বাংলাদেশ

সাতক্ষীরার বস্তিতে বাস্তুচ্যুত পরিবারের ৭৪.৯ শতাংশ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায়: খানি বাংলাদেশ

সাতক্ষীরার বস্তিতে বাস্তুচ্যুত পরিবারের ৭৪.৯ শতাংশ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায়: খানি বাংলাদেশ

ছবি: সংগৃহীত

অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন

ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে সাতক্ষীরা শহরের বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। জরিপে অংশ নেওয়া এসব পরিবারের মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক খানি বাংলাদেশ ও পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (প্রান) এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে বুধবার (১৪ অক্টোবর) সাতক্ষীরায় আয়োজিত এক বহুপক্ষীয় সংলাপে ‘ডিসপ্লেসড, ডিনায়েড’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। খানি বাংলাদেশ, তাদের সদস্য সংগঠন স্বদেশ সাতক্ষীরা এবং প্রান যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সহিষ্ণুতার শুরু নিজ ঘর থেকেই’।

গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন প্রানের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর উম্মে সালমা। সাতক্ষীরা পৌরসভার ৩৫টি বসতির ৩৫৮টি পরিবারের ১ হাজার ৩৪১ জন সদস্যের তথ্য নিয়ে গবেষণাটি করা হয়। গবেষণায় বলা হয়েছে, পৌরসভার ৪৭টি অনানুষ্ঠানিক বসতিতে প্রায় ৭ হাজার ৫৭৩টি পরিবার বসবাস করছে। এসব পরিবারের বড় অংশ শ্যামনগর ও আশাশুনিসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে এসেছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া ৯৫ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারের অন্তত একজন সদস্য খাবার কম খেয়েছেন বা কোনো বেলা বাদ দিয়েছেন। ৫২ দশমিক ২ শতাংশ পরিবারের সদস্য অন্তত এক দিন পুরোপুরি না খেয়ে থেকেছেন। খাবার জোগাড় করতে ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার উৎপাদনশীল সম্পদ বা প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী বিক্রি করেছে।

পানির সংকটও প্রকট। জরিপে অংশ নেওয়া ৯৬ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার আংশিক বা পুরোপুরি লবণাক্ত ও আয়রনযুক্ত অগভীর নলকূপের পানির ওপর নির্ভরশীল। গত এক মাসে এসব পরিবারের অর্ধেকের মধ্যে পানিবাহিত রোগ দেখা গেছে।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, সরকারি জমিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে বসবাসকারী পরিবারের ৫৯ শতাংশ উচ্ছেদ বা উচ্ছেদের হুমকির মুখে রয়েছে। গত ১২ মাসে ৭৯ দশমিক ১ শতাংশ পরিবার কোনো সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পায়নি। প্রয়োজনের সময় কোথায় অভিযোগ জানাতে হয়, তা জানে না ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার। ৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ বিদ্যালয়ে নথিভুক্ত নয়। বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা এসব শিশুর ৩০ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত।

সংলাপে বাস্তুচ্যুত পরিবারের সদস্যরা জানান, পরিবারের পুরুষদের বড় অংশ ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। দৈনিক প্রায় ২০০ টাকা আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আয় অনিয়মিত হওয়ায় শিশুদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অভাবের কারণে অনেক পরিবার শিশুদের গ্যারেজসহ বিভিন্ন কাজে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে। তাঁরা বয়স্ক ও বিধবা ভাতাসহ সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান।

তারা আরও বলেন, অল্প জায়গায় গাদাগাদি করে বসবাস করতে হয়। একই ঘরের মধ্যে রান্নাঘর ও শৌচাগার রাখতে হয় অনেক পরিবারকে। ঘর নির্মাণে ঋণ নিতে হলেও স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় ঋণ পাওয়া কঠিন। আবার নিয়মিত আয় না থাকায় ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে অনেকে ঋণের চক্রে আটকে পড়ছেন।

বক্তারা বলেন, বাস্তুচ্যুতির পর খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা কোনো সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়। এটি দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধযোগ্য ব্যর্থতার প্রতিফলন। বস্তিতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা, তাদের সংকট ও প্রয়োজন চিহ্নিত করে হালনাগাদ তথ্যভান্ডার তৈরি করা জরুরি। এর ভিত্তিতে কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে তাঁদের যুক্ত করা সম্ভব হবে। তাদের মতে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সেবার সমন্বয় না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। বিদ্যুৎ বিল, জাতীয় পরিচয়পত্র ও জমির পরচাসহ বিভিন্ন নথির শর্ত পূরণ করতে না পারায় অনেক বাস্তুচ্যুত মানুষ সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত বলেন, বস্তিতে বসবাসকারী যারা এখনো বয়স্ক বা বিধবা ভাতা পান না, তাদের তালিকা দিলে ভাতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পৌর এলাকার বাইরের প্রকৃত ভূমিহীনরা আবেদন করলে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। শিশুদের বিদ্যালয়ে ফেরানো এবং তরুণদের কর্মসংস্থানে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. জাহিদ আরজু রিপন বলেন, পৌর এলাকায় বস্তিবাসীদের সমস্যার সমাধানে অধিদপ্তরের সরাসরি কাজ করার সুযোগ সীমিত। তবে কোনো নাগরিক সংগঠন উদ্যোগ নিলে বস্তিতে যৌথ নলকূপ ও শৌচাগারের ব্যবস্থা করা সম্ভব।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মইনুল ইসলাম মইন বলেন, বাস্তুচ্যুত মানুষেরা স্বেচ্ছায় নয়, বরং বাধ্য হয়ে নিজেদের এলাকা ছেড়েছেন। বস্তিতে পানি, সবজি চাষের জায়গা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। পৌরসভাকে সঙ্গে নিয়ে রিসোর্স ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে কোন বসতিতে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করা গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া সম্ভব হবে।

সংলাপে সভাপতিত্ব করেন স্বদেশ সাতক্ষীরার নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত। সঞ্চালনা করেন উন্নয়ন সংগঠন সিইপিআরের নির্বাহী পরিচালক গৌরাঙ্গ নন্দী। এতে সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বস্তিতে বসবাসকারী জলবায়ু বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর সদস্যসহ ৮১ জন অংশ নেন।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জাতীয় কৌশলপত্র গ্রহণ করে। এতে বাস্তুচ্যুত মানুষের খাদ্য, পানি, আবাসন, জীবিকা ও প্রয়োজনীয় দলিলপত্রের অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে। আইওএম ও বাংলাদেশ সরকারের ২০২৫ সালের জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, দুর্যোগের কারণে দেশে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন।

গবেষণায় পরিবার নির্বাচনে স্নোবল পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। তাই এর ফলাফল জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর পরিস্থিতি তুলে ধরে, সাতক্ষীরার সব বাস্তুচ্যুত পরিবারের পরিসংখ্যানগত চিত্র নয়।

বিষয়:খাদ্য নিরাপত্তা খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক খানি বাংলাদেশ ও পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক খানি বাংলাদেশ গবেষণায় তথ্য বাস্তুচ্যুত পরিবার

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…