বিনোদন

রাজনীতিতে আসছেন ধনুশ? অভিনেতাকে ঘিরে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে জল্পনা!

রাজনীতিতে আসছেন ধনুশ? অভিনেতাকে ঘিরে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে জল্পনা!

তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে অভিনেতা বিজয়ের সাফল্যের পর নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে আরেক জনপ্রিয় অভিনেতা ধনুশের নাম। রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার জল্পনা ঘিরে তাকে নিয়ে সরব হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।

এআইএডিএমকে তাকে দলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) তাকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গুরুত্ব দিতে নারাজ। কংগ্রেসের অভিযোগ, ধনুশকে সামনে রেখে বিজেপি ও আরএসএস নতুন রাজনৈতিক পরিকল্পনা করছে।

তবে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাননি ধনুশ। নিজের রাজনৈতিক দল গঠন কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার বিষয়েও কোনো ঘোষণা দেননি তিনি।

বিজয়ের সাফল্যের পর বাড়ছে জল্পনা

২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেন অভিনেতা বিজয়। ২০২৬ সালের মার্চে তিনি ঘোষণা করেন, তামিলনাড়ুর ২৩৪টি বিধানসভা আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে তার দল। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে টিভিকে ১০৮টি আসনে জয়ী হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও জোট সরকার গঠন করে দলটি। ২০২৬ সালের মে মাসে মুখ্যমন্ত্রী হন বিজয়।

প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই একজন চলচ্চিত্র তারকার এই সাফল্য তামিল চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার আলোচনা তৈরি করেছে। এখন বড় তারকাদের প্রায়ই প্রশ্ন করা হচ্ছে, বিজয় পারলে তারা কেন পারবেন না? ধনুশও সেই প্রশ্নের মুখে পড়েছেন।

ভক্তদের পতাকা ও বাবার মন্তব্য

ধনুশকে ঘিরে রাজনৈতিক জল্পনা বাড়তে শুরু করে জুলাইয়ে। সে সময় তার ভক্ত সংগঠন একটি পতাকা উন্মোচন করে। তামিল রাজনীতিতে পতাকার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। অতীতে চলচ্চিত্র তারকাদের রাজনীতিতে প্রবেশের ক্ষেত্রেও ভক্ত সংগঠনের পতাকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে ধনুশের ভক্ত সংগঠনের পতাকা উন্মোচনকে তার নিজস্ব রাজনৈতিক পতাকা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিনেতার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।

জুনের শুরুতে চেন্নাইয়ের একটি ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে ধনুশের বাবা কস্তুরী রাজাকে রাজনীতিতে ছেলের প্রবেশ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। তিনি বলেন, যে কেউ রাজনীতিতে যোগ দিতে পারেন। তার ছেলেরা, এমনকি নাতিরাও রাজনীতিতে আসতে পারেন। এটি সরাসরি সম্মতি না হলেও তিনি সম্ভাবনাটি নাকচ করেননি।

জনকল্যাণমূলক কাজের আহ্বান

২০২৬ সালের ২৬ জুলাই চেন্নাইয়ে একটি ভক্ত সমাবেশে বক্তব্য দেন ধনুশ। সেই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বক্তব্যে তিনি এক জায়গায় বহু মানুষের সমবেত হওয়ার শক্তির কথা বলেন। তার মতে, এই ঐক্যকে একটি উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। শুধু ছবির অডিও প্রকাশের অনুষ্ঠান কিংবা ভক্তদের মিলনমেলায় সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বেশি জনকল্যাণমূলক কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

বক্তব্যে অভিনেতা অজিত কুমারের কথাও উল্লেখ করেন ধনুশ। এ সময় উপস্থিত ভক্তরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। ধনুশের বক্তব্যের সঙ্গে বিজয়ের ‘লিও’ ছবির অডিও প্রকাশ অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণের তুলনা করেন অনেকে। এক ভক্তের মতে, রাজনীতিতে প্রবেশের আগে বিজয়ের বক্তব্যের সঙ্গে ধনুশের ভাষণের মিল রয়েছে। আরেক ভক্ত ২০৩১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে রসিকতা করেন।

