বলিউড বাদশা হয়ে উঠার নেপথ্যে যতো চরিত্র

রোম্যান্টিক নায়ক থেকে প্রতিশোধপরায়ণ প্রেমিক, কখনও দেশপ্রেমিক সেনা, কখনও আবার ঠাণ্ডা মাথার খলনায়ক— তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে পর্দায় একের পর এক মনে রাখার মতো চরিত্রে অভিনয় করেছেন শাহরুখ খান। ২ নভেম্বর জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক তার অভিনয় জীবনের এমন কিছু চরিত্র, যেগুলি তাকে শুধু জনপ্রিয়তার শিখরেই পৌঁছে দেয়নি বরং বলিউডের ‘বাদশা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
‘বাজিগর’ (১৯৯৩) (অজয় শর্মা): এই ছবিতে দ্বৈত চরিত্রে দেখা গিয়েছিল শাহরুখকে। অজয় শর্মা ও ভিকি মালহোত্রা— দ্বৈত পরিচয় ছিল তার। বাবার সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে একের পর এক বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেয় অজয়। নায়ক হয়েও খলনায়কের মতো কাজ করা এই চরিত্রে অভিনয় করে শাহরুখ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি চেনা নায়কোচিত ছকের বাইরে যেতেও প্রস্তুত। তার সেই ছবির একাধিক সংলাপ ও গান, আজও দর্শকের মনে গেঁথে আছে।
‘ডর’ (১৯৯৩) (রাহুল মেহরা): “কি…কি… কিরণ”— এই সংলাপ বললেই মনে পড়ে যায় ‘ডর’ ছবির রাহুল মেহরাকে। এক তরুণীর প্রতি একতরফা আকর্ষণ, তার প্রতি ভয়ঙ্কর আবেশে ডুবে থাকা রাহুলের চরিত্রে শাহরুখের অভিনয় ছিল শিউরে ওঠার মতো। রীতিমতো গায়ে কাঁটা দেয় এই চরিত্র। পর্দায় নেতিবাচক চরিত্র যে সমানে সমানে নায়কের সঙ্গে টক্কর দিতে পারে, এই ছবি তারই প্রমাণ। এখনও ‘ডর’ বললে দর্শক শাহরুখের চরিত্রের কথাই প্রথম মনে করেন।
‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে’ (১৯৯৫) (রাজ): পর্দায় প্রেমের গল্প ভালবাসেন, অথচ এই ছবি দেখেননি বা পছন্দ করেন না, এমন সিনেমাপ্রেমী খুঁজে পাওয়া কঠিন। মুম্বাইয়ের মারাঠা মন্দির প্রেক্ষাগৃহে এই ছবি দেখানো হয়, রোজ, গত ৩০ বছর ধরে। যে কোন তারকার জীবনে এ বড় পাওনা। শাহরুখ খানের কথা উঠলে প্রথম দিকেই মনে পড়ে রাজ মালহোত্রার কথা। আদিত্য চোপড়ার পরিচালনায় এই ছবির প্রেমিক রাজের মাধ্যমে এক নতুন পরিচয় তৈরি করেন শাহরুখ। ইউরোপের ট্রেনযাত্রা থেকে পাঞ্জাবের সর্ষেখেত— রাজের প্রেম, দুষ্টুমি আর পরিবারের প্রতি সম্মান আজও দর্শকের মনে অমলিন। এই ছবিই তাকে রোম্যান্টিক হিরো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ (১৯৯৮) (রাহুল): কলেজের তিন বন্ধু, প্রেম, অভিমান, মন ভাঙার পরে ঘুরে যাওয়া জীবনের মোড়— ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ ছবি প্রেমের থেকেও বেশি যেন বন্ধুত্বের গল্প বলে। ‘পেয়ার দোস্তি হ্যায়’— এই সংলাপের মধ্যেই যেন ধরা পড়েছিল রাহুলের চরিত্র। কলেজ জীবনের বন্ধুত্ব, প্রেম এবং বিচ্ছেদের গল্পে শাহরুখের রাহুল হয়ে উঠেছিল নব্বইয়ের দশকের তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি। কাজল ও রানি মুখার্জি সঙ্গে তার রসায়ন ছবিটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল। উল্লেখ্য ছবির গানও।
