ফুটবল

মেসি শুধু একা নন, আর্জেন্টিনায় আরও যারা জ্বলে উঠতে প্রস্তুত

আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের খেলোয়াড়রা গোল উদযাপন করছে. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের খেলোয়াড়রা গোল উদযাপন করছে, দর্শকরা আনন্দে মেতে উঠেছে।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ

ব্রাজিল, পর্তুগাল নয়তো জার্মানির সমর্থকেরা ইদানীং খুব বলছেন, লিওনেল মেসি ছাড়া আর্জেন্টিনা নাকি প্রায় অচল। দুই ম্যাচে দলের পাঁচ গোলের পাঁচটাই মেসির, তাই খোঁচাটা হয়তো একটু বেশিই শুনতে হচ্ছে। কিন্তু কিছু অতীত পরিসংখ্যান মনে করিয়ে দেই।

২০২৪ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল, প্রতিপক্ষ কলম্বিয়া। ৬৬ মিনিটে গোড়ালির চোটে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়লেন মেসি। গোটা আর্জেন্টিনা যেন থমকে গিয়েছিল।

অথচ ম্যাচ গড়াল অতিরিক্ত সময়ে, আর সেখানে লাউতারো মার্তিনেজের একমাত্র গোলেই শিরোপা উঠল আর্জেন্টিনার হাতে। মেসি তখন মাঠের বাইরে, বেঞ্চে বসা।

এটাই আসল কথা। মেসি এখন সব গোল করছেন বলে যারা ভাবছেন আর্জেন্টিনা একজনের দল, তারা ইতিহাসটা ভুলে যাচ্ছেন। মেসির সব গোল করা নির্ভরতা নয়, বাড়তি পাওয়া। কারণ যেদিন তার পা থেমে যায়, সেদিন জ্বলে ওঠার লোকের অভাব এই দলে কখনো ছিল না।

শুধু কোপার ফাইনাল নয়। গত বছরের বিশ্বকাপ বাছাইয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে তাদের মাঠে ৪-১ গোলে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা, সেই ম্যাচেও মেসি ছিলেন না। আর ২০২২ বিশ্বকাপের শিরোপাটাও এসেছিল অনেকের পায়ে। মেসি সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন ঠিকই, কিন্তু হুলিয়ান আলভারেজের চার গোল, ফাইনালে ডি মারিয়ার গোল, নকআউটে নাহুয়েল মোলিনার গোল, সব মিলিয়েই লেখা হয়েছিল কাতারের গল্প। প্রায় প্রতি ম্যাচেই নতুন কেউ দায়িত্ব নিয়েছিলেন। অতীত অভিজ্ঞতা আর পরিসংখ্যান, দুটোই তাই একই কথা বলে।

যে স্ট্রাইকারেরা মেসিকে ছাড়াই গোল চেনে

শুরুটা লাউতারো মার্তিনেজকে দিয়েই হোক, কারণ তিনিই এই দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকার। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর গোল ৩৬টি। ২০২৪ কোপা আমেরিকার সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি, পাঁচ গোলের বেশিরভাগই করেছেন বদলি নেমে, অর্থাৎ অল্প সময় পেয়েও গোল করার ক্ষমতাটা তাঁর সহজাত।

গত মৌসুমে ইন্টার মিলানের হয়ে সিরি ‘আ’-তেও সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন, ১৭ গোল নিয়ে। ইন্টারের আক্রমণের প্রাণ তিনিই, ক্লাব আর দেশ, দুই জায়গাতেই গোল তাঁর কাছে অভ্যাসের মতো। কোপার ফাইনালে চাপের মুহূর্তে করা ওই জয়সূচক গোলটাই বলে দেয়, বড় ম্যাচে তিনি কত ঠান্ডা মাথার।

