আন্তর্জাতিক

যন্তর-মন্তর: কতটা ঠেকাতে হলো সেটাই গুরুত্বপূর্ণ

যন্তর-মন্তর: কতটা ঠেকাতে হলো সেটাই গুরুত্বপূর্ণ

ভারতের রাজনীতি বহুদিন ধরেই দল, নেতা, নির্বাচন এবং পরিচয়ের রাজনীতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেই কাঠামোর বাইরে আরেকটি শক্তি ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে: তরুণ নাগরিকদের এমন এক অংশ, যারা কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের পতাকার নিচে নামছে না, কিন্তু শিক্ষা, চাকরি, পরীক্ষা, নাগরিক অধিকার, নির্বাচন কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির প্রশ্নে রাস্তায় নামতে দ্বিধা করছে না। সর্বশেষ দিল্লির যন্তর-মন্তরকে ঘিরে যে অভূতপূর্ব নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হলো, সেটি তাই শুধু একটি বিক্ষোভ ঠেকানোর ঘটনা নয়; ভারতীয় রাজনীতিতে তরুণদের নতুন ধরনের উপস্থিতি রাষ্ট্র কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে, তারও একটি ইঙ্গিত।

দিল্লিতে এবারের কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল তরুণনির্ভর ‘ককরোচ’ আন্দোলন থেকে উঠে আসা ককরোচ জনতা পার্টি। তাদের দাবি ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার জবাবদিহি। বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনার নামে সারা দেশে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে এবং এতে দরিদ্র, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক মানুষের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য: ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও অযোগ্য নাম বাদ দেওয়ার নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই কাজ হয়েছে এবং ভুলভাবে বাদ পড়া ব্যক্তিদের নাম পুনর্ভুক্তির সুযোগ রয়েছে। ফলে বিতর্কের একটি দিক যেমন গুরুতর ভোটাধিকার প্রশ্ন, অন্য দিকটি নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা।

কিন্তু রাজনৈতিকভাবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে সরকারের প্রতিক্রিয়া। মধ্য দিল্লির বড় অংশে ব্যারিকেড বসানো হয়, বহু মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়, মোবাইল ইন্টারনেট স্থগিত করা হয় এবং বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক সদস্য মোতায়েন করা হয়। রয়টার্সের হিসাবে কেন্দ্রীয় দিল্লি কার্যত সিল করে দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ২০ থেকে ৩০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের কথা এসেছে। আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর আটক হন, অন্য সংগঠকদেরও পথে আটক করা হয়।

সরকারের অবশ্য নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। দিল্লি পুলিশ বলেছে, যন্তর-মন্তরের কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়নি; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন না করা, আগের কর্মসূচিতে শর্ত ভঙ্গ এবং আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার ঝুঁকির কথা তারা উল্লেখ করেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতির আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল। অর্থাৎ ঘটনাটিকে শুধু ‘সরকার বনাম শান্তিপূর্ণ তরুণ’ হিসেবে সরলীকরণ করলে বাস্তবতার একটি দিক বাদ পড়ে যায়।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়: অনুমোদনহীন একটি সমাবেশ ঠেকাতে পুরো রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে যে মাত্রার নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলো, তা কি ঝুঁকির আনুপাতিক ছিল? এই প্রশ্নটিই বর্তমান ভারতের তরুণ রাজনীতির কেন্দ্রে।

ককরোচ আন্দোলনের শুরু ছিল আরও ভিন্ন জায়গায়। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগ ও উচ্চশিক্ষায় অনিশ্চয়তা এবং তরুণদের হতাশা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল, তা কয়েক মাসের মধ্যে রাস্তায় নেমে আসে। চিকিৎসাশিক্ষায় ভর্তির পরীক্ষা নিয়ে কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে সেই আন্দোলন বিস্তৃত হয়। জুলাইয়ে যন্তর-মন্তরে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অবস্থান, সংসদের দিকে মিছিল এবং দেশজুড়ে বিক্ষোভের পর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। আন্দোলনকারীদের জন্য এটি শুধু একটি মন্ত্রীর পদত্যাগ ছিল না; দলীয় সংগঠন ছাড়াও রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করা যায়; এমন এক রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল।

