ধর্ম ও জীবন

গিবত কেন ভয়াবহ গুনাহ? কোরআন কী বলে

গিবত কেন ভয়াবহ গুনাহ? কোরআন কী বলে

ছবি: সংগৃহীত

মানুষের অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো দোষ বা দুর্বলতার কথা বলা, যা শুনলে সে অপছন্দ করবে ইসলামে একেই গিবত বলা হয়। অনেক সময় আমরা বন্ধুবান্ধবের আড্ডায়, পারিবারিক আলোচনায় কিংবা কর্মক্ষেত্রে অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলি। কথাগুলো সত্য হলেও তা যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অপছন্দের হয় এবং তার অনুপস্থিতিতে বলা হয়, তবে তা গিবত হতে পারে।

ইসলামে গিবতকে শুধু কথার দোষ হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটি এমন একটি গুনাহ, যা মানুষের সম্মান নষ্ট করে, সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করে এবং সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত করে। পবিত্র কোরআনে গিবতের ভয়াবহতা বোঝাতে এমন একটি উপমা দেওয়া হয়েছে, যা মানুষকে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়।

গিবত সম্পর্কে কোরআনের কঠোর সতর্কতা

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সূরা আল-হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াতে বলেন—
“তোমাদের কেউ যেন অন্যের গিবত না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা ঘৃণা করো।”
—সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১২ (ভাবানুবাদ)

এই আয়াতে গিবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। উপমাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন মৃত ব্যক্তি নিজের সম্মান রক্ষা করতে পারেন না, তেমনি যার অনুপস্থিতিতে গিবত করা হচ্ছে, তিনিও সেই মুহূর্তে নিজের পক্ষে কথা বলার সুযোগ পান না। আর ভাইয়ের গোশত খাওয়ার দৃশ্য যেমন ঘৃণ্য, তেমনি অন্যের সম্মানহানি করাও ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।

একই আয়াতে আল্লাহ মানুষকে অমূলক সন্দেহ, অন্যের গোপন বিষয় অনুসন্ধান এবং গিবত থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। অর্থাৎ, কারও সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা থেকে শুরু করে তার ব্যক্তিগত বিষয় খুঁড়ে বের করা এবং তা নিয়ে আলোচনা করা—এসব আচরণ থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

সত্য কথা বললেও কি গিবত হয়?

অনেকের ধারণা, কারও সম্পর্কে সত্য কথা বললে সেটি গিবত হয় না। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিসে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, গিবত হলো—তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে। সাহাবিরা জানতে চাইলেন, তাঁর মধ্যে সেই দোষটি সত্যিই থাকলে? তিনি বললেন, কথাটি সত্য হলে তা গিবত; আর তা সত্য না হলে তা হবে অপবাদ।

—সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮৯।
অর্থাৎ, কারও মধ্যে কোনো দোষ সত্যিই থাকলেও তাঁর অনুপস্থিতিতে সেই দোষ নিয়ে এমন আলোচনা করা, যা তিনি অপছন্দ করবেন, গিবতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আর মিথ্যা দোষ চাপিয়ে দিলে তা আরও গুরুতর অন্যায়—অপবাদ।

দৈনন্দিন জীবনে যেভাবে গিবত হয়

গিবত সব সময় সরাসরি কাউকে গালমন্দ করার মাধ্যমে হয় না। অনেক সময় সাধারণ আলাপের মধ্যেও তা ঘটে। যেমন—

  • বন্ধুর ব্যক্তিগত দুর্বলতা অন্যদের কাছে প্রকাশ করা।
  • সহকর্মীর ভুল বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আড়ালে আলোচনা করা।
  • কারও চেহারা, শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা পারিবারিক অবস্থা নিয়ে বিদ্রূপ করা।
  • আত্মীয়ের ব্যক্তিগত সমস্যা অন্যের কাছে বলে বেড়ানো।
  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে ইঙ্গিত করে অপমানজনক মন্তব্য করা।

কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করলেও যদি শ্রোতারা বুঝতে পারেন কার কথা বলা হচ্ছে, তাহলে সেই আলোচনা গিবত হতে পারে। শুধু মুখের কথাই নয়, ইঙ্গিত বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও কারও সম্মানহানি করা সম্ভব।

গিবত কেন এত ভয়াবহ?