তাঁর পাশে আছেন হুলিয়ান আলভারেজ। ২০২২ বিশ্বকাপের বিজয়ী অভিযানে মেসির পরে সবচেয়ে বড় নায়কদের একজন ছিলেন তিনি, পুরো টুর্নামেন্টে চার গোল, সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোলসহ। এখন আতলেতিকো মাদ্রিদে দারুণ ফর্মে আছেন, ক্লাবের হয়েও নিয়মিত গোল পাচ্ছেন। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ, সব জায়গাতেই সমান কার্যকর তিনি। অনেকেই বলছেন, এই বিশ্বকাপে মেসির পর আক্রমণের মূল ভার তাঁর কাঁধেই।

স্কালোনির হাতে লাউতারো আর আলভারেজ, দুজন আলাদা ধরনের স্ট্রাইকার। মজার ব্যাপার, এবারের আসরেও আলভারেজ প্রথম ম্যাচে চোট কাটিয়ে বদলি নেমেছিলেন, আর দ্বিতীয় ম্যাচে পুরো ফিট হয়ে ফিরেছেন। দরকার হলে দুজনকে একসঙ্গে খেলাতে পারেন স্কালোনি, আবার একজনকে বিশ্রাম দিয়ে আরেকজনকে দিয়েও কাজ চালাতে পারেন। এই সুবিধা টুর্নামেন্টের খুব কম দলেরই আছে।

সঙ্গে আছেন নিকোলাস গনসালেস, যিনি উইং আর আক্রমণ দুই জায়গাতেই খেলতে পারেন। প্রতিপক্ষের জন্য তাই আর্জেন্টিনার আক্রমণ ঠেকাতে শুধু মেসিকে আটকানোই যথেষ্ট নয়।

গোল করা ও করানো এক মাঝমাঠ

আর্জেন্টিনার আসল শক্তির জায়গা অনেকে বলেন তাদের মাঝমাঠ, আর সেটা শুধু রক্ষণের জন্য নয়। এনজো ফার্নান্দেজের কথাই ধরুন। ২০২২ বিশ্বকাপে সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়েছিলেন চেলসির এই মিডফিল্ডার, মেক্সিকোর বিপক্ষে তাঁর দূরের বাঁকানো গোলটা আজও সমর্থকদের মুখে মুখে ফেরে, ওই এক গোল সেদিন গোটা দলের আটকে যাওয়া দম ফিরিয়ে দিয়েছিল। খেলার গতি ঠিক করা, নিচ থেকে বল বাড়ানো, দরকারে বক্সে ঢুকে গোল করা, সবই পারেন তিনি।বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতিতে ফুটবল খেলোয়াড়দের দৃশ্য, গোলের জন্য লড়াই।. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

সঙ্গে আছেন লিভারপুলের আলেক্সিস মাক আলিস্তার। ২০২২ বিশ্বকাপে পোল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করেছিলেন তিনি, ফাইনালসহ গোটা টুর্নামেন্টে ছিলেন স্কালোনির আস্থার আরেক নাম। সৃষ্টিশীলতা আর পরিশ্রম, দুটোই আছে তাঁর খেলায়। ব্রাইটন থেকে লিভারপুল, প্রতিটা ধাপে নিজেকে প্রমাণ করেই উপরে উঠেছেন।

আর রদ্রিগো দে পল তো দলের ইঞ্জিন। স্কোরশিটে নাম কম ওঠে, কিন্তু মেসিকে ছায়ার মতো আগলে রাখা, প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভাঙা, আবার বল নিয়ে সামনে ছোটা, এই অক্লান্ত দৌড়টাই তাঁর কাজ। মাঠে তিনি না থাকলে দলের ছন্দটাই এলোমেলো হয়ে যায়। ২০২২ আর ২০২৪, দুই শিরোপাতেই তাঁর এই দৌড় ছিল দলের ভারসাম্যের চাবিকাঠি।Argentine footballer celebrating with crossed arms and a big smile. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

এই মাঝমাঠ শুধু মেসিকে বল জোগায় না, প্রয়োজনে নিজেরাও খেলার ভাগ্য বদলে দিতে জানে।

বড় ম্যাচের গোলরক্ষক, শিরোপাজয়ী রক্ষণ

ফুটবলে একটা কথা চালু আছে, বিশ্বকাপ জেতায় গোলরক্ষকেরা। আর আর্জেন্টিনার হাতে এমন একজন আছেন, যিনি বড় ম্যাচে একাই পার্থক্য গড়ে দেন, এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজ। ২০২২ বিশ্বকাপে সেরা গোলরক্ষকের গ্লাভস তাঁর।

