আন্তর্জাতিক

যে ভালোবাসায় দুবার বন্ধক রাখতে হয়েছে নিজের বাড়ি!

যে ভালোবাসায় দুবার বন্ধক রাখতে হয়েছে নিজের বাড়ি!

একটি পিৎজা রেস্তোরাঁর ব্যবসায় বিনিয়োগ করার কথা ছিল। সঞ্চিত অর্থ দিয়ে স্বামীকে নিয়ে নতুন উদ্যোগে নামার প্রস্তুতিও চলছিল। কিন্তু হঠাৎ একটি ফোনকল বদলে দিল সব পরিকল্পনা। বন্ধুর কাছ থেকে খবর পেলেন, নিলামে উঠছে প্রয়াত ব্রিটিশ রাজবধূ প্রিন্সেস ডায়ানার ছয়টি পোশাক। ব্যস, পিৎজা ব্যবসার স্বপ্ন আপাতত তুলে রেখে ছুটলেন নিলামঘরে। সেই যে শুরু, এরপর কেটে গেছে ১২ বছর। এখন তার সংগ্রহে রয়েছে ডায়ানার ব্যবহৃত ৮০০টিরও বেশি পোশাক, অলংকার ও ব্যক্তিগত সামগ্রী। আর এই সংগ্রহ গড়ে তুলতে নিজের বাড়িও একাধিকবার বন্ধক রেখেছেন তিনি।

বলছি যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের বাসিন্দা রেনি প্ল্যান্টের কথা। প্রয়াত প্রিন্সেস ডায়ানার স্মৃতি ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী সংরক্ষণে জীবনের বড় একটি অংশ উৎসর্গ করেছেন তিনি। তার দাবি, ডায়ানার ব্যক্তিগত সামগ্রী নিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন তিনি। ডায়ানার প্রতি রেনির ভালোবাসার শুরু সেই শৈশবে। ১৯৮৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে স্কুলের একটি শিক্ষা সফরে গিয়ে প্রথমবারের মতো সরাসরি ডায়ানাকে দেখার সুযোগ পান তিনি। তখন তার বয়স মাত্র ১২ বছর।

প্রিন্সেস ডায়ানার ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের বৃহত্তম ব্যক্তিগত সংগ্রহটি রেনি প্ল্যান্টের কাছে রয়েছে

রাজকুমারীর রূপকথার বিয়ের গল্পে মুগ্ধ রেনির কাছে ডায়ানাকে সামনে থেকে দেখাটাই ছিল স্বপ্নপূরণের মতো। সেদিন ডায়ানার সঙ্গে দেখা করার জন্য স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। একপর্যায়ে সহপাঠীদের কাছ থেকে সরে ব্যারিকেড পেরিয়ে ডায়ানার কাছাকাছি চলে যান। তখনই চোখে পড়ে একটি ছোট্ট মাটির তৈরি প্লাটিপাস। এটি ছিল ডায়ানার পড়ে যাওয়া একটি স্মারক। এক পুলিশ সদস্য সেটি রেনির হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, এটি যেন তার ভাগ্যেই ছিল। সেই ছোট্ট ঘটনাকেই জীবনের বিশেষ ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন রেনি। তার ভাষায়, মনে হয়েছিল ঘটনাটি যেন পূর্বনির্ধারিত। এরপর থেকে ডায়ানার জীবন ও স্মৃতি সংরক্ষণই হয়ে ওঠে তার অন্যতম লক্ষ্য।

২০১৮ সালে ডায়ানার মানবিক ও দাতব্য কাজের আদর্শ অনুসরণকারী বিভিন্ন দাতব্য সংস্থাকে সহায়তা দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘দ্য প্রিন্সেস অ্যান্ড দ্য প্লাটিপাস ফাউন্ডেশন’। তার উদ্দেশ্য, ডায়ানার জীবন ও উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করে তা বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরা।

ডায়ানার কিছু স্মৃতিচিহ্ন, যা প্ল্যান্টের মালিকানাধীন (ক্যালিফোর্নিয়ার মিউজিয়ামে আয়োজিত হতে যাওয়া একটি প্রদর্শনীর অংশ)

সংগ্রহ গড়তে বাড়ি বন্ধক, স্বামীর সহযোগিতা

ডায়ানার ব্যবহৃত সামগ্রী পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় সেগুলো এক জায়গায় সংরক্ষণের স্বপ্ন দেখেন রেনি। এজন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিলামে অংশ নিয়েছেন তিনি। এমনকি লন্ডনের ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও রাজকীয় পোশাক সংরক্ষণে কাজ করা দাতব্য সংস্থা হিস্টোরিক রয়্যাল প্যালেসেসের সঙ্গেও নিলামে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ডায়ানার পোশাক কিনেছেন। আবার নিজের সংগ্রহ থেকে তাদের পোশাক ধারও দিয়েছেন। তবে এত বড় সংগ্রহ গড়ে তোলা সহজ ছিল না। এর পেছনে রয়েছে আর্থিক ত্যাগ, স্বামীর সহযোগিতা এবং একের পর এক বড় অঙ্কের বিনিয়োগ। রেনির স্বামী লিভিনিও স্টুককে তিনি ভালোবাসার মানুষ হিসেবে উল্লেখ করেন। কারণ, সংগ্রহ বাড়াতে প্রয়োজন হলে স্বামী তাদের বাড়ি বন্ধক রাখতেও রাজি হয়েছেন।

