ধর্ম ও জীবন

রিজিক নিয়ে ‘অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা’, কী বলে ইসলাম?

রিজিক নিয়ে ‘অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা’, কী বলে ইসলাম?

চাকরি থাকবে তো? আয় বাড়বে তো? সংসারের খরচ কীভাবে চলবে? ভবিষ্যতে কী হবে? জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এসব প্রশ্ন কমবেশি সবার মনেই আসে। বিশেষ করে আর্থিক অনিশ্চয়তা দেখা দিলে দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে যায়। ইসলাম অবশ্য দায়িত্বশীলভাবে উপার্জনের চেষ্টা করতে বলে, তবে রিজিক নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ার পরিবর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার শিক্ষাও দেয়।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, “পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই।”
—সূরা হুদ, ১১:৬

এই আয়াত মানুষকে মনে করিয়ে দেয় রিজিকের চূড়ান্ত মালিক আল্লাহ। তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষ কোনো চেষ্টা করবে না। বরং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী হালাল পথে চেষ্টা করার পাশাপাশি ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করাই ইসলামের শিক্ষা।

রিজিক শুধু অর্থ নয়

রিজিক বলতে আমরা সাধারণত টাকা-পয়সা বা খাবারকেই বুঝি। কিন্তু জীবনে পাওয়া সব ধরনের কল্যাণকেও রিজিক হিসেবে দেখা যায়। সুস্থতা, পরিবার, জ্ঞান, সময়, নিরাপদ জীবন এসবও মানুষের জন্য আল্লাহর নিয়ামত।

তাই কারও আয় বেশি আর কারও কম এমন তুলনা করতে গিয়ে নিজের জীবনের অন্য নিয়ামতগুলোকে ভুলে যাওয়া ঠিক নয়।

কোরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহ যাকে ইচ্ছা প্রচুর রিজিক দেন এবং যাকে ইচ্ছা সীমিত করে দেন।”
—সূরা আর-রাদ, ১৩:২৬

চেষ্টা করতে হবে, তবে ফল নিয়ে অস্থির হওয়া নয়

ইসলামে তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসার অর্থ হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। হালাল উপার্জনের জন্য চেষ্টা করা, দক্ষতা বাড়ানো, কাজ খোঁজা এবং নিজের দায়িত্ব পালন করা জরুরি।

এরপর ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়া এটাই তাওয়াক্কুলের গুরুত্বপূর্ণ দিক।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের রিজিক দিতেন যেমন তিনি পাখিদের রিজিক দেন, তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।”
—জামে তিরমিজি, ২৩৪৪

হাদিসটির শিক্ষাটি লক্ষ করার মতো পাখিরাও বাসায় বসে থাকে না; তারা খাবারের সন্ধানে বের হয়। অর্থাৎ আল্লাহর ওপর ভরসার সঙ্গে চেষ্টা করাও রয়েছে।

অন্যের সঙ্গে নিজের রিজিকের তুলনা নয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে অন্যের জীবন দেখে নিজের সঙ্গে তুলনা করা সহজ। কারও ভালো চাকরি, সুন্দর বাড়ি, নতুন গাড়ি কিংবা আর্থিক সাফল্য দেখে নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে হতে পারে।

কিন্তু প্রত্যেক মানুষের পরীক্ষা ও পরিস্থিতি এক নয়। কোরআনে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তোমাদের কারও ওপর কারও তুলনায় রিজিকের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।”
—সূরা আন-নাহল, ১৬:৭১

তাই অন্যের পাওয়া দেখে হতাশ না হয়ে নিজের দায়িত্ব ও সামর্থ্যের দিকে মনোযোগ দেওয়া ভালো।

হারাম পথে রিজিক খোঁজা নয়

অভাব বা অর্থের প্রয়োজন মানুষকে কখনো কখনো ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে। ইসলাম সেখানেও সতর্ক করেছে। বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় প্রতারণা, ঘুষ, সুদ বা অন্যের অধিকার নষ্ট করা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

রিজিকের পরিমাণের পাশাপাশি রিজিকটি হালাল কি না এবং তাতে বরকত আছে কি না এটিও গুরুত্বপূর্ণ।

দুশ্চিন্তার সময় আল্লাহকে স্মরণ করুন

অর্থনৈতিক সমস্যা থাকলে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় নিজেকে ভেঙে না ফেলে আল্লাহর কাছে দোয়া করা যেতে পারে।

কোরআনে বলা হয়েছে, “যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে রিজিক দেন এমন উৎস থেকে, যা সে কল্পনাও করে না।”
—সূরা আত-তালাক, ৬৫:২–৩

এই আয়াতের শিক্ষা হলো তাকওয়া, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা এবং সঠিক পথে থাকার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া।

রিজিক নিয়ে তাহলে কী করবেন?

রিজিক নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে তিনটি বিষয় মনে রাখা যেতে পারে—

চেষ্টা করুন—হালাল পথে কাজ ও উপার্জনের জন্য নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন।

দোয়া করুন—নিজের প্রয়োজন আল্লাহর কাছে তুলে ধরুন।

ভরসা রাখুন—আপনার চেষ্টা ব্যর্থ হলেও আল্লাহর পরিকল্পনা শেষ হয়ে যায় না।

রিজিকের জন্য চেষ্টা করা মানুষের দায়িত্ব, কিন্তু প্রতিটি ফলাফল নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজনের সময় দুশ্চিন্তায় ডুবে যাওয়ার পরিবর্তে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই ইসলামের সুন্দর শিক্ষা। রিজিকের চিন্তা থাকবে, কিন্তু সেই চিন্তা যেন আল্লাহর ওপর বিশ্বাসকে দুর্বল না করে এটাই গুরুত্বপূর্ণ।

বিষয়:অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ইসলাম রিজিক

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…