তবে জনকল্যাণমূলক কাজের আহ্বান জানানো মানেই রাজনীতিতে প্রবেশের ঘোষণা নয়। অনেক তারকাই সামাজিক কাজের কথা বলেন। কিন্তু বক্তব্যের সময় এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ধনুশকে ঘিরে সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।

ভক্ত সংগঠনের নাম বদল

অক্টোবরে ধনুশের ভক্ত সংগঠনের নাম পরিবর্তন করা হয়। আগে সংগঠনটির নাম ছিল ‘ধনুশ নর্পানি মন্দ্রম’। নতুন নাম রাখা হয়েছে ‘ধনুশ নর্পানি ইয়াক্কাম’, যার অর্থ ধনুশ জনকল্যাণ আন্দোলন।

২৬ অক্টোবর চেন্নাইয়ের উপকণ্ঠে থোরাইপাক্কামের একটি বেসরকারি কলেজে সংগঠনটির নারী শাখার সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রায় তিন হাজার সদস্য উপস্থিত ছিলেন। ধনুশ প্রায় চার ঘণ্টা অনুষ্ঠানে ছিলেন এবং উপস্থিত সদস্যদের সঙ্গে ছবি তোলেন।

অনুষ্ঠানের ৪৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করে তার দল। মঞ্চের পেছনের ব্যানারে ধুতি ও শার্ট পরা ধনুশের ছবি ছিল। অন্য ছবিতে তাকে হাত নাড়তে এবং হাতজোড় করতে দেখা যায়, যা অনেকের কাছে রাজনৈতিক নেতার ভঙ্গির মতো মনে হয়েছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সদস্যদের রুপার কামাক্ষী প্রদীপ উপহার দেন ধনুশ। প্রদীপগুলোতে পদ্মফুলের নকশা খোদাই করা ছিল। পদ্মফুল বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক হওয়ায় বিষয়টি সামনে আসতেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ধনুশকে নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন।

রাজনীতি নিয়ে কী বললেন ধনুশ?

অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকেরা ধনুশকে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করেন। তবে সরাসরি কোনো উত্তর দেননি তিনি। বরং দীপাবলির শুভেচ্ছা জানিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

এতে রাজনীতিতে প্রবেশের জল্পনা যেমন থামেনি, তেমনি নিশ্চিতও হয়নি। ধনুশের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় রয়েছে।

ধনুশকে নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া

টিভিকে: ক্ষমতাসীন দলটি ধনুশের রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। দলের সাধারণ সম্পাদক আধব অর্জুনের দাবি, দিল্লির শীর্ষ নেতারা নতুন রাজনৈতিক মুখদের সামনে নিয়ে আসছেন। অর্থমন্ত্রী এন মারি উইলসন বলেন, ধনুশ কখনোই মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবেন না। তার মতে, বিজয়ের আন্দোলন কয়েক দশকের রাজনৈতিক প্রস্তুতির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। অন্য কোনো চলচ্চিত্র তারকার ওপর নির্ভর করলে হতাশ হতে হবে।

কংগ্রেস: তামিলনাড়ু কংগ্রেসের প্রধান বি মানিক্কম ঠাকুরের দাবি, বিজেপি ও আরএসএস ‘অপারেশন ডি’ অথবা ‘প্ল্যান সি’ নামে একটি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। তার বক্তব্য, রজনীকান্তের মতো তারকাদের মাধ্যমে বিজেপি রাজনৈতিক ভিত্তি গড়তে পারেনি। এবার নতুন কোনো অভিনেতাকে সামনে আনার চেষ্টা করছে তারা। তবে এটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের অভিযোগ। ধনুশের সঙ্গে আরএসএসের শীর্ষ নেতাদের প্রকাশ্যে সাক্ষাতের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন তিনি।

