আন্তর্জাতিক

অনাহারে ১৯১ জনকে হত্যা: কেনিয়ার প্রলয়বাদী ধর্মগুরুর ২০০ বছরের কারাদণ্ড

অনাহারে ১৯১ জনকে হত্যা: কেনিয়ার প্রলয়বাদী ধর্মগুরুর ২০০ বছরের কারাদণ্ড

ছবি: সংগৃহীত

কেনিয়ায় ধর্মীয় গোষ্ঠীর নেতা পল ম্যাকেঞ্জিকে ১৯১ জনকে হত্যার দায়ে ২০০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। নিহতদের মধ্যে ১৯০ জনই শিশু। ধর্মীয় বিশ্বাসের নামে অনুসারীদের অনাহারে রেখে এবং নির্যাতনের মাধ্যমে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) কেনিয়ার মোম্বাসা হাইকোর্ট এ রায় দেন। একই মামলায় ম্যাকেঞ্জির সঙ্গে আরও দুই ডজনের বেশি ব্যক্তিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। পল ম্যাকেঞ্জি গুড নিউজ ইন্টারন্যাশনাল চার্চের প্রতিষ্ঠাতা।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

আদালতের রায়ে বলা হয়, ম্যাকেঞ্জি অনুসারীরা প্রচার করেছিলেন, ২০২৩ সালের আগস্টে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। স্বর্গে যেতে হলে তাদের উপবাস করতে হবে। কেনিয়ার সিনেটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার ধর্মীয় প্রচার ছিল মূলত পৃথিবীর শেষ সময় বা মহাপ্রলয়সংক্রান্ত বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে শিশুদের মৃত্যু হওয়ার কথা ছিল। এরপর তরুণ ও নারীরা মারা যাবেন। পুরুষদের দায়িত্ব ছিল সবার মরদেহ দাফন করার পর মৃত্যুবরণ করা।

ম্যাকেঞ্জিকে অনাহারে মৃত্যুর ঘটনায় ১০০ বছর এবং সরাসরি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আরও ১০০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার সময় বিচারক ডায়ানা কাভেদজা বলেন, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে আসামিরা মনে করতে পারেন, মৃত্যুর মাধ্যমে তারা যিশুর সঙ্গে পুনর্মিলিত হবেন। এতে শাস্তির উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। পাশাপাশি নিখোঁজ শিশুদের মরদেহ উদ্ধারে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সহযোগিতার সুযোগও রাখতে চান আদালত।

বিচারক জানান, নিহত ১৯১ জনের মধ্যে ১৬১ জনের বয়স ছিল ৯ বছর বা তার কম। ১০ থেকে ১৩ বছর বয়সী ছিল ২২ জন এবং ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী ছিল পাঁচজন। বাকি দুজনের বয়স নির্ধারণ করা যায়নি। নিহতদের মধ্যে ১৮৩ জন অনাহারে মারা যায়। তাদের মধ্যে ১৮২ জন শিশু এবং একজন প্রাপ্তবয়স্ক। বাকি আট শিশু শ্বাসরোধ, গলা চেপে ধরা কিংবা মারধরের কারণে মারা যায়।

ম্যাকেঞ্জি অনুসারীদের বাড়িঘর ছেড়ে পূর্ব কেনিয়ার শাকাহোলা বনে গিয়ে বসবাস করতে উৎসাহিত করেছিলেন। তার দাবি ছিল, সেখানে উপবাস করলে তারা ঈশ্বরের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবেন এবং স্বর্গে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারবেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ধর্মীয় বক্তব্য ব্যবহার করে অনুসারীদের উপবাসে বাধ্য করা হতো। পাহারাদারেরা তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং কাউকে বন থেকে বের হতে দিতেন না। যারা উপবাসে আপত্তি জানাতেন, তাদের জোর করা হতো। শিশুদের বেঁধে রাখা, খাবার না দেওয়া এবং খেতে বা পালাতে চেষ্টা করলে শাস্তি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

গত মাসে হত্যার দায়ে ম্যাকেঞ্জিকে দোষী সাব্যস্ত করেন আদালত। তার মুঠোফোন থেকে উদ্ধার করা হোয়াটসঅ্যাপ বার্তাসহ বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণে অনুসারীদের শাকাহোলা বনে নিয়ে যাওয়ার আগে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়। বিচারক বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত অধিকাংশ ব্যক্তির মধ্যে অপরাধের জন্য অনুশোচনার লক্ষণ দেখা যায়নি। শুক্রবার সাজা ঘোষণার সময় ম্যাকেঞ্জিকে কয়েকবার হাসতেও দেখা যায়।

২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে শাকাহোলা বনে মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর সেখানে মরদেহ উদ্ধারে অভিযান শুরু করে কর্তৃপক্ষ। এ পর্যন্ত ৪০০টির বেশি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গত মাসের মামলায় ১৯১ জনকে হত্যার দায়ে দণ্ড দেওয়া হলেও এ ঘটনায় আরও মামলা হতে পারে।

এ ঘটনায় নিজের ছয় সন্তানকে হারিয়েছেন স্টিফেন এমউইতি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি জানান, তার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে ওই বনে উপবাস করতে গিয়েছিলেন। এ মামলায় তার স্ত্রীও দণ্ডিত হয়েছেন। শিশুদের উপবাসে বাধ্য করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘প্রাপ্তবয়স্করা উপবাসে রাজি হলেও শিশুদের কী অপরাধ ছিল?’ তার মতে, কোনো রায়ই পরিবারের এই ক্ষতি পূরণ করতে পারবে না।

অন্যদিকে, নাইরোবির বাসিন্দা রজার্স শিবুতসে জানান, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে উদ্ধার করা মরদেহের মধ্যে তিনি তার মায়ের দেহাবশেষ শনাক্ত করেছিলেন। শুক্রবারের রায়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই রায় আমার মায়ের জীবনের ক্ষতিপূরণ হতে পারে না। তবে আমাদের আর কোনো উপায় নেই। অন্তত ম্যাকেঞ্জি ২০০ বছরের সাজা শেষ করতে পারবেন না, একসময় তার মৃত্যু হবে।’

বিষয়:অনাহারে ১৯১ জনকে হত্যা কেনিয়ার প্রলয়বাদী ধর্মগুরু কেনিয়ার মোম্বাসা হাইকোর্ট পল ম্যাকেঞ্জি
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…