রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলার ঘোষণা জেলেনস্কির, সহযোগিতায় তৎপর ইউরোপ
ইউক্রেনের জন্য বহুমুখী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের ঘোষণা যুক্তরাজ্যের

ছবি: সংগৃহীত।
রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে আবারও হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে তিন দিন হামলা সীমিত রাখলেও রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত রেখেছে। একইসঙ্গে ওয়াশিংটন গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধের হুমকি দিয়ে কিয়েভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলেও দাবি করেন জেলেনস্কি। অন্যদিকে ইউক্রেনের জন্য হালকা ও বহুমুখী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের ঘোষণা দিযেছে যুক্তরাজ্য।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) লন্ডন সফরকালে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে রাশিয়ার তেল স্থাপনায় হামলা সীমিত রাখা হয়েছিল। তবে রাশিয়া পাল্টা হামলা বন্ধ না করায় ইউক্রেনও আর এ বিধিনিষেধ মেনে চলবে না।
জেলেনস্কির মতে, রাশিয়ার তেল স্থাপনায় হামলা বন্ধ না করলে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে ইউক্রেনকে সতর্ক করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের আগাম সতর্কবার্তা ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রেমলিন দাবি করেছে, রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর দক্ষিণে রিয়াজান শহরের একটি তেল শোধনাগারে ইউক্রেন বড় ধরনের হামলার চেষ্টা করেছে। হামলায় ব্যবহৃত চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ও কয়েক ডজন ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। তবে সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ পড়ে শোধনাগারটিতে আগুন ধরে যায়।
অন্যদিকে জেলেনস্কি বলেন, গত একদিনে ইউক্রেনের কয়েক ডজন শহরে রাশিয়া হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে এবং কয়েক লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধে ইউক্রেন-রাশিয়াকে একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল। ক্রেমলিন আনুষ্ঠানিকভাবে ওই যুদ্ধবিরতিতে সম্মতির কথা জানায়নি। প্রস্তাবটি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালিয়েছে। জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, রাশিয়া হামলা বন্ধ রাখলে ইউক্রেনও প্রস্তাবটি মেনে নেবে।
রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ রাখার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র চেয়েছে জেলেনস্কি। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করলে হামলা বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।
ইরান যুদ্ধের কারণে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় ইউক্রেন গুরুতর সংকটে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রুশ হামলা মোকাবিলায় পশ্চিমা সামরিক সহায়তা কিয়েভের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি, স্টারলিংক পরিষেবার গতি সীমিত করা নিয়েও ইউক্রেনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জেলেনস্কির দাবি, এটি কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত।
তবে স্টারলিংকের মালিক ইলন মাস্ক বলেন, পরিষেবাটির গতি ও ব্যবহারসংক্রান্ত বিধিনিষেধ নির্ধারণের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও সরকারের।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) জানিয়েছে, সামরিক কাজে ব্যবহৃত স্টারলিংকের বিশেষ সংস্করণ স্টারশিল্ডের পরিষেবা পুনরায় চালু করা হয়েছে।
ট্রাম্প ইউক্রেনে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস ও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া, রাশিয়া থেকে তিন লাখ টন ডিজেল যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের চুক্তিরও সমালোচনা করেছেন জেলেনস্কি। তার অভিযোগ, এ ধরনের চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত রাশিয়ার যুদ্ধকালীন অর্থনীতিকে সহায়তা করছে।
অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির তেলের দাম বেড়েছে। উক্ত পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম কমানোর চেষ্টা করছেন ট্রাম্প প্রশাসন। তবে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ ইউক্রেনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি করেছে।
তবে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। যুক্তরাজ্য ইউক্রেনের জন্য হালকা ও বহুমুখী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ ত্বরান্বিত করার ঘোষণা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ব্রাসেলসে ইউরোপীয় নেতাদের বৈঠকেও ইউক্রেনের পরিস্থিতি গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জেলেনস্কি মনে করেন, রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালিয়ে যাওয়ার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া উদ্বেগজনক।
সব মিলিয়ে, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের সম্ভাব্য নতুন হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে বিরোধ এবং ইউরোপের বাড়তি তৎপরতা—এই তিনটি বিষয় ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।





