আন্তর্জাতিক

মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের অপূরণীয় ধ্বস এবং গাজা গণহত্যার ভয়াবহ বাস্তবতা: ইসরায়েলি গণমাধ্যম

জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে ফিল গর্ডনের বিস্ফোরক সত্য উন্মোচন ও গাজা গণহত্যার সর্বশেষ চিত্র

মার্কিন-ইসরায়েল কূটনৈতিক সম্পর্কের ‘অপূরণীয় ধস’: জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে ফিল গর্ডনের বিস্ফোরক সত্য উন্মোচন ও গাজা গণহত্যার সর্বশেষ চিত্র

মার্কিন-ইসরায়েল কূটনৈতিক সম্পর্কের ‘অপূরণীয় ধস’: জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে ফিল গর্ডনের বিস্ফোরক সত্য উন্মোচন ও গাজা গণহত্যার সর্বশেষ চিত্র

ইসরায়েলি শীর্ষ সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট-এ প্রকাশিত এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জো বাইডেন প্রশাসনের সিনিয়র কর্মকর্তা এবং কমলা হ্যারিসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ফিল গর্ডন এক চাঞ্চল্যকর ও কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। তার মতে, চলমান গাজা যুদ্ধ ও গণহত্যার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে বহু দশকের পুরোনো ঐতিহাসিক ও কৌশলগত কূটনৈতিক সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এই ক্ষতি হয়তো স্থায়ী ও অপূরণীয়।

জেরুজালেম পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গর্ডন অকপটে বলেন, “মার্কিন জনগণের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন এবং সহানুভূতি সত্যি বলতে ধসে পড়েছে। বিষয়টি ঢেকে রাখার কোনো সুযোগ নেই, এবং এটি ইসরায়েলিদের খুব গুরুত্বের সঙ্গে বোঝা উচিত।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই ভাঙন কেবল ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু কিংবা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক মেয়াদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আমেরিকান সমাজের সাধারণ নাগরিক ও তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক স্থায়ী পরিবর্তন ঘটে গেছে।

মার্কিন রাজনীতিতে ঐতিহাসিক বাঁক ও অস্ত্রের শর্তারোপ

ফিল গর্ডন জেরুজালেম পোস্ট-এর কাছে ব্যাখ্যা করেন যে, অতীতে মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো শর্ত আরোপ করার বিষয়টিকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির চরমপন্থী বা প্রান্তিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু গাজা যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের কারণে এটি এখন ডেমোক্র্যাটদের মূলধারার নীতিতে পরিণত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে বেশিরভাগ ডেমোক্র্যাট সদস্যই এখন ইসরায়েলের নীতি ও পশ্চিম তীরের বেআইনি বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহে শর্ত আরোপের বিল সমর্থন করছেন। গর্ডন সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েলের প্রতি আমেরিকানদের এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন কোনো ক্ষণস্থায়ী ঘটনা নয়। এটি একটি সুদূরপ্রসারী এবং প্রজন্মগত পরিবর্তন। একটি নতুন ইসরায়েলি সরকার এসে হয়তো সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করতে পারে, তবে যে বিশাল ফাটল তৈরি হয়েছে তা পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন হবে।

২০২৪ সালের গ্রীষ্মের গোপন কূটনীতি ও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বাধা

জেরুজালেম পোস্ট-কে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে ফিল গর্ডন ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে জিম্মি মুক্তি ও যুদ্ধবিরতি চুক্তির পেছনে চলা গোপন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক নাটকের ভেতরের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন:

  • মে ও জুলাই ২০২৪-এর কূটনৈতিক উদ্যোগ: ২০২৪ সালের মে মাসের শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একটি বহুধাপবিশিষ্ট যুদ্ধবিরতির রূপরেখা উপস্থাপন করেছিলেন। জুলাই মাসের ২ তারিখে হ্যামাস নীতিগতভাবে এই রূপরেখা মেনে নেয় এবং তাদের প্রাথমিক শর্ত অনুযায়ী স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আগাম ঘোষণার অবস্থান থেকে সরে আসে।

  • ৪ জুলাইয়ের ফোনালাপ: এই ইতিবাচক সংকেত পাওয়ার পর ২০২৪ সালের ৪ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ফোন করেন এবং এই ঐতিহাসিক সুযোগ কাজে লাগিয়ে অবিলম্বে চুক্তিতে সম্মত হতে জোর তাগিদ দেন। কিন্তু ফোনালাপের সময় নেতানিয়াহুর মনোভাব বাইডেন প্রশাসনকে মারাত্মকভাবে হতাশ করে।

  • নেতানিয়াহুর নতুন শর্তাবলী: নেতানিয়াহু চুক্তিটি মেনে নেওয়ার বদলে একের পর এক নতুন কঠিন শর্ত যুক্ত করতে শুরু করেন। তিনি মিসর ও গাজা সীমান্তের ‘ফিলাডেলফি করিডোর’-এ দীর্ঘমেয়াদি ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন এবং উত্তর গাজায় ফিলিস্তিনিদের ফেরার ওপর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তল্লাশি ব্যবস্থা চালুর দাবি তোলেন।

