আন্তর্জাতিক

শান্তিতে নোবেলজয়ীর নাম ঘোষণা আজ, আলোচনায় ট্রাম্পসহ যারা

শান্তিতে নোবেলজয়ীর নাম ঘোষণা আজ, আলোচনায় ট্রাম্পসহ যারা

ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে আজ শুক্রবার (৯ অক্টোবর)। নরওয়ের নোবেল কমিটির সূচি অনুযায়ী স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় (বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টা) বিজয়ীর নাম প্রকাশ করা হবে।

এ বছরও পুরস্কারটি পাওয়ার প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার পাশাপাশি সুদানের স্বেচ্ছাসেবী দল, পোপ লিও চতুর্দশ, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিসহ আরও কয়েকজন আলোচনায় রয়েছেন।

বুধবার (৭ অক্টোবর) হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, নোবেল কমিটি কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা তিনি জানেন না। তবে তাকে পুরস্কার না দেওয়া হলে কমিটি সমালোচনার মুখে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ট্রাম্পের দাবি, অন্য যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের তুলনায় তিনি বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বেশি কাজ করেছেন। বিশ্বকে সম্ভাব্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার প্রচেষ্টাকেও নিজের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।

এ বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মোট ২৮৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মনোনীত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২০৮ জন ব্যক্তি এবং ৭৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়ন গোপন রাখা হয়। নরওয়েজিয়ান নোবেল ইনস্টিটিউট সম্ভাব্য বিজয়ীদের কোনো সংক্ষিপ্ত তালিকাও প্রকাশ করে না।

ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে এই পুরস্কারের যোগ্য বলে দাবি করে আসছেন। ইসরায়েল, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের নেতারা অতীতে তাকে মনোনয়নের কথা জানিয়েছেন। তবে এ বছর তার পুরস্কার জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

আলোচনায় থাকা উল্লেখযোগ্য কয়েকজন ব্যক্তি ও উদ্যোগ হলো:

২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে মানবিক সংকট তীব্র হয়েছে। সরকারি বাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) সংঘাতে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বেড়েছে খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি।

এ পরিস্থিতিতে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’ নেটওয়ার্ক সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। দেশটির ১৮টি রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা এই উদ্যোগের আওতায় প্রায় ৭০০টি সহায়তা দল এবং ২৬ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য।

স্বেচ্ছাসেবীরা স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য সহায়তা, শিক্ষা, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা ও মানসিক সহায়তা দিয়ে থাকেন। এসব কাজ করতে গিয়ে তাদের আটক ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

অনলাইন পূর্বাভাসভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম পলিমার্কেটের হিসাবে, এ বছর এই উদ্যোগের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা ১৭ শতাংশ।

যুদ্ধের কারণে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ইউক্রেনীয় শিশুদের ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার জন্য আলোচনায় রয়েছেন ‘সেভ ইউক্রেন’ সংস্থার সহপ্রতিষ্ঠাতা মিকোলা কুলেবা।

২০১৪ সালে পূর্ব ইউক্রেনের সংঘাতের সময় সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর শিশুদের সুরক্ষা ও পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজে সংস্থাটির ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সেভ ইউক্রেনের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭৬৩ শিশুকে তাদের বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে নিতে সহায়তা করেছে সংস্থাটি। তবে আরও অনেক শিশুকে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে।

পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলোর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকন গেরলোর মতে, শিশুদের সরাসরি সহায়তা এবং তাদের অধিকার রক্ষায় প্রচার চালানোর সমন্বয় কুলেবাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির যোগ্য প্রার্থী করে তুলেছে। পলিমার্কেটের হিসাবে, তার পুরস্কার জয়ের সম্ভাবনা ৯ শতাংশ।

রাশিয়ার বিরোধী নেতা আলেক্সেই নাভালনির স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়াও সম্ভাব্য বিজয়ীদের আলোচনায় রয়েছেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কারাগারে আলেক্সেই নাভালনির মৃত্যুর পর তিনি রাশিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারের বিরোধিতায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।

স্বামীর মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পর টাইম সাময়িকীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইউলিয়া জানান, তিনি আলেক্সেইয়ের সংগ্রাম এগিয়ে নিতে চান। গণতান্ত্রিক ও স্বাভাবিক একটি রাশিয়া গড়ে তোলার স্বপ্নের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

পলিমার্কেটের পূর্বাভাসে ইউলিয়ার নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা ৫ শতাংশ।

ক্যাথলিক চার্চের প্রধান পোপ লিও চতুর্দশও শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের আলোচনায় রয়েছেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছেন।

গাজা পরিস্থিতি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তার বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পেয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে ইউরোপীয় নেতাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি যুদ্ধের কারণে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির বিষয়টি তুলে ধরেন।

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরও পোপ সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানান। তার মতে, হুমকি বা অস্ত্রের ব্যবহার নয়, বরং আন্তরিক ও দায়িত্বশীল আলোচনার মাধ্যমেই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

পলিমার্কেটের হিসাবে, পোপ লিওর পুরস্কার জয়ের সম্ভাবনা ১ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক বিরোধের মধ্যে কানাডার স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকার কারণে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নামও আলোচনায় এসেছে।

২০২৫ সালের এপ্রিলে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের হুমকি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের মতো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন কার্নি।

পরবর্তী সময়ে দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে চীন ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নেয় কানাডা।

জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে কার্নি বিশ্বব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন ও ভাঙনের কথা বলেন। ট্রাম্পের চাপের মুখে কানাডার ঐক্য ধরে রাখার প্রচেষ্টাও তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

লিয়াজোঁ স্ট্র্যাটেজিজের তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় কার্নির জনসমর্থন ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে পলিমার্কেটের হিসাবে, নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ১ শতাংশ।

নিজেকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরলেও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ট্রাম্পের দাবিকে ঘিরে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় তার নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

তবে নোবেল কমিটি সম্ভাব্য বিজয়ীদের তালিকা প্রকাশ না করায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কারও পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। সুদানের মানবিক সহায়তাকর্মী থেকে শুরু করে ইউক্রেনীয় শিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা ব্যক্তিদের মধ্যে কে এবার শান্তিতে নোবেল পাবেন, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য।

বিষয়:নাম ঘোষণা নোবেলজয়ী শান্তিতে নোবেল পুরুস্কার

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…