প্ল্যান্টের সংগ্রহে রয়েছে প্রিন্সেস ডায়ানার ‘কেয়ারিং ড্রেস’ (হাসপাতালে শিশুদের সঙ্গে দেখা করার সময় পরেছিলেন ডায়ানা)

২০১৫ সালে ডায়ানার পরা স্টাডযুক্ত অ্যাটেলিয়ার ভার্সাচের একটি গাউন কিনতে বাড়ি পুনরায় বন্ধক রাখেন তারা। নিলামে পোশাকটি কিনতে খরচ হয় ২ লাখ ডলার। এরপর ২০২৫ সালে আবারও বাড়ির বিপরীতে ঋণ নিয়ে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেন এই দম্পতি। গত বছর ৫ লাখ ২০ হাজার ডলারে কেনেন ডায়ানার বিখ্যাত ‘কেয়ারিং ড্রেস’। উজ্জ্বল ফুলেল নকশার বেলভিল স্যাসুনের তৈরি পোশাকটি পরে ডায়ানা শিশুদের হাসপাতালে যেতেন। অসুস্থ শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে পোশাকটির উজ্জ্বল রং বেছে নিয়েছিলেন তিনি। ১৯৮৮ সালে ডায়ানাকে এই পোশাকে সরাসরি দেখেছিলেন রেনি।

ডায়ানা মধুচন্দ্রিমার সময় উটপাখির পালকযুক্ত টুপিটি পরেছিলেন, প্ল্যান্ট নিলামে ২৬ হাজার ডলারে কিনেছিলেন

একই নিলাম থেকে ডায়ানার আরও ৩৪টি সামগ্রী কেনেন তিনি। এর মধ্যে ছিল মধুচন্দ্রিমায় ডায়ানার পরা পিচ রঙের উটপাখির পালকের টুপিও। শুধু ওই দিনই তাদের ব্যয় হয় প্রায় ১৯ লাখ ডলার। অন্যদিকে, ডায়ানার বিখ্যাত কালো ভেড়ার নকশার সোয়েটারটি কেনার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আক্ষেপও রয়েছে রেনির। ১৯৮১ সালের ‘ওয়ার্ম অ্যান্ড উন্ডারফুল’ ব্র্যান্ডের সোয়েটারটি নিলামে রেকর্ড ১১ লাখ ৪০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়। স্বামীকে দর হাঁকানোর দায়িত্ব দেওয়ায় সেটি হাতছাড়া হয়েছে বলে মজা করে বলেন তিনি। তবে সৌভাগ্যক্রমে একই ধরনের দুটি সোয়েটার তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয়টিও নিজের সংগ্রহে নিতে সক্ষম হন রেনি।

‘ওয়ার্ম অ্যান্ড উন্ডারফুল’ ব্র্যান্ডের সোয়েটার, একই ধরনের দুটি সোয়েটার তৈরি হয়েছিল

ডায়ানার জীবনের গল্প নিয়ে প্রথম প্রদর্শনী

এতদিন ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগ্রহ গড়ে তুললেও এবার প্রথমবারের মতো জনসাধারণের সামনে তুলে ধরছেন ডায়ানার স্মৃতিচিহ্নগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের রোনাল্ড রিগ্যান প্রেসিডেনশিয়াল লাইব্রেরি অ্যান্ড মিউজিয়ামে শনিবার উদ্বোধন হচ্ছে তার প্রথম প্রদর্শনী ‘দ্য প্রিন্সেস ডায়ানা: লাভ, লাইফ অ্যান্ড লিগ্যাসি; এ লাইফ অব গিভিং’। ডায়ানার শৈশব থেকে শুরু করে ১৯৯৭ সালে তার মর্মান্তিক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জীবনের নানা অধ্যায় তিনটি পর্বে তুলে ধরা হবে এই প্রদর্শনীতে। এতে থাকছে ডায়ানার ব্যক্তিগত চিঠি, শৈশবের পোশাক, কণ্ঠস্বর রেকর্ড করার টেপ রেকর্ডার, পছন্দের গানের রেকর্ড এবং অসংখ্য রাজকীয় গাউন।