  • সামরিক বিরোধিতা ও রাজনৈতিক স্বার্থ: গর্ডন জানান, তৎকালীন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইওভ গ্যালান্টসহ জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা ফিলাডেলফি করিডোরে সেনা রাখাকে সামরিকভাবে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এবং জিম্মি চুক্তির প্রধান বাধা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু নেতানিয়াহু নিজের চরমপন্থী ডানপন্থি শাসনকোট বাঁচানোর উদ্দেশ্যে কৌশলগতভাবে চুক্তিটি বিলম্বিত করেন।

  • ট্র্যাজিক পরিণতি: গর্ডনের হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর এই একগুঁয়েমির কারণে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নে পুরো ছয় মাস বিলম্ব হয়। এই বিলম্বের মধ্যে অতিরিক্ত প্রায় ৯,০০০ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান এবং বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি জিম্মি মৃত্যুবরণ করেন। অবশেষে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেখানে নেতানিয়াহুর চাপিয়ে দেওয়া এই দুটি শর্তই শেষ পর্যন্ত বাদ দিতে হয়েছিল।

বাইডেন ও ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত সমালোচনা

গর্ডন তাঁর সাক্ষাৎকারে জো বাইডেন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প—উভয় মার্কিন প্রশাসনের কর্মকাণ্ডেরই তীব্র সমালোচনা করেছেন:

  • বাইডেন প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা: বাইডেন প্রশাসন ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে মারাত্মক ভুল করেছে বলে মনে করেন তৎকালীন বহু কর্মকর্তা। যদিও বাইডেন দুই হাজার পাউন্ডের বোমা সরবরাহ স্থগিত রাখা বা ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের ত্রাণকর্মীদের ওপর ইসরায়েলি হামলার পর সাময়িক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন, তবুও গাজায় যুদ্ধ থামাতে প্রয়োজনীয় জোরালো সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ দিতে ওয়াশিংটন ব্যর্থ হয়েছিল।

  • ট্রাম্প প্রশাসনের দায়ভার: ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সাময়িক যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর মার্চ মাসে ইসরায়েল পুনরায় সেই চুক্তি লঙ্ঘন করে গাজার ওপর দুই মাসব্যাপী সম্পূর্ণ খাদ্য, পানি ও ওষুধের অবরুদ্ধকরণ আরোপ করে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন দীর্ঘদিন এই অমানবিক আচরণের প্রতি চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত দোহায় ইসরায়েলি বিমান হামলার পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন নিষ্ক্রিয়তা ভাঙে।

  • ইরান সংকট ও আঞ্চলিক অস্থিরতা: গর্ডন সতর্ক করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মুখোমুখি অবস্থান একটি মারাত্মক ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে। সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনসহ পুরো অঞ্চলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে।

গাজা গণহত্যা ও বর্তমান ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র

ফিল গর্ডন জেরুজালেম পোস্ট-এর কাছে মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের যে ধ্বংসের চিত্র তুলে ধরেছেন, তার পেছনের আসল চালিকাশক্তি হলো গাজায় পরিচালিত অনবরত গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ।

আন্তর্জাতিক আদালত, জাতিসংঘ এবং বিশ্বের খ্যাতনামা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় পরিচালিত ইসরায়েলি সামরিক অভিযান একটি পরিকল্পিত গণহত্যায় রূপ নিয়েছে:

  • অনবরত প্রাণহানি ও নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ: আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইসরায়েলি বিমান ও স্থল হামলায় গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭৫,০০০ ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে ৮০ শতাংশেরই বেশি নিরপরাধ নারী ও শিশু। এছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে নিখোঁজ রয়েছেন আরও হাজার হাজার ফিলিস্তিনি।

  • পরিকল্পিত অনাহার ও মানবিক অবরুদ্ধকরণ: গাজাকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে খাদ্য, পানি, ওষুধ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার ফলে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হয়েছে। অনাহার ও চিকিৎসার অভাবে শত শত শিশু ও বৃদ্ধ প্রাণ হারিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।

  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও নাগরিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস: গাজার প্রায় ৯৪ শতাংশ হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র বোমা মেরে ধ্বংস বা অকেজো করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ৮০ শতাংশের বেশি বিদ্যালয়, বিদ্যুৎ ও পানি শোধনাগার সম্পূর্ণ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে এলাকাটিকে বাসযোগ্য করা না যায়।

  • ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি: গাজার প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষ (মোট জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশেরও বেশি) নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে বারবার স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছেন এবং চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন।

  • আন্তর্জাতিক আইনি জবাবদিহিতা: দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছে যে, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড জাতিসংঘের ‘গণহত্যা সনদ’-এর ধারাগুলোর পরিপন্থী। জাতিসংঘের বিশেষ তদন্ত কমিটিও নিশ্চিত করেছে যে, গাজায় বেসামরিক মানুষের ওপর আক্রমণ ও ত্রাণপ্রার্থীদের হত্যা পরিকল্পিত গণহত্যার অংশ।

জেরুজালেম পোস্ট-এ প্রকাশিত ফিল গর্ডনের বিস্ফোরক বয়ান বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেয় যে, গাজায় ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর চালানো গণহত্যা ও নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ কেবল ফিলিস্তিনিদের জীবনকেই তছনছ করেনি, বরং ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় সুহৃদ ও পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিটাকেও নড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের জনমতের এই মৌলিক পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, গাজা যুদ্ধের জঘন্য অপরাধগুলো দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর এক বিশাল কালো ছায়া ফেলে দিয়েছে।

বিষয়:আমেরিকা ইসরায়েল গাজা গণহত্যা নেতানিয়াহু

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…