তাসনীম সিরাজ রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ও অপতথ্যের শিকার: শিক্ষক নেটওয়ার্ক

ছবি সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ও অপতথ্যের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। একই সঙ্গে তাঁকে ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে পুরো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছে সংগঠনটি।
শনিবার (১০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে শিক্ষক নেটওয়ার্ক এসব দাবি জানায়।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত বুধবার (৭ অক্টোবর) ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়ার সময় তাসনীম সিরাজের সঙ্গে এক শিক্ষার্থীর পোশাক ও চোখ দৃশ্যমান না থাকা নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় তিনি ইসলামে পর্দার বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যাখ্যাও তুলে ধরেন। একপর্যায়ে ওই শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষ ত্যাগ করেন এবং আরও কয়েকজন তাঁকে অনুসরণ করেন।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের দাবি, শিক্ষার্থী কষ্ট পেয়েছেন বুঝতে পেরে তাসনীম সিরাজ ক্লাস শেষে তাঁর কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে করিডোরে অপেক্ষা করেন। তবে কয়েকবার খবর দেওয়ার পরও ওই শিক্ষার্থী তাঁর সঙ্গে কথা বলতে আসেননি।
বিবৃতিতে শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের এমন আচরণ বা বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়, যা শিক্ষার্থীর শারীরিক-মানসিক কষ্ট কিংবা অপমানবোধের কারণ হতে পারে। শিক্ষার্থীদের প্রতি সর্বোচ্চ সহনশীলতা বজায় রাখা এবং অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া না দেখানো শিক্ষকদের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব পালনে ব্যত্যয় ঘটে থাকতে পারে বলেও মনে করে সংগঠনটি।
তবে সংগঠনটির অভিযোগ, শ্রেণিকক্ষের আলোচনাকে সীমিত পরিসরে সমাধান না করে ধর্মকে হাতিয়ার বানিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জনপরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। খণ্ডিত অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের মাধ্যমে তাসনীম সিরাজকে অনলাইন ট্রায়ালের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা।
তাসনীম সিরাজকে তাঁর কোর্সগুলো থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেছে শিক্ষক নেটওয়ার্ক। সংগঠনটির দাবি, অভিযুক্ত শিক্ষককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ইংরেজি বিভাগ জরুরি সভা করে তাঁর কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, শিক্ষার্থীরা ৮ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেন। তবে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির সভা ডাকার প্রস্তুতি নেওয়া হয় ৭ অক্টোবর সন্ধ্যায়, যখন লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাসনীম সিরাজ ওই সভায় অংশ নিতে পারেননি। ৮ অক্টোবর তাঁকে বিভাগীয় সভাপতির স্বাক্ষর করা সভার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এরপরও বিভাগ তাঁর সঙ্গে অন্য কোনো উপায়ে যোগাযোগ করেনি বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের মতে, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের আদেশের পরিপন্থী। সংগঠনটি মনে করে, শিক্ষার্থীদের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করা এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, গত দুই বছর ধরে তাসনীম সিরাজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেনস্তা, গালিগালাজ, চরিত্রহনন এবং প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়েছেন। এসব অভিজ্ঞতার কারণে তিনি মানসিক অভিঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বলেও উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের অভিযোগ, ছাত্র শিবির নিয়ন্ত্রিত ডাকসু ও ছাত্রী সংস্থা ঘটনাটিকে দ্রুত রাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে নিয়ে গেছে। পাশাপাশি কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, বট অ্যাকাউন্ট ও সংবাদমাধ্যম সত্য-মিথ্যার মিশেলে অপতথ্য ছড়িয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা।
সংগঠনটি বলেছে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর একাডেমিক আলোচনা ও পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ রক্ষা করা জরুরি। তবে পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজনে কখন মুখ দৃশ্যমান রাখা প্রয়োজন, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার। নীতিমালার অস্পষ্টতা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের জন্য হয়রানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শিক্ষক নেটওয়ার্ক পুরো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, তাসনীম সিরাজকে ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর্যালোচনা এবং অনুমতি ছাড়া শ্রেণিকক্ষের বক্তব্য ধারণ করে খণ্ডিতভাবে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।