এরপরই আন্দোলনের বিষয়বস্তু বদলে যায়। শিক্ষা ও পরীক্ষা থেকে তারা পৌঁছে যায় ভোটার তালিকা ও নির্বাচন কমিশনের মতো সরাসরি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রশ্নে। এখানেই ককরোচ আন্দোলনের তাৎপর্য। এটি এখনো ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিকল্প হয়ে ওঠেনি, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক শক্তি হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করেনি। কিন্তু একটি প্রজন্মের ক্ষোভকে বিষয়ভিত্তিকভাবে সংগঠিত করার ক্ষমতা দেখিয়েছে। ভারতে ছাত্র ও তরুণদের এভাবে রাজনীতির গতিপথ বদলে দেওয়ার ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়।

১৯৭৪ সালে গুজরাটের নব নির্মাণ আন্দোলন শুরু হয়েছিল মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্রবিক্ষোভ হিসেবে। সেটিই বিহারের ছাত্র আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করে। জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে যে ‘সম্পূর্ণ ক্রান্তি’ আন্দোলন পরে ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের বিরুদ্ধে সর্বভারতীয় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়, তার মূল শক্তির একটি বড় অংশ ছিল তরুণ ও ছাত্রসমাজ। ১৯৭৫ সালে দিল্লির রামলীলা ময়দানের বিশাল সমাবেশের পরপরই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। দুই বছর পর সেই আন্দোলনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কংগ্রেসকে প্রথমবারের মতো কেন্দ্রের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়।

তবে সেই সময়ের তরুণ রাজনীতি আর আজকের তরুণ রাজনীতির মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। সত্তরের দশকের আন্দোলন দ্রুত সংগঠিত রাজনৈতিক বিরোধিতার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। আজকের অনেক আন্দোলন বরং উল্টো পথে হাঁটে; প্রথমে সামাজিক ইস্যু, তারপর ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, এরপর রাস্তা; রাজনৈতিক দল অনেক সময় পরে এসে সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে।

২০১১ সালের আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ছিল এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পূর্বাভাস। যন্তর-মন্তর এবং পরে রামলীলা ময়দানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলনে বিপুলসংখ্যক শহুরে তরুণ প্রথমবার সংগঠিত দলীয় পরিচয়ের বাইরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তখন ভারতের গণআন্দোলনে নতুন শক্তি হয়ে উঠছিল। সেই আন্দোলন থেকেই পরে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির জন্ম হয় এবং দিল্লির ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যায়। অর্থাৎ ‘অরাজনৈতিক’ বা ‘দলনিরপেক্ষ’ আন্দোলনও শেষ পর্যন্ত নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারে; ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে তার স্পষ্ট নজির রয়েছে।

এর মাত্র এক বছর পর ২০১২ সালের নির্ভয়া ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে দিল্লির তরুণরা আবার রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করে। সেখানে কোনো একক রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। ক্ষোভের কেন্দ্র ছিল নারীর নিরাপত্তা, বিচার এবং রাষ্ট্রের উদাসীনতা। আন্দোলনের অভিঘাতে আইন পরিবর্তন হয়। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, বেকারত্ব, সামরিক বাহিনীতে অগ্নিপথ নিয়োগব্যবস্থা কিংবা বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস; প্রতিটি ক্ষেত্রেই তরুণদের প্রতিবাদ ভারতীয় রাজনীতিকে রাস্তায় ফিরিয়ে এনেছে। ভারতের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসও দেখায়, নব নির্মাণ থেকে নাগরিকত্ববিরোধী বিক্ষোভ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় তরুণদের আন্দোলন বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের গতিপথ বদলেছে।