ডিএমকে: দলের প্রবীণ নেতা এস রেগুপাথি তুলনামূলক শান্ত অবস্থান নিয়েছেন। তার মতে, গণতন্ত্রে যে কেউ রাজনীতিতে যোগ দিতে পারেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘বিজয় যদি রাজনীতিতে আসতে পারেন, তবে ধনুশ কেন পারবেন না?’ তার আরও দাবি, ধনুশকে নিয়ে টিভিকের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া থেকেই বোঝা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলটি উদ্বিগ্ন।

এআইএডিএমকে: দলের নেতা কে টি রাজেন্দ্র বালাজি সরাসরি ধনুশকে দলে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এডাপ্পাদি কে পালানিস্বামীর নেতৃত্বাধীন দল তাকে সাদরে গ্রহণ করবে বলে জানান তিনি। তরুণদের মধ্যে ধনুশের জনপ্রিয়তার প্রশংসা করেন রাজেন্দ্র। পাশাপাশি তার ছবিতে দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষের জীবনের কথা তুলে ধরার বিষয়টিও উল্লেখ করেন।

নতুন রাজনৈতিক দলের গুঞ্জন

সামাজিক মাধ্যমে ধনুশের রাজনৈতিক দল গঠন নিয়ে আরও একটি দাবি ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকটি পোস্টে বলা হয়, তিনি নির্বাচন কমিশনে ‘তামিলনাড়ু উচি কাজাগাম’ নামে একটি দল নিবন্ধন করেছেন। তবে এই দাবির কোনো সত্যতা নিশ্চিত হয়নি। ধনুশ কিংবা তার দলের পক্ষ থেকে এমন কোনো ঘোষণা আসেনি। তার জনকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন বা কোনো দলে যোগ দেওয়ার সম্পর্ক রয়েছে, এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি।

কেন রাজনীতিতে আসতে পারেন ধনুশ?

ধনুশের বিপুলসংখ্যক ভক্ত এবং সংগঠিত সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। বিজয়ের সাফল্যও প্রমাণ করেছে, একজন চলচ্চিত্র তারকা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন। ধনুশের অনেক ছবিতে শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের জীবন তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইতিমধ্যেই তাকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

তবে রাজনীতিতে প্রবেশের সম্ভাবনা থাকলেও তার সামনে কিছু বাধাও রয়েছে। রজনীকান্ত ও কমল হাসানের মতো তারকারাও রাজনীতিতে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। তাদের রাজনৈতিক যাত্রার ফলাফল মিশ্র ছিল। রজনীকান্ত দল গঠনের আগেই রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান।

টিভিকের দাবি, রাজনীতিতে প্রবেশের আগে বহু বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছেন বিজয়। ধনুশের তেমন রাজনৈতিক ভিত্তি নেই। অন্যদিকে, অভিনয় নিয়ে এখনও ব্যস্ত ধনুশ। রাজকুমার পেরিয়াসামি পরিচালিত তার ‘ওম’ ছবিতে রয়েছেন মাম্মুট্টি ও সাই পল্লবী। ছবিটি ২০২৬ সালের ২০ নভেম্বর মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে।

পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচন এখনও কয়েক বছর দূরে। তাই এখনই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাড়া নেই। রাজনৈতিক পদক্ষেপ ভুল হলে তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও চলচ্চিত্রের ক্যারিয়ার—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ধনুশ হয়তো রাজনীতিতে প্রবেশের জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে প্রস্তুতি নেওয়া আর আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে যোগ দেওয়া এক বিষয় নয়।

এখন পর্যন্ত ধনুশ নিজে কিছু না বলায় সবকিছুই অনুমাননির্ভর। আপাতত রাজনীতিতে নেই তিনি। তবে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক মহল গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে, শেষ পর্যন্ত তিনি রাজনীতিতে পা রাখেন কি না। দ্য স্টেটসম্যান

বিষয়:এআইএডিএমকে ওম কংগ্রেস টিভিকে থালাপতি বিজয় ধনুশ

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…