বাংলাদেশ

সাজেকে আসলে কী হচ্ছে? সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেপথ্যে কারা? কেন বারবার উত্তপ্ত পরিস্থিতি?

সাজেকে আসলে কী হচ্ছে? সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেপথ্যে কারা? কেন বারবার উত্তপ্ত পরিস্থিতি?

ছবি: সংগৃহীত।

অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন

পর্যটকদের কাছে সাজেক মানেই মেঘের রাজ্য, পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য আর নির্জন প্রকৃতি। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চলছে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা, ভূমির অধিকার নিয়ে বিরোধ, অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত এবং নিরাপত্তাহীনতার এক জটিল বাস্তবতা।

সাম্প্রতিক অস্থিরতা আবারও সামনে এনেছে সেই পুরোনো প্রশ্ন: সাজেকে আসলে কার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই চলছে? সাধারণ পাহাড়ি মানুষের নিরাপত্তার দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, সেটা কি শুধুই নিরীহ একটি আন্দোলন নাকি তার পেছনে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভয়ভীতি এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দীর্ঘদিনের বিরোধ ও পর্যটন অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতা?

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে অক্টোবরের শুরু থেকে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে আবারও অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ শুরু হয়েছে। একই দিন সাজেকের উজোবাজার এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির খবর পাওয়া গেছে। রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আবদুর রকিব গণমাধ্যমকে সংঘর্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে গোলাগুলিতে অংশ নেওয়া সশস্ত্র ব্যক্তিদের সাংগঠনিক পরিচয় এবং হতাহতের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় জেলা প্রশাসন ২১ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করে। সেখানে অবস্থানরত পর্যটকদের ২২ অক্টোবর বিকেল চারটার মধ্যে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার সকালে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় ফেরার পথে প্রায় দুই হাজার পর্যটক উজোবাজার এলাকায় অবরোধের কারণে আটকা পড়েন। বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেওয়ার পর পর্যটকবাহী গাড়ি চলাচল শুরু হলেও পরবর্তী গোলাগুলি পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে। পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তার প্রশ্ন যে কত দ্রুত বৃহত্তর আইনশৃঙ্খলা সংকটে পরিণত হতে পারে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তারই উদাহরণ।

কিন্তু সাজেকের বর্তমান সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। গত ১১ অক্টোবর স্থানীয় দুই সংগঠন সড়ক অবরোধ শুরু করে। তাদের অন্যতম দাবি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন অংশের কথিত সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়া। প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর আশ্বাসে ৪৮ ঘণ্টার জন্য কর্মসূচি স্থগিত হলেও দাবি পূরণ হয়নি অভিযোগ তুলে ১৫ অক্টোবর আবার অবরোধ করা হয়। পরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর কর্মসূচি স্থগিত রাখে আন্দোলনকারীরা। সেই বিরতি শেষ হওয়ার পর ২২ অক্টোবর থেকে আবার অবরোধ শুরু হয়। অর্থাৎ সাময়িক শান্তির পর পুনরায় উত্তেজনা; এটাই সাজেকের বাস্তবতা।

আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, গত ৩০ আগস্ট থেকে জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন অংশের সশস্ত্র সদস্যরা মাচলং ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় নতুন করে অবস্থান নিতে শুরু করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের হুমকি দেওয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সম্পত্তির ক্ষতিসাধন এবং গুলি ছোড়ার অভিযোগও তুলেছেন তারা। সর্বশেষ বিবৃতিতে থালকুম্বো, চিল্ল্যাতুলি কুঠি, নোয়াপাড়া, লাম্বাবাক ও ভূয়াছড়ি এলাকায় সশস্ত্র উপস্থিতির অভিযোগ করা হয়েছে। সংগঠন দুটির দাবি, শতাধিক মানুষ হুমকির মুখে ঘরবাড়ি ছেড়েছেন এবং অনেক জুমচাষি নিরাপত্তাহীনতার কারণে জমিতে যেতে পারছেন না। এসব অভিযোগ কতটা সত্য, কতটা অতিরঞ্জিত সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও অস্থিরতা সেখানে সার্বক্ষণিক সঙ্গী।

