জ্বালানির দাম কমাতে রাশিয়া থেকে ডিজেল কিনছে যুক্তরাষ্ট্র

ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমাতে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির চুক্তি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ চুক্তির আওতায় রুশ ডিজেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ওয়াশিংটন। তবে এ উদ্যোগের সমালোচনা করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে উপহার দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
শনিবার ১০ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প জানান, পুতিনের সঙ্গে তার সফল আলোচনা হয়েছে। এতে অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহে সম্মত হয়েছে রাশিয়া। এ পরিমাণ জ্বালানি প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলের সমান। নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং এরপর আরও ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে বলে জানান তিনি। রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোর অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী সময়ে আরও জ্বালানি সরবরাহ করা হতে পারে।
চুক্তির অংশ হিসেবে আগামী ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির অনুমতি দিয়ে লাইসেন্স জারি করেছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়। এর আগে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২৫ সালের অক্টোবরে রাশিয়ার তেল কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। নতুন চুক্তির ফলে রাশিয়া বিপুল অর্থ আয় করতে পারে, যা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে মস্কোকে সহায়তা করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। যুক্তরাষ্ট্রে ইউক্রেনের একটি প্রতিনিধিদল যখন যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত, তখন এ চুক্তিকে শক্তিশালী মিত্রদের দুর্বল সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জেলেনস্কি লেখেন, পুতিনকে উপহার দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। রাশিয়া এ ডিজেলের বিনিময়ে আরও সন্ত্রাস ও বিশ্বাসঘাতকতা ফিরিয়ে দেবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কয়েকজন আইনপ্রণেতাও এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। কংগ্রেস সদস্য ডন বেকন বলেন, পুতিনের যুদ্ধযন্ত্রকে চাপে ফেলতে নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার সময় এখন। ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা অব্যাহত রাখা একজন স্বৈরশাসকের হাতে আরও অর্থ তুলে দেওয়া উচিত নয়।
এদিকে, বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির এ চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম দীর্ঘমেয়াদে কমার সম্ভাবনা কম। তেলবাজার বিশ্লেষক ররি জনস্টন বলেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলো হামলার শিকার না হলে দেশটি সাধারণত এর চেয়ে অনেক বেশি ডিজেল রপ্তানি করে। ফলে ঘোষিত সরবরাহের প্রভাব সীমিত হতে পারে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষক জিম মিচেল বলেন, এ চুক্তি জ্বালানির দাম কমানোর কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বরং সংকটের মধ্যে ডিজেল সরবরাহের একটি অতিরিক্ত উৎস তৈরি হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম ছিল ৬ ডলার ২৮ সেন্ট। এ পরিস্থিতিতে কৃষক, পশুপালক ও পরিবহন খাতের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চাপের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প।
চুক্তির খবর প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের ভবিষ্যৎ মূল্য প্রায় ৫ শতাংশ কমে প্রতি গ্যালন ৪ ডলার ৬৪ সেন্টে নেমে আসে। তবে এ দরপতন দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
জ্বালানির সরবরাহ বাড়াতে এর আগে মিত্রদেশগুলোকে জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়তে চাপ দিয়েছেন ট্রাম্প। পাশাপাশি কৃষি সরঞ্জামে ব্যবহৃত করমুক্ত রঙিন ডিজেলের ব্যবহার সম্প্রসারণ করেছেন তিনি।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট তিনটি শিল্পসূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কয়েকটি সরকারি দপ্তরকে ডিজেলের দাম নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজতে নির্দেশ দিতে পারেন ট্রাম্প।
এ উদ্যোগে জ্বালানি উৎপাদনে বাধা সৃষ্টিকারী স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের বিধিনিষেধ এড়ানোর উপায় খোঁজার পাশাপাশি শীতল যুদ্ধের সময় প্রণীত ‘ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট’ ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। এ আইনের আওতায় গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে সরকার-সমর্থিত ঋণ ও ঋণের নিশ্চয়তা দেওয়া এবং জরুরি পণ্যের সরকারি চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে প্রেসিডেন্টের।
ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও ভাবছে হোয়াইট হাউস। তবে নতুন শোধনাগার নির্মাণের তুলনায় বিদ্যমান শোধনাগারগুলোর দক্ষতা বাড়ানো বা সেগুলোর সম্প্রসারণে সরকারি অর্থ ব্যয় করা বেশি কার্যকর হবে বলে মত দিয়েছেন জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা।






