বিপদের সময় যে দোয়া করেছিলেন মুসা (আ.)

ছবি: সংগৃহীত
জীবনে কখনো এমন সময় আসে, যখন সামনে কোনো পথ খোলা আছে বলে মনে হয় না। চারপাশে অনিশ্চয়তা, মনে দুশ্চিন্তা, আর প্রয়োজনের সময় পাশে কাউকে পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের ভরসা আল্লাহর ওপর। কোরআনে বর্ণিত হজরত মুসা (আ.)-এর একটি দোয়া আমাদের সেই নির্ভরতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। দোয়াটি ছোট, কিন্তু এর অর্থ গভীর। এতে নির্দিষ্ট কোনো চাওয়া নয়, বরং আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন ও অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
মুসা (আ.)-এর সেই দোয়া
আরবি:
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
বাংলা উচ্চারণ: রব্বি ইন্নি লিমা আনজালতা ইলাইয়া মিন খাইরিন ফাকির।
অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণই নাজিল করবেন, নিশ্চয়ই আমি তার মুখাপেক্ষী।
দোয়াটি পবিত্র কোরআনের সূরা আল-কাসাসের ২৪ নম্বর আয়াতে রয়েছে।
কোন পরিস্থিতিতে দোয়াটি করেছিলেন মুসা (আ.)?
কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, মিসর ছেড়ে মাদইয়ানে পৌঁছানোর পর হজরত মুসা (আ.) একটি কূপের কাছে যান। সেখানে তিনি দেখেন, একদল মানুষ তাদের পশুদের পানি পান করাচ্ছে। অন্যদিকে দুজন নারী নিজেদের পশুগুলোকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন। মুসা (আ.) তাঁদের কারণ জানতে চাইলে তাঁরা জানান, রাখালেরা সরে না যাওয়া পর্যন্ত তাঁরা পশুগুলোকে পানি পান করাতে পারেন না। তাঁদের বাবা বৃদ্ধ হওয়ায় তাঁরা নিজেরাই পশুগুলোর দেখাশোনা করেন। এ কথা শুনে মুসা (আ.) তাঁদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়ে দেন। এরপর তিনি ছায়ায় গিয়ে বসেন এবং আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজনের কথা জানিয়ে সেই দোয়া করেন। এই ঘটনাটি সূরা আল-কাসাসের ২২ থেকে ২৪ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
দোয়াটির মধ্যে কী শিক্ষা রয়েছে?
১. নিজের অসহায়ত্ব আল্লাহর কাছে প্রকাশ করা
মুসা (আ.) তাঁর প্রয়োজনের কথা আল্লাহর কাছে তুলে ধরেছিলেন। এই দোয়া আমাদের শেখায়, নিজের দুর্বলতা বা প্রয়োজনের কথা আল্লাহর কাছে বলতে দ্বিধা করার কিছু নেই।
২. কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা
দোয়াটিতে নির্দিষ্ট করে অর্থ, খাবার, আশ্রয় কিংবা কোনো একটি বিষয় চাওয়া হয়নি। বরং আল্লাহর কাছ থেকে যেকোনো কল্যাণের প্রয়োজন প্রকাশ করা হয়েছে। মানুষের কাছে কোনটি প্রকৃত কল্যাণ, তা সব সময় স্পষ্ট নাও হতে পারে। তাই আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
৩. দোয়ার পাশাপাশি ভালো কাজ করা
মুসা (আ.) নিজেও প্রয়োজনের মধ্যে ছিলেন। তারপরও তিনি অন্যের অসুবিধা দেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এরপর আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজনের কথা বলেছেন। এখান থেকে অন্যের উপকার করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার শিক্ষা পাওয়া যায়।
দোয়ার পর কী ঘটেছিল?
পরের আয়াতগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, ওই দুই নারীর একজন মুসা (আ.)-এর কাছে এসে তাঁদের বাবার পক্ষ থেকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানান। পরে তাঁদের বাবা মুসা (আ.)-এর সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁকে নিরাপত্তার আশ্বাস দেন। এরপর তাঁর এক মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং নির্দিষ্ট সময় কাজ করার শর্তের কথা জানান। ঘটনাগুলো সূরা আল-কাসাসের ২৫ থেকে ২৮ নম্বর আয়াতে রয়েছে। তবে কোরআনে দোয়ার পর কত সময়ের মধ্যে এসব ঘটনা ঘটেছিল, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তাই এই দোয়াকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চাকরি, বিয়ে কিংবা অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
কখন এই দোয়া পড়বেন?
জীবনে কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে, জীবিকা নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে, নতুন সুযোগের অপেক্ষায় থাকলে কিংবা আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাইলে এই দোয়া পড়া যেতে পারে। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় বা নির্দিষ্টসংখ্যকবার পড়ার বিধান এই আয়াতে উল্লেখ নেই। দোয়া পড়ার পাশাপাশি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করা, হালাল পথে চলা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাও জরুরি।
বিপদের সময়ে ভরসা রাখুন আল্লাহর ওপর
মুসা (আ.)-এর এই দোয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ যখন নিজের প্রয়োজন নিয়ে অসহায় বোধ করে, তখনও আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার পথ খোলা থাকে। সব সময় নিজের চাওয়া স্পষ্ট করে বলতে না পারলেও আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা যায়। জীবনের কঠিন সময়ে তাই দোয়াটি পড়ার পাশাপাশি এর অর্থ বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। কারণ দোয়া শুধু কিছু শব্দ উচ্চারণ নয়, এটি আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন স্বীকার করা, তাঁর সাহায্য চাওয়া এবং তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখারও প্রকাশ।





