দীর্ঘ তিন দশক ধরে ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজের দেশের মানুষের কাছে একটি বড় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বিক্রি করে এসেছেন—আমেরিকাকে কীভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, তা কেবল তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে তার বন্ধুত্বকে তিনি নিজের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
তবে ২০২৬ সালের জুনে এসে সেই ‘বিবি মিথ’ বা নেতানিয়াহুর ম্যাজিক আজ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। আর এই পতনের পেছনে মূল কারিগর আর কেউ নন, স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ইরান চুক্তি নেতানিয়াহুর এতদিনের সাজানো সমীকরণ ও রাজনৈতিক আধিপত্যকে এক নিমেষে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়েছে।
ট্রাম্প-ইরান অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি : ইসরায়েলের জন্য বড় ধাক্কা
গত বুধবার ট্রাম্প ইরানের সাথে একটি আকস্মিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করার ঘোষণা দেন। এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি মূলত আগামী ৬০ দিনের জন্য একটি আলোচনার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে, যার মাধ্যমে আপাতত চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটছে এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত হচ্ছে।
এই চুক্তির ভাষা কোনো বিজয়ী বা পরাজিত রাষ্ট্রের মধ্যকার একপেশে শর্তের মতো নয়, বরং দুটি সমান শক্তির দেশের মধ্যে শান্তি চুক্তির মতো শোনায়। আর এটাই ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চুক্তির মূল ধারাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
-
লেবানন সীমান্ত ও যুদ্ধবিরতি: চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদেই লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের কথা বলা হয়েছে। একই সাথে লেবাননের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছে। ইসরায়েল এটি তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে, কারণ হেজবুল্লাহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবানন ছাড়তে রাজি নয় তেল আবিব।
-
পারমাণবিক নীতিতে ছাড়: চুক্তিতে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করলেও, তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ইরানি মাটিতেই রেখে দেওয়া হচ্ছে। ইসরায়েলের দাবি ছিল এই মজুত ধ্বংস বা সরিয়ে নেওয়া, কিন্তু চুক্তিতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) তত্ত্বাবধানে অন-সাইট ‘ডাউন-ব্লেণ্ডিং’ বা মান কমিয়ে ফেলার কথা বলা হয়েছে।
-
অর্থনৈতিক সুবিধা: চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে সাথেই ইরান অপরিশোধিত তেল রপ্তানির সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া অবরুদ্ধ করে রাখা তহবিল মুক্ত করার পাশাপাশি ইরানের পুনর্গঠনে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক প্যাকেজের ইঙ্গিত রয়েছে।
-
ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে নীরবতা: এই চুক্তিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। ট্রাম্পের মতে, সৌদি আরব বা কাতারের মতো দেশের কাছে যখন ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তখন ইরানের কাছে এটি থাকা ‘অন্যায় কিছু নয়’।
নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মধ্যকার এই ফাটল এখন আর পর্দার আড়ালে নেই, বরং তা বিশ্বমঞ্চে প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, নেতানিয়াহুর কোনো “বিবেচনাবোধ নেই”। এমনকি জি-৭ সম্মেলনে ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় মন্তব্য করেন:
“আমি না থাকলে আজ ইসরায়েলের কোনো অস্তিত্বই থাকত না, কারণ অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট তাদের জন্য তা করত না যা আমি করেছি। বিবির সাথে আমার সম্পর্ক ভালো, তবে লেবানন ইস্যুতে এখন তাকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রতিবার কাউকে টার্গেট করার জন্য পুরো একটা ভবন ধসিয়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।”
ট্রাম্প আরও স্পষ্ট করে দেন যে, আমেরিকার মতো ‘বড় পার্টনারের’ কাছে ইসরায়েল অত্যন্ত ‘ছোট একটি পার্টনার’ মাত্র। হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—“এটাই চুক্তি, এটি একটি চমৎকার চুক্তি এবং এই যুদ্ধ শেষ করার এটাই সময়।”
নেতানিয়াহুও বুঝতে পেরেছেন যে ট্রাম্পকে এই চুক্তি সই করা থেকে আটকানোর ক্ষমতা তার নেই। ফলস্বরূপ, নেতানিয়াহুর দল লিকুড পার্টি তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্পের সাথে সম্পর্ক দেখানোর পরিকল্পনাটি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর এই সংঘাত সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচলিত একটি বর্ণবাদী ও ইহুদি-বিদ্বেষী (antisemitic) মিথ্যাচারকে পুরোপুরি মিথ্যা প্রমাণ করেছে। দীর্ঘকাল ধরে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হতো যে, ইসরায়েল বা নেতানিয়াহু আড়ালে থেকে মার্কিন প্রশাসনকে ‘পাপেট’ বা পুতুলের মতো নিয়ন্ত্রণ করেন।
আমেরিকান জিউইশ কমিটি এবং অ্যান্টি-ডিফেমেশন লিগ দীর্ঘদিন ধরেই এই ‘পাপেট মাস্টার’ তত্ত্বের বিরুদ্ধে সতর্ক করে আসছিল। বর্তমান ট্রাম্প-ইরান চুক্তি প্রমাণ করেছে যে, নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনের ওপর চাপ তৈরি করার চেষ্টা করলেও মার্কিন নীতি তার কথায় ওঠবস করে না। বরং এই চুক্তি ইসরায়েলের চরম ‘নির্ভরশীলতা’ প্রকাশ করে দিয়েছে। এখানে যদি কেউ ‘পাপেট মাস্টার’ থেকে থাকেন, তবে তিনি নেতানিয়াহু নন—স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নেতানিয়াহুর সমর্থকরা যুক্তি দিতে পারেন যে, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ইসরায়েলের জোরালো সামরিক হামলার কারণেই ইরান এই চুক্তিতে আসতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু সাধারণ ভোটারদের কাছে এই যুক্তি টিকছে না। আগামী অক্টোবরে ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ বলছে, নেতানিয়াহুর জোট তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে চলেছে।
এরই মধ্যে ইসরায়েলের বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ এই চুক্তিকে একটি “মহাবিপর্যয়” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইরান ও হেজবুল্লাহকে পরাস্ত করতে নেতানিয়াহু সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন এবং এই চুক্তির টেবিলে ইসরায়েলের অনুপস্থিতি একটি চরম অপমানজনক কূটনৈতিক ব্যর্থতা।
নেতানিয়াহু তার পুরো ক্যারিয়ার গড়েছিলেন এই অহংকার নিয়ে যে, তিনি আমেরিকাকে নিজের মতো করে চালাতে পারেন। কিন্তু ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক চুক্তি প্রমাণ করল—নেতানিয়াহু কোনো পরাশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন না, বরং আমেরিকাই সবসময় তাকে নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। আর এই ধ্রুব সত্যটিই হয়তো নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় লিখে দিচ্ছে।







