আন্তর্জাতিক

জরুরি অবস্থা জারিতে পাকিস্তানের গণতন্ত্র নিয়ে নতুন বিতর্ক: দ্য ডন

জরুরি অবস্থা জারিতে পাকিস্তানের গণতন্ত্র নিয়ে নতুন বিতর্ক: দ্য ডন

ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির ঘটনায় দেশটির গণতন্ত্রের অতীত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন সাংবাদিক, বিশ্লেষক, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের আশঙ্কা, এতে প্রদেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কেউ কেউ বলছেন, এই সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় সরকারও রাজনৈতিক ফাঁদে পড়তে পারে।

রোববার ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডন’এর তথ্য সূত্রে, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার। এর কয়েক দিন আগে কারাবন্দি প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চের ঘোষণা দেয় পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআই। এরপর থেকেই প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা জারির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে খাইবার পাখতুনখাওয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। এ সময় সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে প্রাদেশিক সরকারের ‘ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকার’ অভিযোগ তোলা হয়। পরে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি সিদ্ধান্তে অনুমোদন দিলে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন কার্যকর হয়।

এই সিদ্ধান্তে পাকিস্তানের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে প্রবীণ সাংবাদিক মাজহার আব্বাস বলেন, ১৯৫৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অক্টোবর মাস বারবার গণতন্ত্রের জন্য দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে। তার মতে, অতীতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এমন পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনায় পিপিপি সমর্থন দিয়েছিল। এবার পিপিপি ও পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) একমত হয়ে পিটিআইয়ের খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারকে সরানোর পথে এগিয়েছে। ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সাবেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষক মালিহা লোধিও বলেন, ইতিহাস থেকে সত্যিই কোনো শিক্ষা নেওয়া হয়নি। বিশ্লেষক নিয়াজ মুর্তজা জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তকে নিন্দনীয়, দুর্ভাগ্যজনক ও অপরিণামদর্শী বলে অভিহিত করেন। তার আশঙ্কা, এতে খাইবার পাখতুনখাওয়ার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের চেয়ারপারসন বুশরা গোহরও সতর্ক করে বলেছেন, জরুরি অবস্থা প্রদেশটির আগে থেকেই অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করবে। তার মতে, অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনই সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ।

পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশনও এ সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, জরুরি অবস্থা বা গভর্নরের শাসন জারি হলে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার যেন কোনো অজুহাতে স্থগিত করা না হয়, তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইকে অর্থবহ রাজনৈতিক সংলাপে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

আইনজীবী রিদা হোসেনের মতে, জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে খাইবার পাখতুনখাওয়ার জনগণের গণতান্ত্রিক রায় ও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের সংবিধানের ১৭৫(৩) অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখার কথা বলা হয়েছে। জরুরি অবস্থার সময় এই বিধান কার্যকর না থাকলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নির্বাহী কর্মকর্তাদের বিচারিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আরেক আইনজীবী হাসান আবদুল্লাহ নিয়াজি সিদ্ধান্তটিকে অসাংবিধানিক বলে মন্তব্য করেছেন। তার যুক্তি, সংবিধানের ২৩৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গভর্নরের শাসন জারির জন্য প্রদেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার প্রমাণ প্রয়োজন। কিন্তু খাইবার পাখতুনখাওয়ার প্রাদেশিক পরিষদ ও মন্ত্রিসভা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাই কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্যে এ ধরনের পদক্ষেপের যথেষ্ট যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি বলে তিনি মনে করেন। তাঁর আশঙ্কা, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে কেন্দ্র কোনো প্রাদেশিক সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার নজির তৈরি হলে তা জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক হবে।

সাংবাদিক ইহসানুল্লাহ টিপু মেহসুদের মতে, জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে পিটিআই রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পেতে পারে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার আরও চাপে পড়তে পারে। তার ভাষ্য, নিরাপত্তা পরিস্থিতির দায় ইসলামাবাদের ওপর পড়বে, আর জনমত গঠনের সুযোগ পাবে পিটিআই।

পাকিস্তানের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী উমর সাইফ বলেন, জরুরি অবস্থা জারির সঙ্গে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর বড় দায়িত্বও যুক্ত হয়েছে। সরকার ব্যর্থ হলে জনমনে হতাশা বাড়বে এবং সংস্কার কার্যক্রমের ওপর মানুষের আস্থা কমে যাবে। তার মতে, সংস্কার সফল করতে হলে লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা, ধারাবাহিকতা এবং তা বাস্তবায়নের দৃঢ়তা প্রয়োজন।

এদিকে পিপিপি চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারি জরুরি অবস্থা জারিকে ‘রাজনৈতিক পরমাণু বোমা’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি এরই মধ্যে তৃতীয়বারের মতো গভর্নরের শাসন জারির সিদ্ধান্ত অনুমোদন দিলেন। এর আগে ২০০৯ সালে পাঞ্জাব এবং ২০১৩ সালে বেলুচিস্তানে গভর্নরের শাসন জারি হয়েছিল। সাংবাদিক শাহজাদ ইকবাল এ পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ও বিদ্রূপাত্মক বলে মন্তব্য করেছেন।

বিষয়:গভর্নরের শাসন জারি জরুরি অবস্থা পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…