বিনোদন

এ মাটিতে গানেই জাগে প্রাণ, গান থামানোর সাধ্য কার!

টিএসসিতে ‘হালিম বয়াতি স্মরণোৎসব-২০২৬’-এ তারুণ্যের ঢল

এ মাটিতে গানেই জাগে প্রাণ, গান থামানোর সাধ্য কার!

ব্যান্ড কনসার্টে প্রিয় শিল্পীর নাম ঘোষণা হলে উচ্ছ্বসিত চিৎকার, গানের তালে দর্শকের উচ্ছ্বাস, শিল্পীর কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা, এমন দৃশ্য পরিচিত। কিন্তু বাউল গানের আসরে এমন তারুণ্যের উচ্ছ্বাস সচরাচর দেখা যায় না। শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পায়রা চত্বরে দেখা গেল তেমনই এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য।

গানের সম্রাট, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাধক আবদুল হালিম বয়াতির স্মরণে আয়োজিত উৎসবে শত শত তরুণ-তরুণীর উপস্থিতি যেন জানিয়ে দিল, লোকসংগীতের প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ এখনো কতটা গভীর।

হালিম বয়াতি স্মরণোৎসব নিয়ে কথা বলছেন তার কন্যা তুহিনে হালিম

কেউ প্রিয় শিল্পীর নাম শুনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন, কেউ আবার গানের সুরে ডুবে আছেন। শিল্পীদের পরিবেশনার সময় শ্রোতাদের মগ্নতা ছিল চোখে পড়ার মতো। গানের ফাঁকে ফাঁকে কেউ কেউ শ্রোতার আসন ছেড়ে উঠে গিয়ে প্রিয় শিল্পীর হাতে কিংবা পায়ে প্রণাম করেছেন। পুরো আয়োজনজুড়েই ছিল এক ধরনের আধ্যাত্মিক আবহ।

বাউল গানের পরিচিত সুর, সাধকদের পরিবেশনা আর শ্রোতাদের এমন নিবিষ্ট অংশগ্রহণে টিএসসির পায়রা চত্বর হয়ে উঠেছিল লোকসংগীতের এক মিলনমেলা।

আবদুল হালিম বয়াতির ৯৭তম জন্মবর্ষ উপলক্ষে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘হারিকেন’ আয়োজন করে ‘হালিম বয়াতি স্মরণোৎসব-২০২৬’। বিকেলে শুরু হওয়া আয়োজন রাত ১১টা পেরিয়েও চলে! দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লোকসংগীতশিল্পীদের পরিবেশনা, আলোচনা ও স্মৃতিচারণে স্মরণ করা হয় এই সাধককে। আয়োজন ঘিরে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারাও টিএসসিতে এমন উদ্যোগের প্রশংসা করেন।

বাউল মাতা আলেয়া বেগম, লতা দেওয়ান, রুমা সরকার, মুক্তা সরকার, বগা তালেবসহ বিভিন্ন শিল্পীর পরিবেশনায় সন্ধ্যা থেকে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। তাদের কণ্ঠে হালিম বয়াতির কথা ও সুরে মুগ্ধ হন শ্রোতারা। শুধু হালিম বয়াতির ভক্ত-অনুরাগীরাই নন, নিয়মিত বাউল গান শোনেন এমন অনেক সংগীতপ্রেমীর উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। শিল্পীদের পরিবেশনায় শ্রোতাদের একাগ্রতা এবং গানের সঙ্গে তাদের আত্মিক সংযোগ পুরো আয়োজনকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।

গানের পাশাপাশি আবদুল হালিম বয়াতির জীবন, সংগীতসাধনা ও সাংস্কৃতিক অবদান নিয়ে আলোচনা করেন আলোকচিত্রী ও গবেষক নাসির আলী মামুন, লেখক ও গবেষক শফিকুর রহমান চৌধুরী, ড. তপন বাগচী এবং ড. সাইমন জাকারিয়া।

শিল্পীর সঙ্গে কাটানো সময়, তার কাছ থেকে সংগীতশিক্ষার অভিজ্ঞতা এবং জীবনের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন তার দুই শিষ্য লাল মিয়া বয়াতি ও নজরুল বয়াতি। স্মৃতিচারণ করেন তার ছেলে নিশানে হালিমও।

আলোচনায় নাসির আলী মামুন বলেন, আবদুল হালিম বয়াতির জীবন ও কর্মের অনেক কিছুই এখনো অনাবিষ্কৃত। তার পূর্ণাঙ্গ জীবনী প্রকাশের আগে শিল্পীকে কাছ থেকে দেখেছেন, তার সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, এমন মানুষদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা জরুরি। দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা শিষ্য, ভাবশিষ্য, অনুসারী ও পরিবারের সদস্যদের মৌখিক ইতিহাস সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

