এল নিনোর প্রভাবে উত্তাল প্রশান্ত মহাসাগর, পূর্ব এশিয়ায় একের পর এক শক্তিশালী টাইফুন

ছবি: সংগৃহীত
এল নিনোর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় পূর্ব এশিয়ায় একের পর এক শক্তিশালী টাইফুন আঘাত হানছে। এসব ঝড়ে প্রাণহানির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসল ও অবকাঠামো। বন্ধ রাখতে হচ্ছে বিমানবন্দর, বাতিল হচ্ছে শত শত ফ্লাইট। ফিলিপাইন, তাইওয়ান, চীন ও জাপানে দেখা দিয়েছে চরম আবহাওয়ার পরিস্থিতি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর)সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ পায়।
গত কয়েক মাসে এসব অঞ্চলে একের পর এক শক্তিশালী ও অস্বাভাবিক গতিপথের ঝড় তৈরি হয়েছে। অক্টোবরে তাইওয়ানের দিকে ধেয়ে যায় শক্তিশালী টাইফুন চ্যাম্পি। ঘণ্টায় ২৯৫ কিলোমিটার বেগের বাতাস নিয়ে আসা ঝড়টি ক্যাটাগরি-৫ মাত্রার হারিকেনের সমান শক্তিশালী ছিল। শেষ পর্যন্ত তাইওয়ানে আঘাত না হানলেও প্রবল বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। হংকং, তাইওয়ান ও জাপানে শত শত ফ্লাইট বাতিল হয়। জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপপুঞ্জে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ১৫ হাজার বাড়ি।
এর আগে জুনে জাপানের পূর্ব উপকূলের দিকে একসঙ্গে ধেয়ে যায় দুটি ঝড়। এতে প্রায় ১০ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। জুলাইয়ে চীনের দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানে ক্রান্তীয় ঝড় নাররা। এতে ডুবে যায় বেশ কয়েকটি গ্রাম এবং বাস্তুচ্যুত হন হাজারো মানুষ। আগস্টে সুপার টাইফুন ডলফিন ১৬ দিন প্রশান্ত মহাসাগরে তাণ্ডব চালানোর পর পূর্ব চীনে আঘাত হানে। এতে ভয়াবহ বন্যা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এসব ঝড়ের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে এল নিনো। এটি একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতি, যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠে। এর ফলে বায়ুপ্রবাহের ধরন বদলে যায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়া তৈরি হয়। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা দেয় এবং প্রায় এক বছর স্থায়ী হয়।

যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের এল নিনো সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। এটি আগামী ফেব্রুয়ারি বা মার্চ পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফিলিপাইনের আবহাওয়া দপ্তরের জলবায়ুবিদ আনা লিজা সলিস বলেন, এল নিনোর কারণে প্রশান্ত মহাসাগর যেন জ্বরে পুড়ছে। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ায় ঝড়গুলো স্বাভাবিকের তুলনায় আরও শক্তিশালী হচ্ছে। পাশাপাশি এল নিনোর প্রভাবে টাইফুনগুলো সাধারণত স্বাভাবিকের চেয়ে পূর্ব দিকে সৃষ্টি হচ্ছে এবং উষ্ণ পানির ওপর দিয়ে দীর্ঘ সময় চলায় শক্তি সঞ্চয় করছে।
এদিকে ভবিষ্যতে এসব ঝড়ের প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকেরা। ফিলিপাইনের জলবায়ুবিদ রাফায়েলা জেন ডেলফিনো ও তার সহকর্মীরা গবেষণায় দেখেছেন, তাপমাত্রা বাড়লে শক্তিশালী ঝড়ের মোট বৃষ্টিপাত ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়বে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ। জাপান নাগরিকদের খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। চীন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার পাশাপাশি আগাম সতর্ক ব্যবস্থা জোরদার করছে। অন্যদিকে ফিলিপাইনসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো খাদ্য উৎপাদন, বিশেষ করে ধানের ফসল রক্ষায় প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। সংস্থাটির মতে, এল নিনোর ক্ষতি কতটা ভয়াবহ হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে আগাম পরিকল্পনা, অবকাঠামো নির্মাণ, পানি ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতির ওপর।





