অহেতুক বা তুচ্ছ কারণে থানার অফিসার ইনচার্জদের (ওসি) বদলি বন্ধে নির্দেশনা দিয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স বলেছে, যোগদানের তারিখ থেকে ১৮ মাসের আগে বড় কোনো কারণ ছাড়া তাদেরকে (ওসি) বদলি, প্রত্যাহার বা অন্য কোথাও সংযুক্ত করা যাবে না।
শুধু তাই নয়, প্রশাসনিক বা অন্য কোনো কারণে কাউকে বদলি করতে হলে, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সকে বিস্তারিত জানিয়ে প্রতিবেদন দিতে হবে। এরপর হেডকোয়ার্টার্সের অনুমতি পেলেই কেবল কোনো ওসিকে বদলি করা যাবে।
বদলি, প্রত্যাহার বা অন্যত্র সংযুক্তির ক্ষেত্রে সবার আগে জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে উল্লেখ করে পুলিশ প্রধান এ কে এম শহীদুল হক স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় বলা হয়, ‘সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, তুচ্ছ কারণে থানার অফিসার ইনজার্চকে বদলি, প্রত্যাহার বা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হচ্ছে। আবার অনেকে সন্তোষজনক চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার পর বদলি হলেও বদলির আদেশ বাতিল বা পরিবর্তনের প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়।’
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এমন নির্দেশনার পর পুলিশের মাঠ পর্যায়ে বিশেষ করে ডিআইজি এবং এসপিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অনেকেই নাম প্রকাশ না করে চ্যানেল অাই অনলাইনকে বলছেন, এরফলে ওসিদের কেউ কেউ এসপিদের কথা নাও শুনতে পারেন।
আবার পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে কাজ করেছেন এমন কেউ কেউ বলেছেন, কোনো কোনো ডিআইজি ও এসপির দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধে এমন নির্দেশনা ফলপ্রসূ হবে।
কেউ আবার ওসিদের ওপর সংসদ সদস্যদের খবরদারির কুফল তুলে ধরে বলেছেন, আইজির নিদের্শনায় কোনো ফল আসবে না, কারণ এখন দেশের সব থানার কর্মকর্তারা মূলত স্থানীয় সংসদ সদস্যদের (এমপি) হাতের পুতুল। এমপি যদি তাকে ভালো ভাবে পরিচালিত করেন তাহলে একজন ওসি ভালো কাজ করতে পারবে। না হলে, এমন পরিপত্র জারি করে ভালো কিছু পাওয়া সম্ভব না। সবই নির্ভর করে এমপির ওপর।
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘আসলে এই ধরণের নিয়ম পুলিশে সারাজীবনই ছিলো। সরকারের অন্য সব ডিপার্টমেন্টেও আছে। বিশেষ করে পরিবার বা অন্যান্য অসুবিধার কথা বিবেচনা করে এটা করা হয়েছিলো। কিন্তু কেউ তা বাস্তবায়ন করেনি। এখন হয়তো তা করার চেষ্টা হচ্ছে।’
এমন সিদ্ধান্তে পুলিশের মাঠ পর্যায়ে চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়বে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আসলে এখন শুধু পুলিশ প্রশাসনের কথা পুলিশ কাজ করতে পারে না। মাঠ পর্যায়ে পুলিশ চলে মূলত এমপির কথায়। এক্ষেত্রে দেখা যায় যেখানে ভালো এমপি থাকে, সেখানে ভালো কাজ হয়। আবার যেখানে খারাপ এমপি সেখানে পুলিশকে দিয়ে না অপকর্ম করানো হয়। সেই সুযোগে সেখানকার ওসিরাও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাই সেখানে পুলিশের স্বাভাবিক কাজ করাটা কঠিন হয়ে যায়।’
তবে এমন নির্দেশনার ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা তৈরির আশঙ্কা করে সাবেক এ পুলিশ প্রধান বলেন, “ধরে নিন এমন একটি থানায় কোনো একজন ওসিকে দায়িত্ব দেয়া হলো, যিনি আসলে দক্ষতার পরিচয় দিতে পারছেন না। তাহলে কি হবে? তাকে তো ১৮ মাসের আগেইতো বদলি করতে হবে। কারণ তাকে দিয়ে কিছুই হবে না।”
বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাকাডেমির সাবেক প্রিন্সিপাল ও এডিশনাল আইজি নাঈম আহম্মেদ বিষয়টি নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘আমার কাছে মনেহয় এমন একটা পলিসি থাকা ভালো। এতে কাজ করতে সুবিধা হয়। সহজেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া যায়।’
তবে চেইন অব কমান্ডে এ সিদ্ধান্ত কোনো প্রভাব রাখবে কিনা- সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা তৈরি হলে এসপিরা ডিআইজিকে বলে সমাধান করে নিতে পারবেন। তবে বড় ধরণের কোনো সমস্যা তৈরি হবে না বলে আমি মনে করি।’
নাম প্রকাশ না করে একজন পুলিশ সুপার চ্যানেল অাই অনলাইনকে বলেন, ‘আমি মনেকরি এধরণের সিদ্ধান্তে মাঠ পর্যায়ে চেইন অব কমান্ডে কোনো প্রভাব ফেলবে না। কেননা একজন পুলিশ সুপার আইনের মধ্যে থেকে অনেকটা স্বাধীনভাবে প্রশাসন পরিচালনা করেন। যেখানে ওসিকে শুধু বদলি করাই শাস্তি নয়; তারচেয়েও বড় শাস্তি আছে। সেই শাস্তির ভায়েই ওসিরা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবেন।’
অবশ্য এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আরেকজন পুলিশ সুপার বলেন, ‘কিছুটা হলেও এই সিদ্ধান্ত পুলিশের মাঠ পযায়ে কাজের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। কারণ ওসিরা মনে করবেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সর্বময় ক্ষমতা এসপির নাই। এতে তাদের মধ্যে এসপির নির্দেশনা অমান্য করার প্রবণতা তৈরি হবে।’
এএসপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ সুপারদের সীমাবদ্ধতা টেনে তিনি বলেন, ‘এই নির্দেশনার পর ওসিরাও নিজেদেরকে এএসপিদের পর্যায়ের ভাবতে পারেন।’
যাদের বিষয়ে পুলিশ প্রধানের এমন নিদের্শনা, সেই ওসিদের কয়েকজন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেছেন, এতে মাঠ পযায়ে চেইন অব কমান্ড মেনে চলার ক্ষেত্রে নেতিবাচক কোনো প্রভাব পড়বে না। কেননা পুলিশ প্রবিধানেই বলা হয়েছে, ঊর্ধতন কর্মকর্তার বৈধ আদেশ পালনে ওসিরা বাধ্য। তাই সে অাইন মান্য করার ক্ষেত্রে ওই নিদের্শনা কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে না।
তবে কোনো কোনো এসপির অবৈধ কর্মকাণ্ড কমবে বলেই তারা মনে করেন।









