অহংকার সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?

নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় মনে করা, নিজের জ্ঞান, সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা মর্যাদা নিয়ে গর্ব করা এবং অন্যকে ছোট করে দেখা, ইসলামের দৃষ্টিতে অহংকারের অন্যতম প্রকাশ। ইসলাম মানুষকে বিনয়ী হতে শেখায়।
যে অহংকার মানুষকে আল্লাহর কাছেও অপছন্দনীয় করে তোলে।
কারণ, মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার সম্পদ, সৌন্দর্য কিংবা সামাজিক অবস্থানে নয়, বরং তার তাকওয়া, চরিত্র ও আমলে।
অহংকারের বিষয়ে কোরআনের নির্দেশনা
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা অহংকার ও আত্মম্ভরিতা থেকে মানুষকে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন।
আল্লাহ বলেন,
“আর মানুষের দিক থেকে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না এবং পৃথিবীতে অহংকারভরে চলাফেরা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”
— সূরা লুকমান, আয়াত ১৮
এই আয়াতে মানুষের সঙ্গে আচরণে বিনয়ী হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। কেউ ধনী, ক্ষমতাবান, শিক্ষিত কিংবা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেই অন্যকে অবজ্ঞা করার অধিকার পায় না। মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা এবং নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে না করাই ইসলামের শিক্ষা।
অহংকারের কারণে ইবলিসের পতন
ইসলামের ইতিহাসে অহংকারের সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইবলিস। আল্লাহ তাআলা যখন আদম (আ.)-কে সিজদা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তখন ইবলিস অহংকারবশত তা প্রত্যাখ্যান করে। সে নিজেকে আদমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করেছিল।
পবিত্র কোরআনে ইবলিসের বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, সে বলেছিল, “আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।”
— সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত ১২
নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করা এবং আল্লাহর নির্দেশের সামনে অহংকার প্রকাশ করার পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে, ইবলিসের ঘটনা তারই শিক্ষা দেয়।
অহংকার সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) কী বলেছেন?
রাসুলুল্লাহ (সা.) অহংকারের সংজ্ঞা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেছেন,
“অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।”
— সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯১
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সুন্দর পোশাক পরা, পরিচ্ছন্ন থাকা কিংবা ভালো জীবনযাপন করাই অহংকার নয়। বরং সত্য কথা জানার পরও তা গ্রহণ না করা এবং অন্য মানুষকে ছোট মনে করাই অহংকারের মূল প্রকাশ।
একজন মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করতে না চাইলে, অন্যের ভালো কাজকে স্বীকৃতি দিতে না পারলে কিংবা নিজের অবস্থানকে সবার ঊর্ধ্বে মনে করলে তার আচরণে অহংকার প্রকাশ পেতে পারে।
সম্পদ, সৌন্দর্য ও ক্ষমতা কি অহংকারের কারণ হতে পারে?
অনেক সময় মানুষ নিজের সম্পদ, রূপ, শিক্ষা, পদমর্যাদা কিংবা জনপ্রিয়তা নিয়ে গর্ব করতে গিয়ে অন্যকে অবহেলা করে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এসবই আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত, যা নিয়ে কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
“আর পৃথিবীতে দম্ভভরে চলাফেরা করো না। নিশ্চয়ই তুমি কখনোই পদভারে পৃথিবীকে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনোই পর্বতসম হতে পারবে না।”
— সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৩৭
মানুষ যত বড় পদেই থাকুক, তার ক্ষমতা ও জীবনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আজ যে ব্যক্তি সম্পদ বা ক্ষমতার অধিকারী, কাল সে অসহায় হয়ে পড়তে পারে। তাই নিজের অবস্থান নিয়ে অহংকার না করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং মানুষের পাশে দাড়ানোই উত্তম।
বিনয় কি দুর্বলতার লক্ষণ?
অনেকে মনে করেন, বিনয়ী হলে মানুষ দুর্বল ভাববে। কিন্তু ইসলামি শিক্ষা অনুযায়ী বিনয় দুর্বলতা নয়, বরং উন্নত চরিত্রের পরিচয়।
আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নির্দেশ দিয়েছেন মুমিনদের প্রতি বিনয়ী হতে। সূরা আশ-শুআরা-এর ২১৫ নম্বর আয়াতে এ নির্দেশের কথা এসেছে।
বিনয়ী হওয়ার অর্থ নিজের অধিকার ছেড়ে দেওয়া কিংবা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা নয়। বরং নিজের মর্যাদা বজায় রেখে অন্যকে সম্মান করা, ভুল হলে তা স্বীকার করা এবং সত্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা রাখাই বিনয়ের পরিচয়।
অহংকার থেকে বাঁচার উপায়
অহংকার থেকে নিজেকে রক্ষা করতে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি।
১. আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা: নিজের সাফল্য ও প্রাপ্তিকে কেবল নিজের যোগ্যতার ফল মনে না করে আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে দেখা।
২. অন্যকে সম্মান করা: কারও অর্থ, পেশা, শিক্ষা কিংবা সামাজিক অবস্থান দেখে তাকে ছোট না করা।
৩. ভুল স্বীকার করা: নিজের ভুল বুঝতে পারলে তা মেনে নেওয়া এবং সংশোধনের চেষ্টা করা।
৪. সত্যকে গ্রহণ করা: সত্য কথা নিজের বিপক্ষে গেলেও তা মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা।
৫. নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করা: দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। সম্পদ, পদমর্যাদা ও জনপ্রিয়তা একসময় শেষ হয়ে যাবে। তাই অহংকার নয়, সৎকর্মের প্রতিই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
শেষ কথা
ইসলাম মানুষকে আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন হতে শেখায়, কিন্তু অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করতে শেখায় না। নিজের অর্জনে আনন্দিত হওয়া এবং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা দোষের নয়। সমস্যা তখনই, যখন সেই অর্জন মানুষকে অন্যের প্রতি অবজ্ঞাশীল করে তোলে এবং সত্য গ্রহণের পথে বাধা সৃষ্টি করে।






