সায়ানাইডে আত্মঘাতী, ‘বোমারু মামুন’-এর নেটওয়ার্ক কি ফের সক্রিয়?

বরিশালের রূপাতলী থানার মো. ইসমাইল মীরের ছেলে মামুন দক্ষিণখান, টঙ্গী ও উত্তরার বিভিন্ন স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করেন। ২০১৬ সালে এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যাননি।
সুইসাইড ভেস্টের বদলে এবার আত্মঘাতী হামলায় সায়ানাইড ব্যবহারের প্রস্তুতির তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সাভারের হেমায়েতপুরে বোমা তৈরির সরঞ্জামের সঙ্গে উদ্ধার সন্দেহজনক রাসায়নিক পরীক্ষার পর প্রাথমিকভাবে সায়ানাইড শনাক্ত হয়েছে। আর এই ঘটনার তদন্তে সামনে এসেছে নাজমুল হাসান মামুনের নাম। পুলিশের কাছে যিনি পরিচিত ‘বোমারু মামুন’ নামে। তদন্তে উঠে এসেছে মামুনের নতুন নেটওয়ার্কের তথ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, অনলাইনে নির্দেশনা নিয়ে আবারও সংগঠন গোছানোর চেষ্টা করছেন তিনি।
নব্য জেএমবির এই সদস্য দীর্ঘদিন ধরেই বোমা তৈরিতে দক্ষ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে। ২০১৭ সালের পান্থপথের হোটেল ওলিও বিস্ফোরণ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার দেওয়া জবানবন্দিতে নব্য জেএমবির একাধিক নেতা ও আস্তানার তথ্য উঠে আসে। ওই মামলায় প্রায় সাড়ে ছয় বছর কারাবন্দি থাকার পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জামিনে মুক্তি পান তিনি। পরে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মামুনসহ ১১ জনকে বেকসুর খালাস দেন সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, কারাগার থেকে বের হওয়ার পর আবারও নব্য জেএমবির একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজে যুক্ত হন মামুন।
গত ১১ আগস্ট সাভারের হেমায়েতপুরের দক্ষিণ শ্যামপুরে একটি তিনতলা ভবনে অভিযান চালায় কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। অভিযানের আগে মামুনের সহযোগী হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ওই আস্তানায় অভিযান চালানো হয় বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।
অভিযানে বোমা তৈরির সরঞ্জামের সঙ্গে সন্দেহজনক রাসায়নিক উদ্ধার করা হয়। পরে সেগুলো ঢাকার মহাখালীতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষকের কার্যালয়ে পাঠানো হলে প্রাথমিক পরীক্ষায় সায়ানাইড শনাক্ত হয়।
সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, সন্দেহজনক রাসায়নিকটি সায়ানাইড বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। ঘটনার মামলা তদন্ত করছে অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)।
তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, হেমায়েতপুরের ওই আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া উপকরণ এবং ইমরানকে জিজ্ঞাসাবাদে মামুনের বর্তমান নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে।
এটিইউ ও সিটিটিসির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নব্য জেএমবির আমির মোহাম্মদ কামরুল হাসান ওরফে মাহাদী হাসান জন বর্তমানে দেশের বাইরে থেকে সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার দাবি, কামরুলের নির্দেশনাতেই মামুন নেটওয়ার্ক বিস্তারের চেষ্টা করছেন এবং আত্মঘাতী হওয়ার ক্ষেত্রে সায়ানাইড ব্যবহারের নির্দেশনাও এসেছে তার কাছ থেকে।
বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার বাসিন্দা কামরুল হাসান দেশের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসবিরোধী মামলার আসামি বলে জানিয়েছেন বগুড়ার গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, তিনি বিদেশে পলাতক।
তদন্তকারীদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে সংগঠনের একাধিক সদস্য গ্রেপ্তার হওয়ার পর যোগাযোগের মাধ্যমও বারবার পরিবর্তন করেছে নব্য জেএমবি। বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
বরিশালের রূপাতলী থানার মো. ইসমাইল মীরের ছেলে মামুনের পড়াশোনা ঢাকার দক্ষিণখান, টঙ্গী ও উত্তরার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ২০১৬ সালে এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর পড়াশোনা আর এগোয়নি।
মামুনের দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, কলেজে পড়ার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবু মুসলিমা নামে একজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে ধর্মীয় উগ্রবাদী মতাদর্শে তাকে প্রভাবিত করা হয়। এনক্রিপ্টেড যোগাযোগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার পরিচয় হয় নব্য জেএমবির অন্য সদস্যদের সঙ্গে।
২০১৬ সালের শেষ দিকে তিনি চট্টগ্রামে যান। পরের বছর সেখানে নব্য জেএমবির সদস্য মো. সাখাওয়াত হোসেন ওরফে মাহফুজের কাছ থেকে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন। পরে ঝিনাইদহে আব্দুস সবুর খান ওরফে হাতকাটা সোহেলের কাছ থেকেও প্রশিক্ষণ নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
হাতকাটা সোহেল ছিলেন ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথিতে থাকা ব্যক্তি। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামুনের জবানবন্দিতে নব্য জেএমবির আরও কয়েকজন শীর্ষ সদস্যের সঙ্গে তার যোগাযোগের তথ্য উঠে আসে। তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হন।
২০১৭ সালের ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে ঢাকায় নাশকতার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে অবস্থান নেয় নব্য জেএমবির সদস্যরা। ১৬ আগস্ট পুলিশের অভিযানের সময় হোটেলের একটি কক্ষে থাকা সাইফুল ইসলাম বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হন।
মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ওই বিস্ফোরণে ব্যবহৃত বোমাটি তিনি তৈরি করে সাইফুলের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ওই মামলায় তাকে দ্বিতীয় আসামি করা হয়।
২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার হন মামুন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি মামুনসহ ১১ জনকে খালাস দেন সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। আদালত রায়ে বলেন, প্রসিকিউশন অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি।
তবে খালাসের আগে জামিনে মুক্ত হয়ে যাওয়ায় মামুনের গতিবিধি নিয়ে নতুন করে নজরদারি শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনায় বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের পর মামুনের নেটওয়ার্কের বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়। ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার শেখ আল-আমিন ওরফে রাজিব ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদে মামুনের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
এরপর গত ১৬ আগস্ট ঢাকার ডেমরা থেকে জুয়েল ভূঁইয়া ও আরিফ চৌধুরী নামে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা মামুনের সহযোগী বলে দাবি করেছে এটিইউ। জুয়েল এর আগে ২০২৪ সালে নরসিংদী কারাগার থেকে পালানো জঙ্গিদের একজন ছিলেন। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কারাগারে থাকাকালীনই মামুনের সঙ্গে জুয়েলের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। জামিনে বের হওয়ার পর দুজনের যোগাযোগ আবার সক্রিয় হয়।
মামুনকে ঘিরে সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার ও অভিযানে নব্য জেএমবির একটি পুনর্গঠিত নেটওয়ার্কের তথ্য পাওয়ার দাবি করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সাভারে সায়ানাইড উদ্ধারের বিষয়টি সেই তদন্তকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে।
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, মামুনই কি এই নেটওয়ার্কের মূল সংগঠক, নাকি তার আড়ালে আরও কেউ সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সেই উত্তর খুঁজতেই এখন নজরদারি, গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাচ্ছে সিটিটিসি ও এটিইউ।