এখানেই সামনে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: সাজেকের সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেপথ্যে কারা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই প্রধান আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বা জেএসএস এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফের দীর্ঘদিনের বিরোধের দিকে তাকাতে হয়। উভয় সংগঠনই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার, স্বায়ত্তশাসন ও সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। কিন্তু রাজনৈতিক কৌশল, পার্বত্য চুক্তির মূল্যায়ন এবং আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্নে তাদের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির শান্তিচুক্তি সই হয়। দীর্ঘ সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরিই ছিল চুক্তিটির উদ্দেশ্য। কিন্তু ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি, স্থানীয় শাসনব্যবস্থা, ক্ষমতা হস্তান্তর এবং চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক রয়ে যায়। চুক্তির বিরোধিতা করে ১৯৯৮ সালে গড়ে ওঠে ইউপিডিএফ। পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনীতিতে বিভক্তি ও পাল্টাপাল্টি আধিপত্য বিস্তারের বিরোধ নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করে।

সাজেকের বর্তমান অস্থিরতায় এই ঐতিহাসিক বিরোধের প্রভাব স্পষ্ট। স্থানীয় আন্দোলনকারী সংগঠনগুলো জেএসএসের সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন অংশকে দায়ী করলেও জেএসএস অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সংগঠনটির প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা দাবি করেছেন, সাজেকে ইউপিডিএফের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন থেকে দৃষ্টি সরাতেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। জেএসএসের অভিযোগ, ইউপিডিএফের চাপে স্থানীয় সংগঠনগুলো অবরোধ ডেকেছে। অন্যদিকে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, অবরোধ কোনো সংগঠনের চাপে ডাকা হয়নি, তবে স্থানীয় জনগণের কর্মসূচিতে তাদের সমর্থন রয়েছে।

সাজেকের ভৌগোলিক অবস্থানও এই দ্বন্দ্বকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। প্রশাসনিকভাবে সাজেক রাঙামাটি জেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও পর্যটকদের প্রধান যাতায়াতপথ খাগড়াছড়ির দীঘিনালা হয়ে। আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রেও এই ভৌগোলিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সাজেককে দীর্ঘদিন ধরে ইউপিডিএফের প্রভাবাধীন অঞ্চল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্যদিকে জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন অংশের শক্তিশালী রাজনৈতিক উপস্থিতি ঐতিহাসিকভাবে রাঙামাটিকেন্দ্রিক। ফলে সাজেকে নতুন করে প্রভাব প্রতিষ্ঠার অভিযোগকে শুধু স্থানীয় নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে নয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেও দেখতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাজেকের ক্রমবর্ধমান পর্যটন অর্থনীতি। একসময় দুর্গম পাহাড়ি জনপদ হিসেবে পরিচিত সাজেক এখন দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য। সেখানে গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও পর্যটননির্ভর ব্যবসা। পর্যটকদের পরিবহন, আবাসন, খাবার সরবরাহ ও স্থানীয় বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ফলে সাজেকের ওপর নিয়ন্ত্রণ এখন শুধু রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন নয়; অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।

কয়েকটি অনুসন্ধানধর্মী প্রতিবেদনে পর্যটন ব্যবসা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ এবং সেই অর্থের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরোধের কথা উঠে এসেছে। এতে সাজেকের সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কারণ কোনো এলাকায় নিয়মিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যত সম্প্রসারিত হয়, সেই অঞ্চলের ব্যবসা ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রণোদনাও তত বাড়তে পারে। তবে কোন সংগঠন কত অর্থ আদায় করে, কার নির্দেশে তা পরিচালিত হয় কিংবা সাম্প্রতিক সহিংসতার সঙ্গে নির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না।

সাজেকের বিরোধের আরেকটি গভীর স্তর ভূমির অধিকার। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ব্যবস্থাপনা দেশের সমতল অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রথাগত ভূমি ব্যবহার, জুমচাষ, মৌজাপ্রধান ও কার্বারীদের সামাজিক ভূমিকা এবং সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে দীর্ঘদিনের জটিলতা রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্যটন অবকাঠামোর সম্প্রসারণ, জমির বাণিজ্যিক মূল্য বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার পরিবর্তন।

পর্যটনের প্রসার সাজেকে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি করলেও এর সুফল কারা পাচ্ছেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের ভূমি ও জীবিকার অধিকার কতটা সুরক্ষিত এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাদের অংশগ্রহণ কতটুকু; এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ভূমির মালিকানা বা ব্যবহার নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে তা রাজনৈতিক অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে অক্টোবরের অবরোধ ও গোলাগুলির প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে নির্দিষ্ট কোনো ভূমিবিরোধের প্রমাণ নেই। ভূমির প্রশ্নটি বরং সাজেকের দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা বোঝার একটি কাঠামোগত উপাদান।

