ফুটবল

মেসির শেষ প্রতিপক্ষ বেনিনের সঙ্গে বাংলাদেশের আছে মধুর ও হৃদয়বিদারক সম্পর্ক

মেসির শেষ প্রতিপক্ষ বেনিনের সঙ্গে বাংলাদেশের আছে মধুর ও হৃদয়বিদারক সম্পর্ক

বিশ্বে দেশের সংখ্যা ১৯৫টি, জাতিসংঘে তালিকায় যা ১৯৩, আবার ফিফার সদস্য সংখ্যা দেশ ২১১টি। এত দেশের মধ্যে বিশ্বজুড়ে শিরোনামে একটি দেশ, বেনিন। কারণ একটাই, সর্বকালের অন্যতম সেরা লিওনেল মেসি দেশটির বিপক্ষে খেলে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাবেন। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের পরিচয় অবশ্য বেশ পুরনো, যার একটি গল্প প্রাপ্তির আর অন্যটি বেদনাদায়ক।

আন্তর্জাতিক বিরতিতে আর্জেন্টিনা লাতিন দেশ বলিভিয়ার বিপক্ষে কর্দোবায় ও আফ্রিকার বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে ঘরের মাঠ মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে খেলেছে। আলবিসেলেস্তে দল এবার আফ্রিকারই বেনিনের বিপক্ষে খেলবে, যেখানে শেষবারের মতো আকাশী-নীল জার্সিতে খেলবেন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক মেসি। বুধবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টায় বুয়েন্স আয়ার্সের মনুমেন্টালে বেনিনের বিপক্ষে নামবে আর্জেন্টিনা।

মেসির শেষ ম্যাচ ঘিরে তুমুল আগ্রহ বিশ্বজুড়ে, কৌতূহল জেগেছে বেনিন সম্পর্কেও। দেশটির ঐতিহ্য, ধর্ম, ভৌগোলিক অবস্থান কিংবা ফুটবল নিয়ে জানার আছে অনেককিছু। ১,১৪,৭৬৩ বর্গকিলোমিটারের দেশটি আফ্রিকার পশ্চিমে অবস্থিত। বেনিনের দক্ষিণে আটলান্টিক মহাসাগর, পশ্চিমে টোগো ও বুরকিনা ফাসো। পূর্বে নাইজেরিয়া ও উত্তরে নাইজার। রাজধানী পোর্টো নোভো, দাপ্তরিক ভাষা ফ্রেঞ্চ। ১ কোটি ৫১ লাখ ৭০ হাজার জনসংখ্যার দেশ, ৯টির বেশি নৃগোষ্ঠী বাস করে। অসাম্প্রদায়িক পরিচিতির বেনিনের জনসংখ্যার ৫০-৫২ শতাংশ খ্রীষ্টীয় এবং ৩০-৩১ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী।

পূর্বে বেনিনের নাম ছিল ডাহোমি। ১৮৯০ এবং ১৮৯৪ সালে স্থানীয় রাজা বেহানজিন না চাইতেও ফরাসি বাহিনীর সাথে দুটি বড় যুদ্ধে জড়ান। যুদ্ধে ফরাসিরা জয়ী হয়ে রাজাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে পুরো অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। ১৮৯৪ সালে তারা অঞ্চলটির নাম দেয় ফরাসি ডাহোমি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন জোরদার হলে ফ্রান্স শাসননীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। ১৯৪৬ সালে ডাহোমিকে ফ্রান্সের একটি ওভারসিজ টেরিটরি বা সমুদ্রপাড়বর্তী অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ফলে স্থানীয় মানুষ সীমিত রাজনৈতিক অধিকার পান।

১৯৫৮ সালে ফরাসি পঞ্চম প্রজাতন্ত্র গঠনের পর ডাহোমি ফরাসি কমিউনিটির অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্রের মর্যাদা পায়। ১৯৬০ সালে স্বায়ত্তশাসন পাওয়ার পর পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি আরও তীব্র হতে থাকে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হুবার্ট মাগা ফ্রান্সের সাথে চূড়ান্ত আলোচনা চালিয়ে যান। সেই বছরের ১ আগস্ট ডাহোমি প্রজাতন্ত্র ফ্রান্সের উপনিবেশ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। হুবার্ট মাগা স্বাধীন দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৬৩ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে দেশটিতে প্রায় ৬টি সফল সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। ঔপনিবেশিক অতীতের স্মৃতি মুছে ফেলার জন্য ১৯৭৫ সালে ডাহোমি থেকে বদলে রাখা হয় বেনিন প্রজাতন্ত্র।