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল আর ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনাল, দুটি টাইব্রেকারেই তাঁর হাত ধরে এসেছিল জয়। পেনাল্টি শুটআউটে তাঁর ঠান্ডা মাথা আর প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে চাপে ফেলার কৌশল প্রায় কিংবদন্তি পর্যায়ের। ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ালে আর্জেন্টিনা মনে মনে এগিয়েই থাকে।আর্জেন্টিনার ফুটবল গোলরক্ষক ডান পাশে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

সামনে নেতৃত্বে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো (ইনজুরি কাটিয়ে উঠছেন) আর অভিজ্ঞ নিকোলাস ওতামেন্দি। রোমেরো চোট নিয়ে কিছুটা শঙ্কায় থাকলেও তাঁর আগ্রাসী রক্ষণ আর ওতামেন্দির পোড় খাওয়া অভিজ্ঞতা মিলিয়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণ সহজে ভাঙে না।আর্জেন্টিনার ফুটবল খেলোয়াড়রা মাঠে উল্লাস করছে. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

এই রক্ষণই তো ২০২২ সালে শিরোপা এনে দিয়েছিল। গোল কম খাওয়া দল লম্বা টুর্নামেন্টে এমনিতেই এগিয়ে থাকে।

আর আছেন ‘দ্য স্কালোনি’

এত তারকাকে একসাথে রেখে ফলাফল বের করে আনার কারিগর লিওনেল স্কালোনি। ২০১৮ সালে যখন দায়িত্ব নেন, অভিজ্ঞতার অভাবে অনেকেই ভরসা পাননি। অথচ সেই স্কালোনিই আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছেন এক বিশ্বকাপ আর দুটি কোপা আমেরিকা, ঘুচিয়েছেন আটাশ বছরের শিরোপাখরা।

তার সবচেয়ে বড় গুণ, খেলোয়াড়দের জোর করে কোনো ছকে বাঁধেন না, হাতের খেলোয়াড় বুঝে ছক সাজান। কখনো ৪-৩-৩, কখনো দুই স্ট্রাইকার নিয়ে অন্য চেহারা, প্রতিপক্ষ বুঝে রূপ বদলায় তাঁর দল। এই নমনীয়তাই তাকে আলাদা করে। আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের কোচ ও খেলোয়াড়রা মাঠে আলোচনা করছে।. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

টানা দুই বিশ্বকাপ জিতলে তিনি হবেন ১৯৩৮ সালের পর প্রথম কোচ, যিনি এই কীর্তি গড়বেন।

বেঞ্চেও জমা আছে অস্ত্র

স্কালোনির আরেকটা বড় সুবিধা তার বেঞ্চ। তরুণ থিয়াগো আলমাদা গতিতে ভরপুর, একুশ বছরের নিকো পাজ এখন ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে, সঙ্গে আছেন জুলিয়ানো সিমেওনে আর লম্বা স্ট্রাইকার হোসে মানুয়েল লোপেজ।আর্জেন্টিনা ও আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ছবি, ফুটবল ম্যাচের মুহূর্ত. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

লম্বা টুর্নামেন্টে যখন চোট আর ক্লান্তি জমে, তখন এই গভীরতাই বড় দলগুলোকে এগিয়ে রাখে। একাদশের বাইরে থেকেও যাদের মান পড়ে না, সেই দলই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।

তাহলে এখন শুধু মেসিই কেন গোল পাচ্ছেন?

