ছয় দিন পরই বাজবে রাশিয়া বিশ্বকাপের বাঁশি। ২০টি বিশ্বকাপ পেরিয়ে এসেছে ফুটবল মহাযজ্ঞের যাত্রাপথ। প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল উরুগুয়ে। আগের আসরগুলোর পরতে পরতে ঠাসা রোমাঞ্চকর নানা গল্প। চ্যানেল আই অনলাইনের পাঠকদের ধারাবাহিকভাবে ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছিল ইতিহাসের ধূলিজমা সেসব পাতায়। আজ থাকছে শেষপর্ব ব্রাজিল বিশ্বকাপ ২০১৪’র কথা-
চার বছর আগে হয়ে যাওয়া বিশ্বকাপ কী ফুটবলে এক বিশাল পরিবর্তনের সাক্ষর রেখেছিল? নয়তো যে সাউথ আমেরিকা ছিল ইউরোপিয়ান দলগুলোর জন্য বধ্যভূমি, সেই মহাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ ফুটবলের দেশ ব্রাজিল থেকে কীভাবে বিশ্বকাপ নিয়ে যায় জার্মানি! যে বিশ্বকাপে জার্মানি শুধু শিরোপাই জেতেনি। বিশ্বকাপটা উঁচিয়ে ধরার পথে একই সঙ্গে কাঁদিয়েছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশ- ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকেও।
ফিরে দেখা: বিশ্বকাপ-১৯৩০, বিশ্বকাপ-১৯৩৪, বিশ্বকাপ-১৯৩৮, বিশ্বকাপ-১৯৫০, বিশ্বকাপ-১৯৫৪,
বিশ্বকাপ-১৯৫৮, বিশ্বকাপ-১৯৬২, বিশ্বকাপ-১৯৬৬, বিশ্বকাপ ১৯৭০, বিশ্বকাপ-১৯৭৪,
বিশ্বকাপ-১৯৭৮, বিশ্বকাপ-১৯৮২, বিশ্বকাপ-১৯৮৬, বিশ্বকাপ-১৯৯০, বিশ্বকাপ-১৯৯৪, বিশ্বকাপ-১৯৯৮, বিশ্বকাপ-২০০২,
অথচ এই বিশ্বকাপ ঘিরে দারুণ কিছুর স্বপ্ন বুনেছিল ব্রাজিল। ১৯৫০ সালে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে উরুগুয়ের কাছে ফাইনাল হেরেছিল ব্রাজিল। ৬৪ বছরের সেই হাহাকার ঘোচাতে সবরকম উদ্যোগই নেয়া ছিল। দলের প্রাণকেন্দ্রে ছিলেন নেইমার নামের এক নিউক্লিয়াস। যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছিল সেলেসাওরা।

কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত সবকিছু ঠিকতালেই চলছিল। চার গোল করে ব্রাজিলকে শিরোপার পথে ভালোমতোই রেখেছিলেন নেইমার। কলম্বিয়ার বিপক্ষে সেই কোয়ার্টারেই ঘটল দুর্ঘটনা। কলম্বিয়ার হুয়ান জুনিগার ভয়ঙ্কর এক ফাউলে চোট নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল নেইমারকে। সেটাই হয়ে দাঁড়ায় আক্ষেপের অপর নাম। ওই ম্যাচ জিতে স্বাগতিকরা সেমিফাইনালে উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু মনোবল যা ছিল খরচ হয়ে যায় কোয়ার্টারে। সেমিতে জার্মানিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়ে ভগ্নহৃদয়ের ব্রাজিল সব গোলমাল করে ফেলে।
পরে যা ঘটেছিল, সেটা ব্রাজিলেরই চির-ফুটবল আক্ষেপের একটি অংশ হয়ে গেছে। বেলো হরিজন্তের সেই সেমিফাইনালকে ভুলতেই চায় হলুদ জার্সিরা। নেইমারবিহীন ব্রাজিলকে সমর্থন জানাতে এসে সমর্থকরা দেখলেন ভয়ঙ্কর এক দুঃস্বপ্ন। জার্মানরা বলে পা ছোঁয়াচ্ছেন, আর একেরপর এক গোল করে চলেছেন।
সেই ম্যাচে সাতবার উল্লাসে মাতে জার্মানরা, আর প্রতিবার আহত হতে থাকে ব্রাজিলের শৈল্পিক ফুটবল। ভিআইপি গ্যালারিতে হুইলচেয়ারে বসে নেইমার দেখেন, তাকে ছাড়া কতটা অসহায় হয়ে পড়েছে ব্রাজিল। মেলে ৭-১ গোলের হতাশা, বেদনারবিধুর রাতের পরদিন পত্রিকায় ছাপা হয়, ‘মৃত্যু হয়েছে ব্রাজিল ফুটবলের’!