প্রদর্শনীতে স্থান পাচ্ছে ডায়ানার বিয়ের জন্য তৈরি বিশাল টাফেটা কাপড়ের বিকল্প গাউন থেকে শুরু করে তার ৩৬তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে পরা কালো জ্যাক আজাগুরির নকশা করা পোশাক। এমনকি ১৯৮৫ সালে হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের দেওয়া নৈশভোজে অভিনেতা জন ট্রাভোল্টার সঙ্গে নাচের সময় ডায়ানার পরা বিখ্যাত ভেলভেট গাউনটিও থাকছে প্রদর্শনীতে। তবে সেটি রেনির সংগ্রহের নয়, ধার করা হয়েছে। ডায়ানার পোশাকের পাশাপাশি প্রদর্শনীতে থাকবে তৎকালীন মার্কিন ফার্স্ট লেডি ন্যান্সি রিগ্যানের হাতির দাঁতের রঙের জেমস গ্যালানোসের তৈরি গাউনও।

১৯৮৫ সালে হোয়াইট হাউসে জন ট্রাভোল্টার সঙ্গে নাচের সময় প্রিন্সেস ডায়ানা যে পোশাকটি পরেছিলেন

শেষ পোশাক, অসমাপ্ত গল্প

রেনির সংগ্রহে থাকা সবচেয়ে আবেগঘন সামগ্রীর একটি হলো ডায়ানার জন্য তৈরি কালো রঙের একটি গাউন। নকশা করেছিলেন জ্যাক আজাগুরি। ধারণা করা হয়, এটি ছিল ডায়ানার জীবনের শেষদিকে অর্ডার করা পোশাকগুলোর একটি। রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক পোশাকবিধিতে কালো রং সাধারণত শোকের সময় ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের পর ডায়ানা কালো পোশাকেও নিজের স্বতন্ত্র রুচি ও আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করতে শুরু করেন। পোশাকটির নকশায় ছিল আকর্ষণীয় হার্টশেপ নেকলাইন, যা তার স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন।

গাউনটি তৈরির জন্য মোট ছয়বার ফিটিং দিয়েছিলেন ডায়ানা। ১৯৯৭ সালের আগস্টে মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগেও শেষবারের মতো পোশাকটির ফিটিং হয়েছিল। কিন্তু পোশাকটি আর কখনও পরার সুযোগ হয়নি তার। এখনও গাউনটির পেছনে সেলাইয়ের পিন লাগানো অবস্থায় রয়েছে। রেনির কাছে এটি কেবল একটি পোশাক নয়; বরং ডায়ানার জীবনের এক অসমাপ্ত অধ্যায়ের স্মারক।

ডায়ানার ‘শেষ বিদায়ী পোশাক’ যেটি সম্পূর্ণ অবস্থায় পরে দেখার সুযোগ প্রয়াত এই রাজকুমারী আর পাননি

ডায়ানার বিখ্যাত ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ ক্রিস্টিনা স্ট্যাম্বোলিয়ানের নকশা করা সেই কালো পোশাকটিও সংগ্রহে নেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তার। আগামী ৫ ডিসেম্বর নিউইয়র্কে সোথেবির নিলামে উঠবে পোশাকটি। এর সম্ভাব্য দাম ধরা হয়েছে ৩ লাখ ডলার। কিন্তু বাড়ি বন্ধক রেখে ইতিমধ্যে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করায় এবার আর সেটি কেনার সামর্থ্য নেই বলে জানিয়েছেন রেনি। লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজের প্রিস্কুল পরিচালনার পাশাপাশি নিলামে অংশ নেওয়া, পোশাক সংরক্ষণ এবং সংগ্রহের তালিকা তৈরির কাজ করেন তিনি।

পোশাকগুলো ভালো রাখতে জলবায়ু নিয়ন্ত্রিত বিশেষ সংরক্ষণাগারে রাখতে হয়, যার জন্য প্রতি মাসে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। এছাড়া অর্থের বিনিময়ে সদস্যদের জন্য অনলাইন জাদুঘরও পরিচালনা করছেন তিনি। রেনির কাছে ডায়ানার এসব পোশাকের মূল্য কেবল অর্থ দিয়ে পরিমাপ করার বিষয় নয়। তার বিশ্বাস, এর চেয়েও বড় কোনো উদ্দেশ্য তাকে এই কাজের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ডায়ানার জীবন, মানবিকতা ও উত্তরাধিকারকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তার লক্ষ্য।

একটি ছোট্ট মাটির প্লাটিপাস থেকে শুরু হওয়া সেই ভালোবাসা আজ রূপ নিয়েছে ৮০০টিরও বেশি স্মৃতিচিহ্নের বিশাল সংগ্রহে। আর সেই সংগ্রহের প্রতিটি পোশাক যেন বলে যাচ্ছে রাজকীয় জীবনের ইতি ঘটলেও মানুষের হৃদয়ে প্রিন্সেস ডায়ানার গল্প এখনও শেষ হয়নি।

সূত্র: সিএনএন

বিষয়:নিলাম প্রিন্সেস ডায়ানা বন্ধক রেনি প্ল্যান্ট

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…