ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের পরাজয়ে লাভ খুঁজছে ভারত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টির ধাক্কা ভারতের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্য, রফতানি, তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি আমদানি ও কূটনীতির ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়ার আশা করছে নয়াদিল্লি। মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা শুল্কনীতি ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশটির অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নয়াদিল্লির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপ ও বাণিজ্যযুদ্ধের নীতি নিয়ে ভারতীয় রফতানিকারকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কংগ্রেসের দুই কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হলে ট্রাম্পের কর, ব্যয় ও বাণিজ্যসংক্রান্ত নীতি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে একতরফা শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে প্রশাসনের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়তে পারে।
আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘরোয়া রাজনীতিতে চাপের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তির শর্ত নির্ধারণে কিছুটা নমনীয় হতে পারে। যার কারনে ভারত রফতানি খাতে কিছুটা সুবিধা পেতে পারে। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেই ট্রাম্পের অভিবাসন বা শুল্কনীতি পুরোপুরি পাল্টে যাবে, এমন সম্ভাবনা কম বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ভারতের অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের গুরুত্বও অনেক কারন ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারত প্রায় ৯ হাজার ২৩০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। ভারতের মোট পণ্য রফতানির ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশই আসে মার্কিন বাজার থেকে যার ফলে শুল্কসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কমলে বস্ত্র, ওষুধ ও ইলেকট্রনিকস সহ বিভিন্ন শিল্প খাতে পরিবর্তন আসতে পারে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও সুবিধা পাওয়ার আশা করছে ভারত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ বাড়লে এবং দক্ষ কর্মীদের যাতায়াত সহজ হলে ভারতীয় পেশাজীবীদের কাজের সুযোগ বাড়তে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে এইচ-১বি ভিসা আবেদনকারীদের জন্য আর্থিক শর্ত কঠোর করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
জ্বালানি খাতেও ভারতের স্বার্থ জড়িত। ট্রাম্পের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি ও ইরান সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা কমলে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে ভারত জ্বালানি আমদানিতে সুবিধা পেতে পারে।
কারণ, ভারত তার জ্বালানি চাহিদার বড় একটি অংশ রাশিয়া থেকে আমদানির করে থাকে।
রাশিয়া থেকে তেল আমদানির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের বিধিনিষেধ গুরুত্বপূর্ণ। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেসে রাশিয়া নীতি ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নতুন করে আলোচনা হতে পারে। তবে এতে ভারতের ওপর মার্কিন চাপ কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে কংগ্রেসে নতুন বিতর্কও তৈরি হতে পারে।
কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের আশা করছে নয়াদিল্লি।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের উন্নতি ভারতের উদ্বেগের কারণ হয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতিতে ট্রাম্পের ভূমিকার দাবি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যোগাযোগ নয়াদিল্লির অস্বস্তি বাড়িয়েছে। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়লে ট্রাম্প প্রশাসনের পাকিস্তাননীতি ও দক্ষিণ এশিয়ায় ভূমিকা নিয়ে বাড়তি আলোচনা হতে পারে।
তবে ডেমোক্র্যাটদের জয় মানেই ভারতের জন্য সব ক্ষেত্রে সুবিধা আসবে, এমন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও বাণিজ্যনীতি নির্ধারণে প্রেসিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে। ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেও ট্রাম্পের সব সিদ্ধান্ত বাতিল বা পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও এনডিটিভির বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেস ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নজরদারি ও চাপ বাড়াতে পারবে, তবে তাতে নীতিগত পরিবর্তন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে না।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী পরাজয়কে ভারতের জন্য সম্ভাব্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। বিশেষ করে শুল্কনীতি, বাণিজ্যচুক্তি, ভারতীয় পেশাজীবীদের ভিসা এবং জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারবে ভারত, তা নির্ভর করবে ট্রাম্প প্রশাসন ও নতুন ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সম্পর্কের ওপর।