১৯৯০ সালে বেনিনে একটি ঐতিহাসিক নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান গৃহীত হয়। এরপর থেকে দেশটি এখন আর প্রধানমন্ত্রী দ্বারা নয়, রাষ্ট্রপতি দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি রোমুয়াল্ড ওয়াদাগনি, চলতি বছরের মে মাসে নবম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।

বেনিনের বৃহত্তম শহর কোটোনু। এখানে ২৩ বছর আগে ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। যার সাথে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। লাইবেরিয়ায় জাতিসংঘ মিশনে কর্মরত দুজন এবং সিয়েরা লিওনে জাতিসংঘ মিশনে কর্মরত ১৩ জন বাংলাদেশি সেনাসদস্য বোয়িং ৭২৭ উড়োজাহাজ ছিলেন, যা ২০০৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর কোটোনুর কাছে উড্ডয়নের পরপরই বিধ্বস্ত হয়। ঘটনাস্থলে মারা যান সকলে। সেসময় মিশনের এক তথ্যে জানা যায়, উড়োজাহাজে থাকা ১৬১ যাত্রীর মধ্যে ২১ জন বেঁচে গেছেন এবং ১৩১টি মৃতদেহ শনাক্ত করা হয়, ৮ জন এখনও নিখোঁজ। সেসময় বেনিনে অবস্থিত ফরাসি দূতাবাস ১৫টি কফিন বাংলাদেশে পাঠায়।

বেনিনের অর্থনীতিকে এককভাবে টিকিয়ে রেখেছে তুলা। দেশটির মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তুলা রপ্তানি থেকে। তাদের বড় রপ্তানি দেশ বাংলাদেশ। তুলা বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও বেনিনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। বেনিনের গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রায় ৪৮০.৬ মিলিয়ন ডলার মূল্যের তুলা আমদানি করে বেনিন থেকে। যা দেশটির মোট রপ্তানি আয়ের ৯১ শতাংশেরও বেশি। তুলা উৎপাদন এবং রপ্তানিতে বিশ্বের পাঁচে অবস্থান করছে দেশটি।

সবকিছু পেরিয়ে বেনিনের এখন অন্যতম বড় পরিচয় ফুটবল দেশ হিসেবেও। যার ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে মেসির বিদায়ী মঞ্চের প্রতিপক্ষ। আর্জেন্টিনা জার্সিতে ২১ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে মেসির আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ।

দল হিসেবে কেমন বেনিন? আফ্রিকার ক্যাফের অধীনে খেলা দেশটি বিশ্বর‍্যাঙ্কিংয়ে ৯৩তম স্থানে রয়েছে। ১৯৬০ সালে বেনিন জাতীয় দল গঠন করা হয়। ১৯৬৩ সালে ক্যাফের এবং ১৯৬৪ সালে ফিফার সদস্য হয় তারা। এপর্যন্ত বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলা হয়নি। তবে আফ্রিকা কাপ অব নেশনস খেলেছে ৫বার। যার মধ্যে ২০১৯ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা স্টেফান সেসেগনন। জাতীয় দলের হয়ে ২৪ গোল করা তারকা ২০২৩ সালে অবসর নিয়েছেন।

দলটির বর্তমান স্কোয়াডের কোন খেলোয়াড় ইউরোপের বড় কোন ক্লাবে খেলে না। মিডফিল্ডার জুনিয়র ওলাইতান খেলেন তুরস্কের ক্লাব বেসিকতাসে এবং ফরোয়ার্ড মিশেল বোনি খেলেন ইংলিশ ক্লাব ব্রেন্টফোর্ডে। স্টিভ মুনিয়ে ২৩টি গোল করে বেনিনের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। বর্তমান স্কোয়াডে আছেন তিনি।

বিষয়:আর্জেন্টিনা ইউ মিশন বাংলাদেশ বেনিন লিওনেল মেসি

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…