ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকার কী?

ছবি: সংগৃহীত
ইসলাম নারীদের মানুষ হিসেবে সম্মান, ন্যায়বিচার ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কোরআন ও হাদিসে নারীর মানবিক মর্যাদা, শিক্ষা, সম্পদের মালিকানা, বিবাহে সম্মতি এবং পারিবারিক জীবনে দায়িত্ব ও অধিকারের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে।
১. মানবিক মর্যাদায় নারী ও পুরুষ
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, সব মানুষকে একই উৎস থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদের একই ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন…” – (সুরা আন-নিসা, আয়াত ১)
ইসলামের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষ উভয়েই আল্লাহর সৃষ্টি এবং উভয়েরই মানবিক মর্যাদা রয়েছে। আল্লাহর কাছে মর্যাদার মানদণ্ড হলো তাকওয়া বা আল্লাহ-সচেতনতা, লিঙ্গ নয়। (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১৩)
২. সম্পদ ও উত্তরাধিকারের অধিকার
ইসলাম নারীর সম্পদের মালিকানা স্বীকার করেছে। নারী নিজের উপার্জিত অর্থ ও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদের মালিক হতে পারেন। কোরআনে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য উত্তরাধিকারের অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। (সুরা আন-নিসা, আয়াত ৭)
তবে উত্তরাধিকারের অংশ সব ক্ষেত্রে সমান নয় আত্মীয়তার সম্পর্ক ও পরিস্থিতি অনুসারে তা ভিন্ন হতে পারে।
৩. শিক্ষা অর্জনের গুরুত্ব
জ্ঞান অর্জন ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ। নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য জ্ঞানচর্চা, ধর্মীয় শিক্ষা এবং উপকারী জ্ঞান অর্জনের সুযোগকে ইসলামি ঐতিহ্যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসেও নারী জ্ঞানী, শিক্ষিকা ও হাদিস বর্ণনাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে আয়েশা (রা.) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
৪. বিবাহে নারীর সম্মতি
ইসলামে বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন। নারীর সম্মতি ছাড়া বিয়ে দেওয়ার বিষয়টি হাদিসে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে নারীর সম্মতির বিষয়ে বর্ণনা রয়েছে।
বিবাহে নারীর মোহর পাওয়ার অধিকারও রয়েছে। মোহর নারীর নিজস্ব সম্পদ, স্বামী বা অন্য কেউ তাঁর সম্মতি ছাড়া তা নিজের বলে দাবি করতে পারেন না।- (সুরা আন-নিসা, আয়াত ৪)
৫. মা হিসেবে নারীর মর্যাদা
ইসলামে মায়ের প্রতি সদাচরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোরআনে মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ রয়েছে এবং মায়ের গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। (সুরা লুকমান, আয়াত ১৪)
একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কে সবচেয়ে বেশি উত্তম আচরণ পাওয়ার অধিকারী? তিনি তিনবার ‘তোমার মা’ বলার পর চতুর্থবার ‘তোমার বাবা’ বলেছেন। – সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম
৬. পরিবার ও সমাজে নারীর অধিকার
ইসলাম পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সদাচরণ, দায়িত্ব পালন ও ন্যায়সংগত আচরণের ওপর গুরুত্ব দেয়। কোরআনে বলা হয়েছে, নারীদেরও ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর দায়িত্ব রয়েছে।- (সুরা আল-বাকারা, আয়াত ২২৮)
নারীর প্রতি নির্যাতন, অপমান কিংবা অন্যায় আচরণকে ধর্মীয় মূল্যবোধের নামে সমর্থন করা উচিত নয়। তবে বিভিন্ন ইসলামি আইনগত ব্যাখ্যা ও সামাজিক প্রথার কারণে নারীর অধিকার বাস্তবায়নের ধরনে পার্থক্য দেখা যায়।
ইসলামে নারীর অবস্থান বুঝতে হলে কোরআন, নির্ভরযোগ্য হাদিস এবং ইসলামি আইনশাস্ত্রের ব্যাখ্যা সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ইসলামের মূল শিক্ষায় নারীর মানবিক মর্যাদা, সম্পদের অধিকার, বিবাহে সম্মতি, পারিবারিক দায়িত্ব এবং ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।
নারীর মর্যাদা শুধু মা, স্ত্রী বা কন্যা হিসেবে তাঁর পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তিনি নিজেও একজন স্বতন্ত্র মানুষ, যার অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে। ইসলামের শিক্ষাকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে ধর্মীয় নির্দেশনা এবং বিভিন্ন সমাজে তার বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে পার্থক্যটিও বোঝা জরুরি।






