রাজনীতি

জিয়ার পথে তারেকের রাজনৈতিক পাঠ

জিয়ার পথে তারেকের রাজনৈতিক পাঠ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের প্রভাব শুধু বর্তমানের ভোটের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কোনো কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব তৈরি হয় আরও দীর্ঘ সময়ে। একটি প্রজন্মের বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে। সেই জায়গা থেকেই জিয়াউর রহমানের শিশু-কিশোরদের কাছে পৌঁছানোর বিভিন্ন উদ্যোগ এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক প্রভাব অনেকেরই জানা। ওই ধারাবাহিকতার সঙ্গে বর্তমান সময়ে তারেক রহমানের শিশু-কিশোর ও তরুণদের কাছে পৌঁছানোর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তুলনা টানা হচ্ছে।

জিয়াউর রহমানের সময় ক্রীড়া, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচনায় বারবার উঠে আসে। সে সময় যারা শিশু-কিশোর, তাদের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন পেশা ও সামাজিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাদের মধ্যকার অনেকে পরবর্তী সময়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন। বিএনপির নেতাদের ভাষ্য, তখনকার সেই সামাজিক যোগাযোগই পরবর্তী সময়ে একটি প্রজন্মের মধ্যে দলটির প্রতি পরিচিতি ও রাজনৈতিক সংযোগ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল।

সময় বদলেছে। বদলে গেছে শিশু-কিশোরদের আগ্রহ, যোগাযোগের মাধ্যম এবং সামাজিক বাস্তবতা। কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির প্রয়োজনীয়তা কমেনি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের কারণে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্র এখন আরও বিস্তৃত।

এই বাস্তবতায় তারেক রহমানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সামাজিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি সামনে আসছে। বিএনপির নেতাকর্মীরা এটিকে কেবল তাৎক্ষণিক কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ তৈরির একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ: শিশু-কিশোরদের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরির চেয়ে তাদের আগ্রহের জায়গাগুলোতে সম্পৃক্ত হওয়া তুলনামূলকভাবে ভিন্ন ধরনের কৌশল। ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কিংবা সামাজিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া পরিচিতি ভবিষ্যতে একজন রাজনৈতিক নেতা বা রাজনৈতিক দলের প্রতি প্রজন্মগত ধারণা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর রাজনৈতিক ফলাফল কতটা হবে, তা নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতির ওপর।

এখানেই জিয়াউর রহমানের সময়ের সঙ্গে বর্তমান সময়ের একটি মিল খুঁজে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনীতিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উপেক্ষা করে শুধু বর্তমানের রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে এগিয়ে গেলে দীর্ঘমেয়াদে সংগঠন শক্তিশালী করা কঠিন। বরং একটি প্রজন্মের সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে তার প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়।

তবে এই তুলনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। জিয়াউর রহমানের সময়ের শিশু-কিশোররা যে সামাজিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছে, বর্তমান প্রজন্ম তার সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার সন্তান। এখনকার কিশোরদের কাছে মাঠের খেলার পাশাপাশি অনলাইন কনটেন্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল সংস্কৃতি এবং বৈশ্বিক বিনোদনজগতও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর রাজনীতিও আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল।

তারেক রহমানের সামনে তাই শুধু শিশু-কিশোরদের কাছে পরিচিত হওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং তাদের পরিবর্তিত প্রত্যাশা ও চিন্তার জগতের সঙ্গে কতটা কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হবে কি না, তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে তাদের কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক অবস্থান এবং সময়ের পরীক্ষায় সেই নেতৃত্ব সম্পর্কে তৈরি হওয়া ধারণার ওপর।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রজন্ম পরিবর্তন এখন একটি বড় বাস্তবতা। যারা একসময় জিয়াউর রহমানের কর্মকাণ্ড দেখেছেন, তাদের একটি অংশ আজ প্রবীণ। তাদের পরবর্তী প্রজন্মের বড় একটি অংশ বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেখেছে। আর বর্তমানের শিশু-কিশোরেরা বড় হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন এক রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতায়। এই প্রজন্ম আগামী এক-দুই দশকে শুধু ভোটারই হবে না, দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সেই অর্থে আজকের শিশু-কিশোরদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা নিছক বর্তমানের কোনো কর্মসূচির বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যতের সামাজিক ভিত্তি তৈরির একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র। জিয়াউর রহমানের সময়ের অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে তারেক রহমান যদি ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও অন্যান্য সামাজিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করে থাকেন, তাহলে সেটিকে বিএনপির রাজনীতিতে একটি প্রজন্মগত ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

তবে রাজনীতিতে কোনো পরিকল্পনার ফলাফল আগে থেকে নির্ধারিত থাকে না। আজ যে শিশু মাঠে খেলছে, যে কিশোর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে, একদিন সে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান নিজেই নির্ধারণ করবে। তার চিন্তা, অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ এবং দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাই সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।

তাই জিয়ার সময়ের শিশু-কিশোরদের কাছে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা এবং তারেক রহমানের বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগের মধ্যে মিল থাকলেও ভবিষ্যতের ফলাফল একই হবে; এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঘিরে প্রতিযোগিতা এখন থেকেই শুরু হয়েছে। আর সেই প্রতিযোগিতায় যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব আজকের শিশু-কিশোরদের কাছে সামাজিকভাবে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারবে, আগামী দিনের রাজনীতিতে তার প্রভাব তৈরির সম্ভাবনাও তত বেশি হতে পারে।

বিষয়:জিয়া তারেক জিয়া তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী রাজনীতি শিশু একাডেমি

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…