অ্যাশি ইওয়াং পিনদারিকা: ভুটানের ফুটবলে নারী নেতৃত্বের এক ব্যতিক্রমী গল্প

কৈশোরের ফুটবলপ্রেম থেকে ক্লাব পরিচালনা, মাঝখানে থমকে যাওয়া যাত্রা। সাত বছর পর সেই ক্লাবকে আবারও শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে ফিরিয়ে এনেছেন। দুই সন্তানের মা, থিম্পু এফসির প্রেসিডেন্ট, পাশাপাশি নারী ফুটবলার-অ্যাশি ইওয়াং পিনদারিকার গল্পটা স্বপ্ন, সাহস ও প্রত্যাবর্তনের।
ভুটানের ফুটবল মানেই শুধু জাতীয় দলের লড়াই কিংবা পাহাড়ঘেরা স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম নয়। মাঠের বাইরেও এই হিমালয় রাজ্যের ফুটবলকে এগিয়ে নিতে কাজ করছেন অনেকে। তাদেরই একজন অ্যাশি ইওয়াং পিনদারিকা। দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের পুরুষদের ফুটবল ক্লাব থিম্পু এফসির প্রেসিডেন্ট তিনি। পাশাপাশি খেলছেন নারী জাতীয় লিগেও। সংগঠক ও খেলোয়াড়-দুই ভূমিকায় তার পথচলা ভুটানের ফুটবলে নারী নেতৃত্বের এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ।
রাজকীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ফুটবলের প্রতি গভীর ভালোবাসা, ক্লাব পরিচালনার সাহস এবং মাঠের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা তাকে দেশটির ক্রীড়াঙ্গনে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। তবে তার এই অবস্থানে পৌঁছানোর পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। কৈশোরের ফুটবলপ্রেম, দল গঠনের স্বপ্ন, ক্লাব পরিচালনার চ্যালেঞ্জ, আর্থিক সংকটে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া-সব বাধা পেরিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প রয়েছে তার পথচলায়। ২০২৬ সালে থিম্পু এফসির শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে প্রত্যাবর্তন সেই গল্পেরই নতুন অধ্যায়।

ছেলেদের ক্লাবের একমাত্র নারী প্রেসিডেন্ট
থিম্পু এফসির প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইওয়াং পিনদারিকার পরিচয় তাকে ভুটানের ফুটবল অঙ্গনে বিশেষভাবে আলোচনায় এনেছে। ভুটান ফুটবল ফেডারেশনের প্রোফাইলে তাকে দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের পুরুষদের ফুটবল ক্লাব পরিচালনাকারী একমাত্র নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুটানে নারী ফুটবলের বিকাশও খুব বেশি দিনের নয়। ভুটান ফুটবল ফেডারেশনের ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, দেশটিতে নারী ফুটবলের প্রকৃত বিকাশ শুরু হয় ২০০৪ সালের দিকে। সামাজিক বাধা, অভিভাবকদের অনীহা এবং প্রচলিত নানা ধারণা একসময় মেয়েদের ফুটবলে অংশগ্রহণের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল।
সময়ের সঙ্গে সেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। নারী খেলোয়াড়দের জন্য লিগ, প্রশিক্ষণ ও সংগঠিত প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। নারী কোচ, রেফারি এবং ক্লাব পরিচালকদের অংশগ্রহণও এই বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। নারী ক্লাবগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে ক্লাব লাইসেন্সিং কাঠামো তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যেখানে ফিফার সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে একজন নারীর পুরুষদের শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবল ক্লাব পরিচালনা এবং একই সঙ্গে নারী লিগে খেলতে থাকা শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; ভুটানের ফুটবলে নারীদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের সম্ভাবনারও প্রতীক।

বেড়ে ওঠা ও সংগঠক হয়ে ওঠা
ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে বেড়ে ওঠা ইওয়াং পিনদারিকার ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয় শৈশবেই। মাত্র ১২ বছর বয়সে ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ডেভিড বেকহামের সমর্থক হয়ে ওঠেন তিনি। সেই আগ্রহ থেকেই একসময় নিজের দল গড়ার স্বপ্ন দেখেন।
ভারতের কোটাগিরি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর থাইল্যান্ডের ওয়েবস্টার ইউনিভার্সিটিতে গণযোগাযোগ বিষয়ে পড়াশোনা করেন পিনদারিকা। ছোটবেলায় সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখা এই নারী পড়াশোনা শেষে ভুটানে ফিরে ‘ভুটান বিজনেস’ সংবাদমাধ্যমে কাজ শুরু করেন। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহের কারণে তার সাংবাদিকতার বড় একটি অংশজুড়ে ছিল ক্রীড়াঙ্গন।
পিনদারিকার ফুটবল সংগঠক হয়ে ওঠার গল্পের মোড় ঘুরে যায় ২০১৩ সালে। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে পুনাখায় একটি দল গঠন করেন পিনদারিকা। দলটি অংশ নেয় কুইন্স কাপে। প্রথমবারের অংশগ্রহণেই শিরোপা জিতে নেয় তারা। সেই সাফল্য তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।
এরপর আর শুধু একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। তার লক্ষ্য হয়ে ওঠে এমন একটি ফুটবল ক্লাব গড়ে তোলা, যেখানে খেলোয়াড়েরা নিয়মিত প্রতিযোগিতার সুযোগ পাবেন এবং দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের বিকশিত করতে পারবেন। সেই স্বপ্ন থেকেই যাত্রা শুরু থিম্পু এফসির।