নাসির আলী মামুন জানান, হালিম বয়াতির ছেলে নিশানে হালিম বাবার জীবনী লেখার উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে তাড়াহুড়ো না করে আরও দুই-তিন বছর সময় নিয়ে তথ্য ও স্মৃতি সংগ্রহের পরামর্শ দেন তিনি।

তার প্রত্যাশা, ২০২৯ সালে হালিম বয়াতির জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তার ভাবশিষ্য, অনুসারী ও সংগীতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একত্র হবেন। এর আগে প্রয়োজনীয় তথ্য ও অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা গেলে শিল্পীর জীবনী আরও পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠবে।

সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাঝেই হালিম বয়াতিকে নিয়ে ‘হারিকেন’-এর একটি প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মফিদুল হক, নাসির আলী মামুনসহ অনেকে।

প্রকাশনাটির মধ্য দিয়ে শিল্পীর জীবন ও সংগীতসাধনার নানা দিক পাঠকের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে আয়োজক সংগঠন।

অনুষ্ঠানে হালিম বয়াতির পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন তার মেয়ে তুহিনে হালিম। স্মরণোৎসব আয়োজনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, শুরুতে এত অল্প সময়ে এমন আয়োজন সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তার সংশয় ছিল। কিন্তু অনুষ্ঠানে এসে সেই সংশয় কেটে গেছে।

তরুণদের ব্যাপক উপস্থিতিতে মুগ্ধতা প্রকাশ করে তুহিনে হালিম বলেন, ‘তরুণেরা প্রমাণ করেছে, যত দিন তাদের হাতে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ।’

দেশের সংস্কৃতি ও সংগীতের ঐতিহ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাদের এই দেশ গানের দেশ, প্রাণের দেশ, ধানের দেশ। আমাদের কৃষ্টি-কালচার থেকে কেউ আমাদের বিচ্যুত করতে পারবে না, এক চুলও পারবে না। আমরা গান গেয়ে বাঁচি, গান গেয়ে ঘুমাই, গান গেয়ে জাগি, আমরা গান গেয়ে দেশ গড়ি, আমরা গান গেয়ে যুদ্ধ করি। সুতরাং আমাদের কেউ এই পথ থেকে সরিয়ে দিতে পারবে না। এটা আবার প্রমাণিত হলো।”

সামনে আবদুল হালিম বয়াতির জন্মশতবার্ষিকী। সেই আয়োজন যেন শুধু ঢাকা বা নির্দিষ্ট কোনো শহরে সীমাবদ্ধ না থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, এমন প্রত্যাশার কথাও জানান তুহিনে হালিম।

তার আশা, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা হালিম বয়াতির শিষ্য, অনুসারী, ভাবশিষ্য ও সংগীতপ্রেমীদের নিয়ে জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন করা সম্ভব হবে।

লোকসংগীতের সাধনায় জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন আবদুল হালিম বয়াতি। গানের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন মানুষের জীবনবোধ, দর্শন ও মরমি ভাবনা। তার প্রয়াণের পরও শিষ্য, ভাবশিষ্য ও অনুসারীদের কণ্ঠে বেঁচে আছে সেই সংগীত-উত্তরাধিকার।

টিএসসির এই স্মরণোৎসবে আরো সংগীত পরিবেশন করেন ফকির আবুল সরকার, সৈয়দ আশিকুর রহমান, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, আকাশ গায়েন, শাহ মোহাম্মদ শিপন, মারুফ মৃন্ময়, খোকন চিশতি, সোহাগ প্রামাণিক, জয়িতা অপা, সানজিদা প্রমি, ইমরান হোসাইন, অভিবাদন দাস, নবীন কিশোর গোস্বামী, নাজমূল সরকার নিহাত, রহমান জনি, মনিরুজ্জামান খান ও মাহাবুব খালাসী।

যন্ত্রসংগীতে ছিলেন আলম বয়াতি (হারমোনিয়াম), মো. শহিদ ও রনি দেওয়ান (ঢোল), কানন মোল্লা ও আকিফ আল জামি (বাঁশি), ওবায়দুর রুশাদ (ব্যান্ড্রো), সৌরভ আকন্দ (থমক), অভিষেক প্রায় অর্চন, অনিন্দ্য বিশ্বাস ও জামিল হোসেন সিয়াম (গিটার), এবং সৌমিক বাগচী (করতাল)।

 

ছবি: মিতুল আহমেদ

বিষয়:অভিবাদন দাস আকাশ গায়েন আলেয়া বেগম ইমরান হোসাইন খোকন চিশতি জয়িতা অপা

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…