প্রশ্নটা ওঠা স্বাভাবিক। এত তারকা থাকলে ম্যাচে শুধু মেসিই গোল করলেন কেন? উত্তরটা সহজ। মেসি দুই ম্যাচেই ছিলেন দুর্দান্ত, আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক আর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলকে এত সহজে জিতিয়েছেন যে বাকিদের আলাদা করে জ্বলে ওঠার দরকারই পড়েনি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, স্কালোনি বরং তারকাদের পা বাঁচিয়ে রেখেছেন, ঘুরিয়ে খেলিয়েছেন, নকআউটের জন্য শক্তি জমিয়ে রেখেছেন।

গোল না পাওয়া আর গোল করতে না পারা, এক জিনিস নয়। ২৭ জুন জর্ডানের বিপক্ষে মেসিকে বিশ্রাম দেওয়া হবে (প্রথম একাদশে থাকবেন না), আর তখনই হয়তো লাউতারো-আলভারেজদের নামের পাশে যোগ হবে নতুন গোল। সুযোগ পেলেই যে তারা কাজে লাগান, সেটা অতীতে বহুবার দেখা গেছে।

সামনে নকআউট, সামনে আসল পরীক্ষা

গ্রুপ পর্বের সহজ অঙ্ক শেষ, এবার শুরু আসল লড়াই। আর্জেন্টিনা মাঠে নামছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দল হিসেবে। স্কালোনির সামনে টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের হাতছানি, যা ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর আর কেউ পারেনি। কিন্তু পথটা সহজ নয়, নকআউটে প্রতিটা ভুলের শাস্তি মেলে সঙ্গে সঙ্গে।

আর এই নকআউটেই কথাটা সত্যি হয়ে উঠবে। প্রতিপক্ষ এখন মেসিকে আটকাতে দুই-তিনজন লাগাবে, তার চারপাশে দেয়াল তুলবে। আর তখনই ফাঁকা জায়গা পেয়ে যাবেন লাউতারো, আলভারেজ, এনজোরা। মেসিকে ঘিরে রাখার দাম চুকাতে হবে অন্য কারও গোলে। ২০২২ বিশ্বকাপ আর ২০২৪ কোপা, দুবারই তারা সেটা করে দেখিয়েছেন।আর্জেন্টিনা-ক্রোয়েশিয়া ফুটবল ম্যাচে খেলোয়াড়দের ক্রিয়া, দর্শকরা স্টেডিয়ামে উপস্থিত. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

এবারের বিশ্বকাপের গরম আর ঠাসা সূচিতে এই গভীরতাই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় পুঁজি। নকআউটের প্রতিটা ম্যাচ যত কঠিন হবে, ততই দরকার পড়বে বেঞ্চের তাজা পায়ের। আটত্রিশ বছরের মেসিকে পুরো টুর্নামেন্ট একার কাঁধে বইতে হবে না, এটাই হয়তো স্কালোনির সবচেয়ে বড় স্বস্তি।

বাংলাদেশের কোটি কোটি আর্জেন্টিনা সমর্থকের কাছে এই দল শুধু একটা দল নয়, একটা আবেগ। ছাদে আকাশি-সাদা পতাকা, দেয়ালে মেসির ছবি, ম্যাচের রাতে গোটা মহল্লার জেগে থাকা, সবকিছুর কেন্দ্রে মেসি ঠিকই আছেন। কিন্তু প্রিয় দশ নম্বরের পরও এই দলের গল্প থেমে থাকে না। মেসি একদিন থাকবেন না, কিন্তু লাউতারো, আলভারেজ, এনজোদের হাত ধরে আর্জেন্টিনার গল্পটা চলতেই থাকবে।

প্রতিপক্ষের সমর্থকেরা ‘মেসি ছাড়া আর্জেন্টিনা অচল’ বলে খোঁচা দিতে থাকুক, এটা ফুটবলের মজা। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। মেসি এই দলের প্রাণ ঠিকই, কিন্তু একমাত্র ভরসা নন। যেদিন তার পা ক্লান্ত হবে, সেদিনও আর্জেন্টিনার গোলের খাতা খোলা থাকবে, কারণ এই দল একজনের নয়, অনেকের। আর সেই অনেকের ভরসাতেই টিকে আছে টানা দ্বিতীয় শিরোপার স্বপ্ন।

বিষয়:এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ক্রিস্টিয়ান রোমেরো জুলিয়ানো সিমেওনে নিকো পাজ প্লেবুক ফিফা বিশ্বকাপ-২০২৬

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…