বর্তমান সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রশাসনের ভূমিকা। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেছেন, সশস্ত্র সদস্যদের সরাতে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে লোকদেখানো অভিযান হয়েছে। অভিযানের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগও তুলেছেন তারা।

সাজেকের মতো দুর্গম এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে কঠিন। তবে একই এলাকায় বারবার অবরোধ, পর্যটন নিষেধাজ্ঞা এবং সশস্ত্র উপস্থিতির অভিযোগ উঠলে শুধু সাময়িক নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করার সীমাবদ্ধতাও সামনে আসে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন, অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় নির্ধারণ এবং আইনসম্মত জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন।

এখানে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর প্রতিযোগিতা যতই তীব্র হোক, তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন ও জীবিকায়। পর্যটন ব্যবসা বন্ধ থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত হন রিসোর্টের কর্মী, গাড়িচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, খাবার সরবরাহকারী এবং স্থানীয় উদ্যোক্তারা। অন্যদিকে সশস্ত্র উপস্থিতি ও ভয়ভীতির অভিযোগের কারণে জুমচাষিরা জমিতে যেতে না পারলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পাহাড়ি অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি। অর্থাৎ সংকটটি শুধু পর্যটনশিল্পের ক্ষতি নয়; স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা, জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের প্রশ্ন।

বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নামে ঘোষিত কর্মসূচিকে ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তোলে। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন বলছে, জনগণের নিরাপত্তার দাবিতেই তাদের আন্দোলন। অন্যদিকে জেএসএসের বক্তব্যে উঠে এসেছে ইউপিডিএফের প্রভাবের অভিযোগ। তবে স্থানীয় আন্দোলনকে প্রমাণ ছাড়া কোনো সংগঠনের নিয়ন্ত্রিত কর্মসূচি বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করলেও পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না।

সাজেকের বর্তমান অস্থিরতা অন্তত তিনটি পরস্পরসংযুক্ত সংকটকে সামনে এনেছে। প্রথমত, সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। তৃতীয়ত, পর্যটন অর্থনীতির সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত নতুন অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং পুরোনো ভূমি ও অধিকারসংক্রান্ত অমীমাংসিত প্রশ্ন। এই উপাদানগুলোর কোনটি সাম্প্রতিক সহিংসতায় কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা নির্ধারণে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তির প্রায় তিন দশক পরও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ জড়িয়ে রয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নের অমীমাংসিত প্রশ্ন, আঞ্চলিক দলগুলোর পারস্পরিক সংঘাত এবং স্থানীয় মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা; সব মিলিয়ে পার্বত্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সাজেকের সাম্প্রতিক ঘটনা সেই বৃহত্তর বাস্তবতাকে আবার সামনে এনেছে।

সাজেকের সংকটের সমাধান শুধু পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা কিংবা কয়েক দিনের জন্য সড়ক অবরোধ প্রত্যাহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন সশস্ত্র তৎপরতার প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বেআইনি অর্থ আদায়ের অভিযোগ যাচাই, প্রথাগত ভূমি অধিকার ও জীবিকার সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে অর্থবহ সংলাপ। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।

শেষ পর্যন্ত সাজেকের মূল প্রশ্ন কে কোন পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ নেবে, তা নয়; বরং পাহাড়ের মানুষ কতটা নিরাপদে, স্বাধীনভাবে এবং মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারছেন। পর্যটনের চাকচিক্যের আড়ালে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ ও অধিকার উপেক্ষিত থাকলে সাময়িক শান্তি এলেও অসন্তোষের কারণগুলো থেকে যাবে।

সাজেকের মেঘের আড়ালে যে অস্থিরতা বারবার ফিরে আসছে, সেটিকে বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলা সমস্যা হিসেবে দেখলে সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। সেখানে রাজনৈতিক আধিপত্য, অর্থনৈতিক স্বার্থ, ঐতিহাসিক অবিশ্বাস ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সশস্ত্র ব্যক্তিদের পরিচয় ও দায় নির্ধারণ করবে তদন্ত; কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কোনো সংগঠনের শক্তি নয়, সাধারণ মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তাই হবে প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

বিষয়:আইনশৃঙ্খলা পর্যটক পার্বত্য শান্তিচুক্তি রাঙামাটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সাজেক

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…