১. এটি মানুষের সম্মান ও অধিকার ক্ষুণ্ন করে। অন্যের অনুপস্থিতিতে তাঁর দুর্বলতা প্রকাশ করলে তাঁর আত্মসম্মান ও সামাজিক মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

২. এটি সম্পর্ক নষ্ট করে। গিবতের কারণে পরিবার, বন্ধুত্ব ও কর্মক্ষেত্রে সন্দেহ, ভুল বোঝাবুঝি এবং শত্রুতা তৈরি হয়।

৩. এটি নিজের চরিত্রকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। নিয়মিত অন্যের দোষ নিয়ে আলোচনা করলে মানুষের মধ্যে পরনিন্দার অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে। অথচ ইসলামে নিজের ভুল সংশোধন এবং অন্যের প্রতি সদাচরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৪. এটি তওবা ও মানুষের হকের বিষয়কে সামনে আনে। গিবতের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি অন্যের সম্মানহানির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হয়। এ ক্ষেত্রে কীভাবে সংশোধন করা উচিত, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে।

গিবত থেকে বাঁচার উপায় কী?

গিবত থেকে দূরে থাকতে হলে নিজের কথা বলার অভ্যাসে সচেতন পরিবর্তন আনতে হবে।

  • কথা বলার আগে ভাবুন: কথাটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামনে বলতে পারব কি না, নিজেকে প্রশ্ন করুন।
  • আলোচনার বিষয় বদলে দিন: আড্ডায় অন্যের দোষ নিয়ে কথা শুরু হলে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করুন।
  • অন্যের গোপনীয়তা রক্ষা করুন: কারও ব্যক্তিগত সমস্যা জানলেই তা অন্যকে বলার অধিকার তৈরি হয় না।
  • নিজের ভুলের দিকে নজর দিন: অন্যের দোষ খোঁজার পরিবর্তে নিজের আচরণ সংশোধনের চেষ্টা করুন।
  • গিবত হয়ে গেলে অনুতপ্ত হন: আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, এমন আচরণ পুনরাবৃত্তি না করার সংকল্প করুন এবং যার সম্মানহানি হয়েছে, তার ক্ষতি যথাসম্ভব সংশোধনের চেষ্টা করুন। সরাসরি জানালে নতুন ক্ষতি বা বিরোধ তৈরি হতে পারে কি না, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি।

তবে কাউকে জুলুম থেকে রক্ষা করা, নিজের অধিকার আদায়ের জন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে অভিযোগ করা কিংবা প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেওয়ার মতো কিছু পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট তথ্য জানানো বৈধ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য হতে হবে প্রয়োজন পূরণ করা, কাউকে হেয় করা নয়।

গিবত থেকে ফিরে আসার শিক্ষা

গিবত থেকে বাঁচা শুধু জিহ্বা সংযত রাখার বিষয় নয়; এটি অন্যের সম্মান, ব্যক্তিগত অধিকার এবং নিজের নৈতিকতা রক্ষারও অংশ। আমরা অনেক সময় নিজের চোখে দেখা কোনো সত্য ঘটনা বলছি ভেবে গিবতকে হালকা করে দেখি। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, সত্য কথা বললেই তা বলা বৈধ হয়ে যায় না—কথাটির প্রয়োজন, উদ্দেশ্য ও পরিণতিও বিবেচনা করতে হয়।
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াত আমাদের শেখায়, অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ানো এবং আড়ালে তার নিন্দা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তাই কথা বলার আগে একটু থামা, অপ্রয়োজনীয় আলোচনা এড়িয়ে চলা এবং মানুষের সম্মান রক্ষা করা এসবই গিবত থেকে বাঁচার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

বিষয়:ইসলাম কোরআন গিবত গুনাহ

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…