্প এখানেই শেষ নয়। বিশ্বকাপে মাঠে নামা ৪৮টি দেশের পরিচয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক তাদের জার্সি। কিন্তু সেই জার্সি কোথায় তৈরি হয়? কারা তৈরি করে? কোন দেশ সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়? আর মেসি, রোনালদো, নেইমার, এমবাপ্পে কিংবা ইয়ামালের গায়ে ওঠা সেই জার্সির পেছনে লুকিয়ে আছে কত বিলিয়ন ডলারের শিল্প?
পরের পর্বে সেই গল্প।