এখনকার পরিবর্তনটি আরও গভীর। ভারতের তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশের কাছে রাজনীতির প্রথম প্রশ্ন সবসময় আর ‘কোন দল’ নয়; বরং ‘কোন সমস্যা’। চাকরি কোথায়, পরীক্ষার প্রশ্ন কেন ফাঁস হলো, শিক্ষা এত ব্যয়বহুল কেন, ভোটার তালিকায় নাম থাকবে তো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান স্বাধীন কি না; এই প্রশ্নগুলো তাদের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করছে। ধর্ম, জাতপাত কিংবা জাতীয়তাবাদের মতো পুরোনো শক্তিশালী পরিচয়গুলো হারিয়ে যায়নি; কিন্তু জীবনযাত্রার বাস্তব সংকট তার পাশে নতুন এক রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করছে।

ককরোচ আন্দোলনের নামটিই এই পরিবর্তনের প্রতীক। অভিজিৎ দীপকের একটি ব্যঙ্গাত্মক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট থেকে এর সূত্রপাত। পরে সেটিই এমন একটি পরিচয়ে পরিণত হয় যার মধ্যে বিদ্রূপ, ক্ষোভ এবং প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার ভাষাকে উল্টে দেওয়ার চেষ্টা আছে। দীপকে এখন ভারতের তরুণ আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ। রয়টার্সের ভাষ্যে, বেকারত্ব ও পরীক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভকে সংগঠিত করে তার আন্দোলন জাতীয় পর্যায়ে জায়গা করে নিয়েছে।

এখানে মূলধারার বিরোধী দলগুলোর জন্যও একটি অস্বস্তিকর শিক্ষা আছে। তরুণদের এই ক্ষোভ বিজেপিবিরোধী হতে পারে, কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কংগ্রেস বা অন্য কোনো বিরোধী দলের সমর্থনে পরিণত হচ্ছে না। এবারের ভোটার তালিকাবিরোধী আন্দোলনে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো যুক্ত হয়েছে, কিন্তু আন্দোলনের একটি বড় অংশের রাজনৈতিক আবেদন এসেছে মূলধারার দলের বাইরে থেকে। নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহির প্রশ্নকে শুধু বিজেপি বনাম কংগ্রেস দ্বন্দ্বে নামিয়ে না আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয়তে উঠে এসেছে।

এই জায়গায় নরেন্দ্র মোদির বিজেপির সামনে চ্যালেঞ্জও ভিন্ন ধরনের। বিজেপি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তরুণ ভোটারদের কাছে জাতীয়তাবাদ, ডিজিটাল ভারত, উন্নয়ন, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং শক্তিশালী নেতৃত্বের বার্তা সফলভাবে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু একটি প্রজন্ম যখন শিক্ষা শেষে চাকরি, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা কিংবা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে হতাশ হয়, তখন শুধু বৃহৎ জাতীয় বয়ান দিয়ে তাদের ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। জুলাইয়ের আন্দোলনে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগ সেই চাপের বাস্তবতা দেখিয়েছে।

তবে এখানেই তরুণ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও আছে। ক্ষোভ দিয়ে মানুষকে রাস্তায় আনা সম্ভব; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করতে সংগঠন, নেতৃত্ব, নীতি, অর্থায়ন, আঞ্চলিক ভিত্তি এবং নির্বাচনী কাঠামো প্রয়োজন। ২০১১ সালের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের শক্তিশালী ঐক্যও রাজনৈতিক দল গঠনের প্রশ্নে ভেঙে গিয়েছিল। আম আদমি পার্টি একদিকে সফল দল হয়েছে, অন্যদিকে মূল আন্দোলনের বহু অংশীদার ভিন্ন পথে চলে গেছেন। আজকের তরুণ আন্দোলনগুলোকেও একই পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের কঠোর প্রতিক্রিয়া এই আন্দোলনকে দুর্বল করবে, নাকি আরও জনপ্রিয় করবে। ইতিহাসে দুটো উদাহরণই আছে। কখনো দীর্ঘ দমন আন্দোলনকে ক্লান্ত করে দিয়েছে, আবার কখনো অতিরিক্ত দমন আন্দোলনের বক্তব্যকেই সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার স্মৃতি ভারতীয় রাজনীতিতে এখনও এত শক্তিশালী যে দিল্লির বর্তমান বিধিনিষেধের সঙ্গে বিরোধীরা সেই সময়ের তুলনা করছে। তুলনাটি ঐতিহাসিকভাবে পুরোপুরি সমান নয়। ভারতে এখন জরুরি অবস্থা নেই, নির্বাচন চলছে, আদালত ও সংবাদমাধ্যম সক্রিয়। কিন্তু একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের আগেই গণপরিবহন, ইন্টারনেট এবং চলাচলে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ হলে ‘রাষ্ট্র কি নাগরিককে ভয় পাচ্ছে’; এই রাজনৈতিক প্রশ্নটি তৈরি হওয়া অনিবার্য।