ফাইনাল
বেলো হরিজন্তের সেমিফাইনালকে যদি কোনকিছুর বিনিময়ে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়, ব্রাজিলিয়ানরা হয়ত চেষ্টায় কমতি রাখবে না। ঠিক তেমনি ১৩ জুলাইয়ের মারাকানা ফাইনালকে পাল্টে দিতে চাইবেন লিওনেল মেসি নামের একজন আর্জেন্টাইন ফুটবল জাদুকরও। আরাধ্য বিশ্বকাপ ট্রফিটা হাত বাড়ানো দূরত্বে এসেছিল। এক গোলের ব্যবধানে সেটা না ছুঁতে পারার কষ্ট এখনো তাকে তাড়িয়ে ফেরে।
অথচ ফাইনালের সবকিছুই যেন ছিল মেসির আর্জেন্টিনার পক্ষে। মাঠে উপস্থিত ব্রাজিলিয়ানরা পর্যন্ত চাইছিলেন মেসির হাতেই উঠুক চিরঅনিন্দ্য কাপটি। নেইমার শুভকামনা জানিয়ে বার্তা দেন, সাউথ আমেরিকা থেকে যেন কোনভাবেই কাপ ইউরোপিয়ানদের হাতে যেতে না দেন আর্জেন্টাইনরা।
কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। ফুটবল দেবতাই যেন চাইলেন না! মেসির জাদুকরী ফুটবলকে দমিয়ে দিল জার্মানির যান্ত্রিক ফুটবল। গোলরক্ষককে একা পেয়েও বল বাইরে পাঠালেন গঞ্জালো হিগুয়েন। মেসির হঠাত ঝলক পূর্ণতা পেল না। গোলশূন্য ম্যাচ গড়াল অতিরিক্ত মিনিটে। সেটাও প্রায় শেষের পথে। তখন, ১১৮ মিনিটে জার্মানির মারিও গোৎজের এক গোল মেসিদের দূরে ঠেলে দেয় অমরত্বের পথ থেকে। ২৮ বছর বিশ্বকাপ না জেতার আক্ষেপটা আলবিসিলেস্তেদের জন্য আরও দীর্ঘ হয়। আর সাউথ আমেরিকার মাঠে ফুটবল বিশ্বকাপ দেখে প্রথম কোনো ইউরোপিয়ান বিশ্বজয়ী দল। নামটি জার্মানি। যা দেশটির চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা।

এক নজরে ২০১৪ বিশ্বকাপ
২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপ ছিল ফুটবল মহাযজ্ঞের ২০তম আসর। আসর শুরুর আগে বিভিন্ন রকম বিতর্ক থাকলেও স্মরণকালের অন্যতম সেরা বিশ্বকাপ বলা হয় ব্রাজিল বিশ্বকাপকে। ১৯৫০ সালের পর এটি ব্রাজিলের দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন। তাতে হৃদয়ভাঙা ম্যাচ যেমন ছিল, তেমনি উত্তেজনায় ঠাসা ডজনখানেক ম্যাচও হয়েছে। ইতালির জর্জিও কিয়েল্লিনিকে উরুগুয়ের ফরোয়ার্ড লুইস সুয়ারেজের কামড়কাণ্ড ছাড়া মাঠে তেমন একটা বিতর্ক ছিল না বললেও চলে।
১২ ভেন্যুতে ৩২ দল অংশ নেয়। বিতর্ক এড়াতে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গোললাইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফিফা। গ্রুপপর্বে হন্ডুরাসের বিপক্ষে ফ্রান্সের দ্বিতীয় গোলটিই গোললাইন প্রযুক্তি দিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম মীমাংসিত গোল।
ব্রাজিলের অতিমাত্রার গরম থেকে বাঁচতে বিশ্বকাপে চালু করা হয় ‘কুলিং ব্রেক’ নামের এক অদ্ভুত বিরতি। এমন বিরতি ব্যবহার হয়েছিল কেবল এক ম্যাচেই। দ্বিতীয় রাউন্ডে মেক্সিকো বনাম নেদারল্যান্ডসের মধ্যকার ম্যাচের ৩২ মিনিটে। 
রাশিয়া বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি নেদারল্যান্ডস। অথচ চারবছর আগের বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে হারিয়ে তৃতীয় হয়েছিল ডাচরা। গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় করে দিয়েছিল চ্যাম্পিয়ন স্পেনকেও!
আসরের গোল্ডেন বল ও বুট বিজয়ী খেলোয়াড়
বিশ্বকাপ না জিতলেও চার গোল করে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল জিতে নেন লিওনেল মেসি। আর আসরে সর্বোচ্চ ছয় গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন কলম্বিয়ার হামেস রদ্রিগেজ।







