মঙ্গলের দুই উপগ্রহ থেকে নমুনা আনতে জাপানের মহাকাশ অভিযান

ছবি: সংগৃহীত
মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে জাপানের মহাকাশযান। এর লক্ষ্য ফোবোসের পৃষ্ঠ থেকে কিছু ধূলিকণা ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা। মিশনটি সফল হলে মঙ্গল বা এর কোনো উপগ্রহ থেকে প্রথমবারের মতো নমুনা পৃথিবীতে এনে গবেষণাগারে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
মহাকাশযানটি ২০২৭ সালের আগস্টে ফোবোসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জেএএক্সএর নেতৃত্বে পরিচালিত এই মিশনের নাম মার্স মুনস এক্সপ্লোরেশন (এমএমএক্স)। মিশনটির মাধ্যমে মঙ্গলের উপগ্রহগুলো কীভাবে তৈরি হয়েছে, সেই রহস্যের সমাধান হবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।
যুক্তরাজ্যের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের অধ্যাপক সারা রাসেল এমএমএক্স মিশনের নমুনা বিশ্লেষণ দলের উপপ্রধান। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ফোবোসে গিয়ে সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার কোনো মিশন সফল হয়নি।
জাকসার তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভোর ৪টা ৪১ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় সোমবার রাত ১টা ৪১ মিনিট) জাপানের তানেগাশিমা মহাকাশকেন্দ্র থেকে এইচ-৩ রকেটে করে এমএমএক্স মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।
সৌরজগতের অভ্যন্তরীণ অংশে পৃথিবীর চাঁদ এবং মঙ্গলের দুটি উপগ্রহ ফোবোস ও ডেইমোস রয়েছে। দুটি উপগ্রহই আকারে ছোট। ফোবোসের ব্যাস প্রায় ২০ কিলোমিটার বা ১২ মাইল এবং ডেইমোসের ব্যাস প্রায় ১০ কিলোমিটার বা ৬ মাইল। অনিয়মিত আকৃতির কারণে এগুলোকে অনেকটা মহাকাশের আলুর মতো দেখায়।
মঙ্গলের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর এমএমএক্স মহাকাশযানটি প্রথমে ডেইমোস পর্যবেক্ষণ করবে। এরপর এর মূল লক্ষ্য হবে ফোবোস। সেখানে ভূপ্রকৃতি অনুসন্ধানের জন্য একটি ছোট রোভার নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কাজটি সহজ হবে না।
অধ্যাপক সারা রাসেল জানান, এত ছোট কোনো উপগ্রহে এর আগে কখনো রোভার অবতরণ করেনি। ফোবোসের নিজস্ব মহাকর্ষ বল খুবই দুর্বল। অন্যদিকে, এর কাছেই রয়েছে বিশাল মঙ্গল গ্রহ, যার মহাকর্ষ বল অনেক বেশি। এ কারণে ফোবোসের পৃষ্ঠে রোভার অবতরণ করানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
রোভারটি ফোবোসের পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করে মহাকাশযানটির অবতরণের উপযুক্ত স্থান খুঁজে বের করবে। এরপর এমএমএক্স মহাকাশযানটি ফোবোসের মাটিতে অবতরণ করবে। সেখানে রোবোটিক বাহু ও দুটি নমুনা সংগ্রাহক ব্যবহার করে চাঁদের ধূলিকণা ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করা হবে। সংগৃহীত নমুনা একটি ছোট ক্যাপসুলে ভরে পৃথিবীতে পাঠানো হবে। ২০৩১ সালে ক্যাপসুলটি অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের উমেরা মরুভূমিতে অবতরণ করার কথা রয়েছে। পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে মাত্র ১০ গ্রাম নমুনা।
যুক্তরাজ্যের লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. ক্রিসা আভদেলিউদু এই মিশনে কাজ করছেন। তিনি বলেন, নমুনার পরিমাণ খুবই কম হলেও এর প্রতিটি দানা নিয়ে একাধিক গবেষণা করা সম্ভব। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার জন্য কোনো গ্রহ বা উপগ্রহ থেকে কয়েক কেজি নমুনা আনার প্রয়োজন নেই। তাই প্রতিটি গ্রামেরই যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ফোবোস থেকে পাওয়া নমুনা মঙ্গলের উপগ্রহ দুটির উৎপত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের রহস্যের সমাধান করতে সাহায্য করবে। এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দুটি প্রধান ধারণা রয়েছে।
প্রথম ধারণা অনুযায়ী, সৌরজগতের শুরুর দিকে একটি মহাজাগতিক পাথর মঙ্গলে আঘাত হানে। ওই সংঘর্ষে ছিটকে বেরিয়ে আসা ধ্বংসাবশেষ থেকেই ফোবোস ও ডেইমোস তৈরি হয়।
দ্বিতীয় ধারণা অনুযায়ী, উপগ্রহ দুটি আসলে সৌরজগতের বাইরের অংশ থেকে আসা দুটি গ্রহাণু। মঙ্গলের মহাকর্ষ বল সেগুলোকে নিজের কক্ষপথে আটকে ফেলে।
সারা রাসেল বলেন, নমুনা পৃথিবীতে পৌঁছালে বিজ্ঞানীরা এর রাসায়নিক উপাদান ও খনিজ গঠন বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করতে পারবেন। দুটি ধারণা অনুযায়ী নমুনার বৈশিষ্ট্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকার কথা। ফলে নমুনা বিশ্লেষণ করেই উপগ্রহ দুটির উৎপত্তি সম্পর্কে দ্রুত ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, চীন ২০২৮ সালে মঙ্গল থেকে নমুনা সংগ্রহের একটি মিশন উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে। ২০৩১ সালের মধ্যে সেই নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে দেশটির।
পৃথিবীতে মঙ্গলের কিছু নমুনা আগে থেকেই রয়েছে। সেগুলো এসেছে মঙ্গল থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসা উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে। মঙ্গলের পৃষ্ঠে গ্রহাণুর আঘাতে পাথরের টুকরো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছু অংশ পৃথিবীতে এসে পড়ে।
তবে পৃথিবীতে পৌঁছানোর পর এসব উল্কাপিণ্ড বায়ু, ধুলা, মাটি ও পানির সংস্পর্শে এসে দূষিত হয়ে যায়। এ কারণে বিজ্ঞানীরা মঙ্গল ও এর উপগ্রহ থেকে সরাসরি সংগ্রহ করা নমুনার অপেক্ষায় রয়েছেন। এমন নমুনা দূষণমুক্ত অবস্থায় পাওয়া গেলে গ্রহগুলোর গঠন ও ইতিহাস সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য জানা সম্ভব হবে।





