মতামত

শারদীয় দুর্গোৎসব শুভ ও সুন্দরের আহ্বান

শারদীয় দুর্গোৎসব শুভ ও সুন্দরের আহ্বান

ছবি: সংগৃহীত

শারদীয় দুর্গোৎসব কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ কোনো আয়োজন নয়; এটি বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতি, শিল্প, জ্ঞান ও সঙ্গীতের এক মহাজাগতিক মিলনমেলা। পূজার প্রতিটি আচার, কাসর-ঘণ্টার শব্দ, ধূপের সুবাস, মণ্ডপের অলংকরণ আর ঢাকের গম্ভীর ধ্বনির আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে সর্বজনীন মানবকল্যাণ ও আত্মশুদ্ধির এক গভীর চিরন্তন বার্তা।

পৌরাণিক প্রেক্ষাপটে মহিষাসুর বধের রূপকটি আসলে কেবল কোনো বাহ্যিক শত্রুকে পরাভূত করার গল্প নয়; এটি মূলত মানুষের ভেতরে পুঞ্জীভূত হিংসা, দ্বেষ, অন্যায্য অহংকার ও অশুভ সামাজিক বৃত্তকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার সুগভীর আহ্বান। দেবীর দশহাতে ধরা নানা অস্ত্র সংহারের প্রতীক হলেও তার অভয়মুদ্রা শাশ্বত শান্তির প্রতিশ্রুতি বহন করে। মণ্ডপে মণ্ডপে যখন ঢাকের বাদ্য বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তখন তা স্থান-কাল-পাত্রের সীমা পেরিয়ে প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে সম্প্রীতি ও বৈচিত্র্যের মাঝে একতার স্পন্দন জাগিয়ে তোলে। সমস্ত কৃত্রিম দ্বিধা, শ্রেণিভেদ ও সামাজিক বৈষম্য ভুলে একই আনন্দমঞ্চে সমবেত হয়ে উৎসব উদযাপন করাই এই শারদীয় মহোৎসবের মূল সুর। শরতের এই আলোকময় উৎসবে দূর হয়ে যাক পৃথিবীর সব সামাজিক অস্থিরতা, অনৈক্য ও কলুষতা। শুভ শক্তির চিরন্তন জয় হোক, আর প্রতিটি হৃদয়ে ফিরে আসুক অনাবিল শান্তি, বৈশ্বিক স্থায়িত্ব ও গাঢ় সম্প্রীতি।

শারদীয় উৎসবের সঙ্গে সুর ও সাহিত্যের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই অবিচ্ছেদ্য। বাংলা সাহিত্যে শরতের প্রকৃতি ও আগমণী ভাবনাকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের দর্শনে উৎসব হলো মানুষের সাথে মানুষের প্রাণের সর্বজনীন মিলন, যেখানে ঘরের সঙ্কীর্ণ পরিধি পেরিয়ে প্রতিটি প্রাণ যুক্ত হয় ‘বিশ্বপ্রাণের’ বিশালতায়। তার কবিতা ও গানে শরতের শিউলি ঝরা ভোর এবং আগমনীর বিষাদময় মাধুর্য এক অপূর্ব নান্দনিক রূপ লাভ করেছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করলে দেখা যায়, কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ঐতিহাসিক বিজয়া সম্মিলনী এবং সেখানকার বিশেষ দরবারি ধ্রুপদী সঙ্গীত সভা ভারতীয় সঙ্গীত সংস্কৃতিকে একসময় অনন্য উচ্চতা ও আভিজাত্য প্রদান করেছিল।

সঙ্গীতের এই সুরধারা ভারতীয় মহাদেশীয় সীমানা পেরিয়ে ধ্রুপদী ও বৈশ্বিক রূপ ধারণ করে। মুঘল সম্রাট আকবরের রাজসভার অন্যতম ‘নবরত্ন’ এবং ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের প্রবাদপুরুষ ওস্তাদ মিঞা তানসেনের নাম এখানে বিশেষভাবে স্মরণীয়। তানসেনের রাগ সৃষ্টির অনন্য কুশলতা সঙ্গীতজগতে অমর হয়ে আছে। তার সৃষ্ট ‘মিঞা কি মল্লার’ বা ‘রাগ মেঘ’ বর্ষার জলের আহ্বায়ক হলেও, ‘দরবারি কানাড়া’ বা ‘রাগ ভৈরবী’-র মতো রাগগুলোর গভীর সুর-মূর্ছনা শারদীয় আগমনী ও বিজয়ার বিষাদময় পরিবেশকে আরও বহুগুণে গম্ভীর, গম্ভীর ও মহীয়ান করে তোলে।

আজকের বিশ্বায়নের যুগে দুর্গাপূজা কেবল একটি আঞ্চলিক উৎসব নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত এক মহাজাগতিক শিল্প-উৎসব। ২০২১ সালে ইউনেস্কোর ‘অদৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ (Intangible Cultural Heritage) সম্মাননা প্রমাণ করে যে—ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে এটি কীভাবে বিশ্বজনীন রূপান্তরের প্রতীক হয়ে উঠেছে। পশ্চিমা বিশ্বের শিল্প-সমালোচকরা দুর্গাপূজার উন্মুক্ত মণ্ডপ ও ক্ষণস্থায়ী শিল্পকলাকে (Ephemeral Art) মানব সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামাজিক সংহতি হিসেবে গণ্য করেন। বিশ্বায়নের ক্যানভাসে দুর্গাপূজা আজ বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের এক শাশ্বত বার্তা।

আবার প্রাচ্যের এই সুরবোধকে যদি আমরা পাশ্চাত্যের সঙ্গীতবিশ্বের সাথে তুলনা করি, তবে সেখানে ক্যানাডীয় মহাকবি, সুরকার ও সঙ্গীতশিল্পী লেনার্ড কোহেনের নাম উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কোহেনের সৃষ্টিতে যেমন গভীর আধ্যাত্মিকতা, আত্মানুসন্ধান এবং বিষাদ ও আনন্দের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন দেখা যায়-যা বহুলাংশে দুর্গাপূজার অন্তর্নিহিত ভাবনার সাথেই মিলে যায়। লিওনার্দো কোহেনের গান যেমন একই সাথে জীবনের ক্ষত ও জয়ের দ্বৈততাকে একসূত্রে বাঁধে, তেমনি দুর্গাপূজাও একদিকে মহাদেবীর মর্ত্যে আগমনের আনন্দ-উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে বিজয়া দশমীতে তার বিদায়ের করুণ বিষাদের এক অপরূপ ও কালজয়ী সুরসংহতি।

উৎসবের এই ঐতিহাসিক ও নান্দনিক বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক চারিপাশে- অসুরশক্তির পতনে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হোক সত্য, সুন্দর ও শাশ্বত ন্যায়।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিষয়:বাঙালির সংস্কৃতি শারদীয় দুর্গোৎসব শুভ ও সুন্দরের আহ্বান

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…