যন্তর-মন্তর তাই আবারও প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন ভারতের নানা আন্দোলনে দিল্লির এই ছোট এলাকা ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থেকে প্রতিবাদের জায়গা হিসেবে টিকে আছে। আন্না হাজারে এখান থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। কৃষক, শিক্ষার্থী, নারী অধিকারকর্মী, চাকরিপ্রার্থী; সবাই কোনো না কোনো সময় এখানে এসেছে। এবার সরকার যখন আন্দোলনকারীদের যন্তর-মন্তরে পৌঁছানোর আগেই দিল্লির পথ আটকাল, তখন অজান্তেই জায়গাটির প্রতীকী শক্তি আরও বাড়ল।

সবচেয়ে বড় বিষয় সম্ভবত এটিই: ভারতের তরুণরা এখন শুধু ভোটার নয়, তারা রাজনৈতিক এজেন্ডা নির্ধারণের দাবি করছে। তাদের হাতে প্রচলিত দলের বিশাল সংগঠন নেই, কিন্তু স্মার্টফোন আছে; দলীয় কার্যালয় নেই, কিন্তু ডিজিটাল নেটওয়ার্ক আছে; প্রথাগত নেতা নেই, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে তৈরি হওয়া মুখ আছে। একই সঙ্গে এই শক্তির অস্থিরতাও এখানেই: যে নেটওয়ার্ক দ্রুত আন্দোলন তৈরি করতে পারে, সেটি দ্রুত ভেঙেও যেতে পারে।

তাই এখনই বলা যাবে না যে ভারতের মূলধারার দলগুলোর জায়গা তরুণ আন্দোলন নিয়ে নিচ্ছে। বিজেপি, কংগ্রেস এবং শক্তিশালী আঞ্চলিক দলগুলোর নির্বাচনী যন্ত্রের সঙ্গে এসব আন্দোলনের তুলনা করার সময়ও আসেনি।

কিন্তু অন্য একটি পরিবর্তন ইতোমধ্যেই ঘটেছে। একসময় মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো ঠিক করত কোন ইস্যু জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হবে। এখন কখনো কখনো রাস্তার তরুণরাই সেই ইস্যু নির্ধারণ করছে, আর রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পেছনে হাঁটছে।

জুলাইয়ে একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগ পর্যন্ত গিয়েছিল। অক্টোবরে সেই একই তরুণ শক্তি দেশের প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তার জবাবদিহি দাবি করছে, আর তাদের রাজধানীতে ঢোকা ঠেকাতে সরকারকে হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী নামাতে হয়েছে। ক্ষমতার পরিমাপ শুধু কত মানুষ যন্তর-মন্তরে পৌঁছাল, সেটি দিয়ে হয় না। কখনো কখনো ক্ষমতার পরিমাপ হয় তাদের পৌঁছাতে না দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রকে কতটা ব্যবস্থা নিতে হলো; সেটি দিয়েও।

সেই মাপকাঠিতে ভারতের তরুণরা এখন আর রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রান্তে নেই। তারা এখনও বিকল্প সরকার নয়, হয়তো বিকল্প দলও নয়। কিন্তু তারা ক্রমেই হয়ে উঠছে এমন এক বিকল্প রাজনৈতিক চাপ, যাকে ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী; দুই পক্ষেরই আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

বিষয়:ককরোচ ভারত যন্তর মন্তর

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…