‘ককরোচ’ আন্দোলনকে ঘিরে মোদি সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালে নতুন অধ্যায় তৈরি করতে চলেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। মাত্র পাঁচ মাসে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সংগঠনটি দেশজুড়ে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং বিতর্কিত বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে শনিবার (১০ অক্টোবর) উত্তাল দিল্লি।
আন্দোলনের সূত্রপাত গত ১৫ মে। ওই দিন এক শুনানিতে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত কয়েকজন অ্যাক্টিভিস্ট ও বেকার যুবককে ‘ককরোচ’ ও ‘সমাজের পরজীবী’ বলে মন্তব্য করেন বলে দাবি করা হয়। পরে তিনি জানান, তাঁর ওই মন্তব্য ছিল জাল ডিগ্রিধারীদের উদ্দেশে। তবে মন্তব্যটি তরুণদের প্রতি বৈরী মনোভাবের প্রতিফলন কি না, তা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।
এর প্রতিবাদে পরদিন ১৬ মে গঠিত হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের অনুকরণে ব্যঙ্গাত্মকভাবে দলটির নাম রাখা হয়। অনলাইনে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা সংগঠনটি পাঁচ দফার একটি ইশতেহারও প্রকাশ করে। এতে সংসদ সদস্য ও নির্বাচন কমিশনারদের আচরণবিধি, রাজনীতিতে নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ এবং গণমাধ্যমের লাইসেন্সিং-সংক্রান্ত বিষয়গুলো স্থান পায় বলে দাবি করা হয়।
জুন থেকে দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে স্নাতক পর্যায়ে চিকিৎসাশিক্ষায় ভর্তির পরীক্ষা এনইইটিতে অনিয়মের অভিযোগে বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেয় সিজেপি। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আন্দোলনটি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসে।
আগস্টে আন্দোলনের প্রভাব সংসদেও পড়ে। বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সংসদের উভয় কক্ষে প্রতিবাদ জানায় বিরোধী দলগুলো। তাদের অভিযোগ, বিহারে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ভোটার ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনও এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে সাতটি প্রশ্ন তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় প্রায় ৬৫ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
অক্টোবরে আন্দোলনের গতি বাড়ে
গত ২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তী উপলক্ষে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপক মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্ক ও দিল্লির যন্তর মন্তরে ‘প্রতিবাদ ২.০’ এবং ‘জেল ভরো আন্দোলন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

৪ অক্টোবর দিল্লিতে সর্বভারতীয় ছাত্র সমিতির (এআইএসএ) নেতৃত্বে একটি মিছিল অশোক রোডে পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে আটকে দেওয়া হয়। ‘দ্য হিন্দু’র প্রতিবেদনে প্রায় ৫০০ জনকে আটকের কথা বলা হয়েছে। একই দিন দিল্লি পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন তিন নারী সাংবাদিক। এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
৮ অক্টোবর স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (এসএফআই), এআইএসএ, সিজেপিসহ কয়েকটি ছাত্র ও প্রগতিশীল সংগঠন ১০ অক্টোবর থেকে সম্মিলিত বিক্ষোভের ঘোষণা দেয়। একই দিন ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগে বেঙ্গালুরুতে ‘চপ্পল প্রতিবাদ’ কর্মসূচি পালিত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৯ অক্টোবর আন্দোলনের তিন নেতা অভিজিৎ দিপক, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা মুম্বাই থেকে দিল্লি পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে আটক হন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিরোধী নেতারা এ ঘটনাকে সরকারের ভয়ের বহিঃপ্রকাশ বলে অভিহিত করেছেন।
শনিবার ‘দিল্লি চলো’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে পুলিশ। ব্যারিকেডের কারণে বিক্ষোভকারীদের একাংশ নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনীর সামনে বিক্ষোভকারীদের স্লোগান দিতেও দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে।
আন্দোলনের নেতৃত্বে যারা
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকের পাশাপাশি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। সৌরভ দলের প্রধান মুখপাত্র হিসেবে আন্দোলনের বক্তব্য তুলে ধরা এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আশুতোষ মুম্বাই ও দিল্লির কর্মসূচি সমন্বয়ের পাশাপাশি ‘দিল্লি চলো’ কর্মসূচি পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তাঁদের দুজনকেই ৯ অক্টোবর আটক করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার সর্বভারতীয় সভাপতি আদর্শ এম সাজি, এআইএসএর সভাপতি নেহা বোরা এবং সর্বভারতীয় ছাত্র ফেডারেশনের (এআইএসএফ) সভাপতি বিরাজ দেবাংয়ের নামও আন্দোলনের সমন্বয়কারীদের তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং এসআইআরের বিরুদ্ধে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা (এসিএলইডি)-এর তথ্য উদ্ধৃত করে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ দিনে ভারতজুড়ে প্রায় ৩০০টি বিক্ষোভ হয়েছে। নয়াদিল্লি, মুম্বাই ও বেঙ্গালুরুতে এসব কর্মসূচিতে হাজারো মানুষ অংশ নিয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
দিল্লিতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন এবং যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের কথাও বলা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে অপমানসূচক একটি শব্দকে প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করেছে তরুণদের এই সংগঠন। আন্দোলনের নেতাদের আটক, কর্মীদের গ্রেপ্তার এবং নারী সাংবাদিকদের তোলা অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সামনে বিহার বিধানসভা নির্বাচন। এই নির্বাচন আন্দোলনটির রাজনৈতিক প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এই প্রতিবাদ দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করবে, নাকি সময়ের সঙ্গে এর গতি কমে আসবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।