থমকে গিয়েছিল স্বপ্নের যাত্রা
কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয় পিনদারিকাকেও। ২০১৯ সালে স্পনসরশিপের অভাব এবং ক্লাব ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তির অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানোর কারণে থিম্পু এফসির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ক্লাবটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। একসময় যে স্বপ্নের শুরু হয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে একটি দল গঠনের মধ্য দিয়ে, সেই স্বপ্নই যেন থমকে দাঁড়ায় আর্থিক ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতার কাছে।
পিনদারিকার জন্য এটি ছিল বড় ধাক্কা। একটি দলকে শিরোপা জেতানো থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ ক্লাব গড়ে তোলা-দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা মুহূর্তেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। তবে ক্লাব বন্ধ হয়ে যাওয়াকে ফুটবলজীবনের শেষ হিসেবে মেনে নেননি পিনদারিকা।

সাত বছর পর প্রত্যাবর্তন
সময় গড়িয়েছে, বদলেছে পরিস্থিতি। কিন্তু থিম্পু এফসিকে আবারও প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে ফেরানোর স্বপ্ন ছাড়েননি পিনদারিকা। প্রায় সাত বছর পর, ২০২৬ সালে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়। পুরোনো বন্ধুদের আবার একত্র করেন, পাশে পান পরিবারের সহায়তাও। নতুন করে ক্লাব পুনর্গঠনের কাজে নামেন।
ধীরে ধীরে আবারও গুছিয়ে ওঠে থিম্পু এফসি। প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্লাবটি ব্যাংক অব ভুটান ভুটান প্রিমিয়ার লিগে খেলার সুযোগ পায়। দীর্ঘ বিরতির পর শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি ক্লাবের ফিরে আসা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একজন সংগঠকের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এবং হাল না ছাড়ার মানসিকতা।
পিনদারিকার এই প্রত্যাবর্তনের গল্পের বিশেষত্ব হলো, তিনি শুধু অতীতের সাফল্য ফিরিয়ে আনতে চাননি। বরং নতুন করে ক্লাবকে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন। যে সীমাবদ্ধতা একসময় ক্লাবের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছিল, ভবিষ্যতে সেসব বাধা মোকাবিলা করে আরও স্থিতিশীল কাঠামো গড়ে তোলাই এখন তার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ক্লাব প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি ফুটবলার
পিনদারিকার আরেকটি পরিচয় তাকে আলাদা করেছে। তিনি শুধু ক্লাব পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একজন সংগঠক নন, নিজেও একজন ফুটবলার। সেরাং ডব্লিউএফসির হয়ে ব্যাংক অব ভুটান উইমেনস ন্যাশনাল লিগে খেলেছেন।
ক্লাব পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাকে অর্থায়ন, ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্ব বুঝিয়েছে। অন্যদিকে মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করতে পারেন খেলোয়াড়দের শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক প্রস্তুতি ও প্রতিযোগিতার চাপ। ফলে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের সময় খেলোয়াড়দের চাহিদা বোঝার ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। একই সঙ্গে ক্লাব পরিচালনা ও খেলোয়াড়ের ভূমিকা সামলানো সহজ নয়। তবু এই দ্বৈত পরিচয়ই ফুটবলের প্রতি তার নিবেদনকে তুলে ধরে।

স্বপ্নের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
থিম্পু এফসির প্রত্যাবর্তনের পর ইওয়াং পিনদারিকার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ ক্লাবটিকে আরও পেশাদারভাবে গড়ে তোলা এবং প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করা। একটি ক্লাবকে শীর্ষ পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা যেমন কঠিন, তেমনি সেখানে ধারাবাহিকতা ধরে রাখাও কম চ্যালেঞ্জের নয়। এর জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল অর্থায়ন, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
ভবিষ্যতে থিম্পু এফসি কতটি শিরোপা জিতবে কিংবা ভুটানের ফুটবলে পিনদারিকার উদ্যোগ কতটা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ক্লাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে সেটিকে আবার শীর্ষ পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা তার ফুটবলজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।
ভুটানের ফুটবলে নারী নেতৃত্বের পথ এখনো পুরোপুরি মসৃণ নয়। সেই বাস্তবতায় অ্যাশি ইওয়াং পিনদারিকার গল্প কেবল একজন নারী ক্লাব প্রেসিডেন্টের সাফল্যের কাহিনি নয়। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যিনি দর্শক কিংবা সমর্থক হিসেবে ফুটবলকে ভালোবেসে থেমে থাকেননি, বরং দল গড়েছেন, ক্লাব পরিচালনা করেছেন, নিজেও মাঠে নেমেছেন এবং বিপর্যয়ের পর আবারও শুরু করার সাহস দেখিয়েছেন।
ফুটবলে সাফল্যের মাপকাঠি কেবল ট্রফি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। কখনো কখনো একটি ক্লাবকে বাঁচিয়ে রাখা, নতুন করে দাঁড় করানো এবং ভবিষ্যতের জন্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়াও বড় অর্জন। থিম্পু এফসিকে ফিরিয়ে এনে পিনদারিকা দেখিয়েছেন, স্বপ্ন থমকে গেলেও নতুন করে শুরু করার পথ বন্ধ হয়ে যায় না।






