হাতে ফল, ঘরে শোক: এইচএসসির আনন্দ-বেদনার গল্প

ছবি: সংগৃহীত
একটি পরীক্ষার ফল। কারও জন্য আনন্দের, কারও জন্য হতাশার, আবার কারও জন্য প্রিয়জন হারানোর বেদনা নতুন করে অনুভব করার দিন।
শনিবার প্রকাশিত এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল ঘিরে সারা দেশে যখন শিক্ষার্থীদের সাফল্য, উচ্ছ্বাস আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা, তখন জানা গেছে কয়েকটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা। কোথাও পরীক্ষার ফল হাতে এসেছে, কিন্তু সেই ফল দেখার জন্য শিক্ষার্থী বেঁচে নেই। কোথাও বাবাকে হারানোর শোক নিয়েও পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সফল হয়েছে মেয়ে। আবার কয়েকটি এলাকায় আশানুরূপ ফল না পাওয়ার পর শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর খবরও এসেছে।
ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থী মিনহাজুল ইসলাম রোজান। এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল সে। পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনটি নিয়ে তারও নিশ্চয়ই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সেই দিনটি আর দেখা হয়নি রোজানের।
গত ১২ আগস্ট ব্যবহারিক পরীক্ষা চলাকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে রোজান। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ দিন পর তার মৃত্যু হয়। অসুস্থতার কারণে জীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি সে। শনিবার ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, জীববিজ্ঞান বাদে অন্যান্য বিষয়ে তার জিপিএ ৪ দশমিক ৩৩। কিন্তু ব্যবহারিক পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকায় জীববিজ্ঞান বিষয়ে তাকে অকৃতকার্য দেখানো হয়েছে।
ছেলের ফলাফলের কাগজটি বাবা সাজ্জাদুল মিরাজের কাছে পাঠিয়েছিলেন বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। সেই ফল হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। যে ফলাফল দেখে ছেলের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার কথা ছিল, সেটিই হয়ে ওঠে ছেলেকে হারানোর কষ্ট নতুন করে অনুভব করার উপলক্ষ।

সাজ্জাদুল মিরাজ জানিয়েছেন, অসুস্থতার কারণে রোজান দুটি ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। পরীক্ষাগুলো দিতে পারলে তার ফল আরও ভালো হতে পারত। বাবার হিসাবে, জীববিজ্ঞানে ভালো ফল করতে পারলে রোজানের সামগ্রিক জিপিএ ৪ দশমিক ৮৩ পর্যন্ত হতে পারত।
কিন্তু এখন আর সেই হিসাবের কোনো অর্থ নেই শোকাতুর বাবার কাছে। ফলাফল এসেছে, এসেছে সন্তানের অর্জনের হিসাবও। শুধু সেই রোজান নেই।
রোজানের পরিবারের এই বেদনার বিপরীত এক অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে যশোরের বেনাপোল থেকে। সেখানে বাবাকে হারানোর গভীর শোকের মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এ গ্রেড অর্জন করেছে আফিয়া মাসুমা।

যশোরের শার্শা উপজেলা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সে। তার বাবা আব্দুস সামাদ ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়। পরদিন পরিবারের সদস্যরা যখন দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন মাসুমার সামনে এক কঠিন বাস্তবতা। একদিকে বাবাকে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে এইচএসসি পরীক্ষা। শেষ পরীক্ষাকেন্দ্রে যায় মাসুমা।
শনিবার প্রকাশিত ফলাফলে এ গ্রেড পেয়েছে সে। এই অর্জনের সঙ্গে মিশে আছে বাবাকে হারানোর বেদনা, পরিবারের সমর্থন এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা।
রোজানের বাবা ছেলের পরীক্ষার ফল হাতে পেয়েছেন, কিন্তু ছেলেকে পাননি। আর মাসুমা পরীক্ষায় সফল হয়েছে, কিন্তু সেই সাফল্যের আনন্দ বাবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পায়নি।



