বাংলাদেশে আদিবাসী অধিকার পুনরুদ্ধার: জলবায়ু অভিযোজনে উপনিবেশবাদ-মুক্ত পথ

রঞ্জন কুমার দত্ত, চপলা জেবুন্নেসা ও খোকন সুইটেন মুর্মু’র লেখা বই।
রঞ্জন কুমার দত্ত, চপলা জেবুন্নেসা ও খোকন সুইটেন মুর্মু’র লেখা বইটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা বা অভিযোজনের (Climate Adaptation) প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবায়। এটি মূলত আদিবাসীদের নিজস্ব জ্ঞান ব্যবস্থা, ভূমির সাথে তাদের গভীর সম্পর্ক এবং উপনিবেশবাদ-মুক্ত (Decolonial) পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে।
জলবায়ু সংকটকে কেবল প্রযুক্তিগত বা নীতি-নির্ধারণী কোনো সমস্যা হিসেবে না দেখে, বইটি একে একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরেছে—যা ভূমি দখল, কাঠামোগত অসমতা এবং আদিবাসীদের জ্ঞানকে অবমূল্যায়ন করার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের গারো, মারমা, রাখাইন, খিয়াং, মুন্ডা এবং সাঁওতাল আদিবাসী সম্প্রদায়ের সাথে দীর্ঘমেয়াদী ও সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে বইটি লেখা হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আদিবাসীদের ভূমি, খাদ্য ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে জ্ঞান স্থানান্তরের প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
তবে বইটিতে আদিবাসীদের কেবল ‘অসহায় শিকার’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি; বরং তাদের জলবায়ু অভিযোজনের মূল চালিকাশক্তি এবং জ্ঞানের ধারক-বাহক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। গল্পবলা (Storytelling), ভূমিনির্ভর অনুসন্ধান এবং আন্তঃপ্রজন্মীয় যোগাযোগের (প্রবীণদের থেকে তরুণদের মাঝে জ্ঞান ছড়ানো) মাধ্যমে বইটি দেখিয়েছে কীভাবে এই সম্প্রদায়গুলো পরিবেশ ও সুস্থতার পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব উপায়ে জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করছে।
রাজনৈতিক পরিবেশবিজ্ঞান (Political Ecology), ডিকলোনিয়াল থিওরি এবং আদিবাসীদের ভূমিনির্ভর জ্ঞানতত্ত্বের মেলবন্ধনে লেখা এই বইটি প্রচলিত পশ্চিমা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করে। বইটির মূল যুক্তি হলো—জলবায়ু অভিযোজনকে যদি সত্যিই অর্থপূর্ণ করতে হয়, তবে অবশ্যই আদিবাসীদের অধিকার পুনরুদ্ধার করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে:
০১. ভূমির অধিকার (Land Rights)
০২. জ্ঞানের সার্বভৌমত্ব (Knowledge Sovereignty – তাদের জ্ঞানকে স্বীকৃতি দেওয়া)
০৩. সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা (Cultural Continuity)
০৪. আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-determination)
বাস্তবমুখী গবেষণা এবং তাত্ত্বিক নতুনত্বের সমন্বয়ে তৈরি এই বইটি জলবায়ু ন্যায়বিচার (Climate Justice), আদিবাসী সার্বভৌমত্ব এবং গবেষণা পদ্ধতিকে উপনিবেশবাদ-মুক্ত করার সমসাময়িক বিতর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।






