আবারও কী মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হবেন ক্রিস্টা পাইক!
পরপর দুই দফা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে পরপর দুই দফা প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার পরও বেঁচে গেছেন মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত আসামি ক্রিস্টা পাইক। ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া ওষুধের বড় একটি অংশ তার রক্তপ্রবাহে প্রয়োজনীয় মাত্রায় প্রবেশ না করায় এটি ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঠিক কী কারণে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, তা নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে। এ ঘটনার পর তার মৃত্যুদণ্ড আবারও কোন পদ্ধতিতে কার্যকর করা হবে তা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
১৯৯৫ সালে পাইকের বয়স যখন ১৮ বছর, তখন তিনি তার তৎকালীন প্রেমিক টাডারিল শিপের সঙ্গে মিলে ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমারকে হত্যা করেন। তারা ওই তরুণকে মারধর ও নির্যাতন করার পর হত্যা করেন। অপরাধ সংগঠনের সময় তার প্রেমিক শিপের বয়স কম থাকায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি। তিনি এখনো কারাগারে বন্দি আছেন।
দুই শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে পাইকই হলো টেনেসি অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নির্ধারিত প্রথম নারী।
বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ চেষ্টার পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসার জন্য পাইককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর ১০ দিন পর তাকে পুনরায় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত। কারাগারে নেওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর পাইক সীমিতভাবে হাঁটাচলা ও কথা বলতে পারছেন।
এ ঘটনায় টেনেসির গভর্নর বিল লি এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বছরের বাকি সময়ের জন্য অঙ্গরাজ্যটিতে সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়েছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পাইকের শরীরে দেওয়া প্রাণঘাতী ওষুধ পেন্টোবারবিটাল যথাযথভাবে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করেনি। ফলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। তবে এ ব্যাখ্যা এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
পাইকের আইনজীবীদের পরামর্শক অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ডা. জোয়েল জিভটের মতে, ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া ওষুধের বড় একটি অংশ তার শিরায় প্রবেশ না করে হাতের আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে। যে কারণে ওষুধটি শরীরের রক্তপ্রবাহে প্রয়োজনীয় মাত্রায় পৌঁছায়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পাইকের আইনজীবীরা আগেই সতর্ক করে বলেন,পাইকের থ্রম্বোসাইটোসিস নামের একটি রক্তসংক্রান্ত সমস্যাও রয়েছে। এতে রক্তে প্লেটলেটের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া ছোট শিরা ও এই শারীরিক সমস্যার কারণে ইনজেকশন দেওয়ার প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তবে ঠিক কী কারনে ওষুধটি কার্যকর হয়নি, তা নিশ্চিত করতে তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে টেনেসি সরকার।
কারা কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী,প্রথম ডোজে মৃত্যু না হওয়ায় পাইককে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। কিন্তু দ্বিতীয়বারও ওষুধটি যথাযথভাবে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ না করায় প্রত্যাশিত ফল পাওযা যায়নি।
এখন,যদি পাইককে আবারও ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হয়, তবে বড় ধরনের আইনি বাধার মুখোমুখি হতে পারে টেনেসি সরকার।
আইনজীবী স্টিফেন রস জনসনের মতে, আগের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর একই পদ্ধতিতে আবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে গেলে নিষ্ঠুর ও অস্বাভাবিক শাস্তির বিরুদ্ধে সাংবিধানিক সুরক্ষার প্রশ্ন উঠতে পারে। পাইকের শারীরিক অবস্থা, তার চিকিৎসাসংক্রান্ত জটিলতা এবং আগের প্রচেষ্টায় কী ঘটেছিল? এসব বিষয় আদালতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
এর আগে চলতি বছরের মে মাসে টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত টনি ক্যারুথার্সের ক্ষেত্রেও প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার জন্য শিরা খুঁজে পেতে সমস্যা হয়েছিল। পরে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ এক বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়। একই বছরে একাধিক ব্যর্থ প্রচেষ্টা টেনেসির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন বাড়ছে।
পাইককে আবার প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়া হবে,নাকি অন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে হলে পাইককে লিখিতভাবে প্রাণঘাতী ইনজেকশন নেওয়ার অধিকার ত্যাগ করতে হতে পারে। এ ছাড়া প্রযোজ্য আইন ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে।
পাইককে অন্য কোনো পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। টেনেসির কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা বৈদ্যুতিক চেয়ার ও ফাঁসির মতো পদ্ধতি পুনরায় চালুর পক্ষে কথা বলেছেন।
ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক ক্রিস স্লোবোগিনের মতে, পাইক ১৯৯৫ সালে অপরাধটি করেছিলেন। ফলে তৎকালীন আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তে বৈদ্যুতিক চেয়ারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সুযোগ থাকতে পারে।
অন্যদিকে, ফাঁসি পুনরায় চালুর রাজনৈতিক দাবি উঠলেও তা পাইকের ক্ষেত্রে আইনগতভাবে প্রয়োগ করা যাবে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।
পাইকের আইনজীবীরা মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে প্যারোলের সুযোগ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পক্ষে আবেদন করছেন।
গভর্নর বিল লি চাইলে তার ক্ষমতাবলে মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে দিতে পারেন। তদন্তে যদি দেখা যায়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্ধারিত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি,তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি আরও জোরালো হতে পারে।
এ ছাড়া পাইকের শারীরিক ও মানসিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টায় তার মস্তিষ্কের কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। গুরুতর মানসিক অক্ষমতা থাকলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
ক্রিস্টা পাইকের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রথমে তদন্তে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচেষ্টা কেন ব্যর্থ হয়েছিল, তা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর তার শারীরিক অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হতে পারে।
তবে পরপর দুই দফা প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার পরও পাইকের বেঁচে যাওয়ার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি, বন্দিদের অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।





