‘আমার সাইফকে আইন্না দাও’: মিলার বুকফাটা আর্তনাদে স্বজন হারানোর বেদনা

ছবি: সংগৃহীত
‘আমার সাইফকে আইন্না দাও’—কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর এক নারীর এই আকুতি ছুঁয়ে গেছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়। তিনি মেহেরুন্নেসা মিলা। ভয়াবহ ওই আগুনে পরিবারের ছয় সদস্যকে হারিয়েছেন তিনি। প্রাণে বেঁচে ফিরলেও স্বজন হারানোর শোক আর অসহায়ত্ব তাকে তাড়া করে ফিরছে।
গত ১৭ অক্টোবর অগ্নিকাণ্ডের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে মিলার কান্নার ভিডিও ও ছবি। আগুনের মধ্যে স্বজনদের হারিয়ে তার বুকফাটা আর্তনাদ দেখে আবেগাপ্লুত হয়েছেন অনেকে। কক্সবাজার ডিসি কলেজের প্রভাষক রুশনা আকতার সোমা বলেন, ভিডিওটি দেখলেই তিনি মোবাইল বন্ধ করে দেন। মিলার আর্তনাদ তাঁকে বারবার কাঁদায়।
রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুলের সাবেক শিক্ষিকা মিলা বর্তমানে প্রিমিয়ার ব্যাংকের বাড্ডা শাখায় কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। তার স্বামী মাসুদ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটাতে তারা কক্সবাজারে গিয়েছিলেন। মিলা ও তার স্বামীসহ তিন বোনের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে আটজনের দলটি উঠেছিল মেরিন ড্রাইভ সড়কের টুপটুপ রিসোর্টে। কিন্তু সেই আনন্দভ্রমণই পরিণত হয় ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে।
রিসোর্টে আগুন ছড়িয়ে পড়লে মিলা ও তার স্বামী প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যদের আর ফিরে পাননি তারা। একে একে হারিয়ে যান ছয় প্রিয়জন। স্বজনদের খুঁজতে গিয়ে মিলা বারবার কাঁদছিলেন, ‘আমার সাইফকে আইন্না দাও।’ তার এই আকুতি যেন প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার অসম্ভব আকাঙ্ক্ষা আর অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি।
মিলা যে সাইফের নাম ধরে কাঁদছিলেন, তার প্রকৃত নাম ফায়িজান আহম্মেদ। মাত্র পাঁচ বছর বয়সী শিশুটিকে আদর করে ‘সাইফ’ নামে ডাকতেন মিলা। ফায়িজান ছিলেন তার বড় বোন কাজল রেখার মেয়ে ফারিহা কবির সাবরিনের ছেলে। অগ্নিকাণ্ডে পরিবারের আদরের এই শিশুটিও প্রাণ হারায়।
নিহতদের মধ্যে আরও রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিস তেহামী জেরিফ। মিলার আরেক বোন রোকসানা আক্তার রিনার দুই মেয়ে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা ও ইসরাত জাহান মালিহা। এ ছাড়া নিহত হয়েছেন মিলার বোন নুরুননাহার খানম স্বপ্নার মেয়ে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মিলিতা মেহেজাবীন আলভী।
মিলিতার চাচা রিয়াজ মাহমুদ রিপন ১৮ অক্টোবর কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে পরিবারের সদস্যদের পরিচয় ও অগ্নিকাণ্ডের বিস্তারিত জানান। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একই পরিবারের ছয়জনকে হারিয়েছেন স্বজনেরা।
যে কক্সবাজারে আনন্দের স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, সেখান থেকেই ফিরতে হচ্ছে স্বজন হারানোর অসহনীয় শোক নিয়ে। মিলা ও তার স্বামী বেঁচে ফিরলেও পরিবারের ছয় সদস্যের মৃত্যু তাদের জীবনে তৈরি করেছে অপূরণীয় শূন্যতা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘আমার সাইফকে আইন্না দাও’ তাই শুধু একজন নারীর কান্না নয়। এটি প্রিয়জন হারিয়ে নি:স্ব হয়ে যাওয়া একটি পরিবারের বুকভাঙা বেদনার প্রতিচ্ছবি।