‘দিল সে…’ (১৯৯৮) (অমর): মণি রত্নমের ‘দিল সে…’ ছবিতে শাহরুখের চরিত্রের নাম ছিল অমরকান্ত ভার্মা। পেশায় রেডিও সাংবাদিক অমর কাজের সূত্রে পৌঁছায় উত্তর-পূর্ব ভারতে। সেখানে এক রহস্যময়ী নারীর প্রেমে পড়ে যায় অমর। সেই চরিত্রে ছিলেন মনীষা কৈরালা। এক অসম্ভব প্রেমের টানাপড়েন, আবেগ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে এগোয় ছবির গল্প। রোম্যান্টিক হিরোর চেনা ছক ভেঙে এই ছবিতে শাহরুখের অভিনয় ছিল অনেক বেশি জটিল ও সংযত। তবে প্রতি পদে তার অভিব্যক্তি দর্শকের নজর কেড়েছে। এছাড়া ছবির গানও জনপ্রিয়তা পায়।
‘মহব্বতেঁ’ (২০০০) (রাজ আরিয়ান মালহোত্রা): একই ছবিতে শাহরুখ খান ও অমিতাভ বচ্চন। সেই সঙ্গে তিনটি নতুন জুটি। এক অন্য ধরনের প্রেমের গল্প বলে এই ছবি। গুরুকুলের কঠোর নিয়মের বিরুদ্ধে ভালবাসার বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছিল রাজ আরিয়ান মালহোত্রা। অমিতাভের নারায়ণ শঙ্করের বিপরীতে শাহরুখের চরিত্রটি ছিল আবেগ ও আদর্শের লড়াইয়ের প্রতীক। এই রাজ আদতে নারায়ণের মৃত মেয়ের প্রেমিক। চোখ বন্ধ করলেই প্রেমিকাকে দেখতে পায় রাজ। শাহরুখের বিপরীতে ছিলেন ঐশ্বরিয়া রায় বচ্চন। জীবনের ওপারেও প্রেমের হাত ছাড়েনি সে। প্রেমকে ভয় না পেয়ে তাকে উদ্যাপন করার বার্তা দিয়েছিল রাজের চরিত্র।
‘জোশ’ (২০০০) (ম্যাক্স): এই ছবিতে খানিক মিশ্র চরিত্রে দেখা গিয়েছিল তাকে। ‘জোশ’-এ ম্যাক্স ডায়াস চরিত্রে শাহরুখ ছিলেন গোয়ার এক মাস্তান দলের নেতা। তার বোনের চরিত্রে ছিলেন ঐশ্বরিয়া রায় বচ্চন। প্রেম, বন্ধুত্ব এবং দুই গোষ্ঠীর সংঘাতের গল্পে ম্যাক্সের চরিত্রে শাহরুখের দাপুটে উপস্থিতি ছিল ছবির অন্যতম আকর্ষণ। রোম্যান্টিক হিরোর বাইরে অন্য চরিত্রেও যে তিনি পর্দায় সমান সাবলীল, তা বুঝিয়ে দিয়েছিল এই ছবি।
‘দেবদাস’ (২০০২) (দেবদাস): শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসকে আধুনিক বলিউডি ঢঙে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন সঞ্জয় লীলা বানসালি। মুখ্য চরিত্রকে সিনেমপ্রেমীদের মনে আবার উজ্জ্বল করেছেন শাহরুখ খান। পার্বতীকে হারানোর যন্ত্রণা, মদে ডুবে থাকা এবং আত্মবিনাশের পথে এগিয়ে চলা দেবদাসের চরিত্রে তার অভিনয় দর্শককে আবেগতাড়িত করেছিল। ঐশ্বরিয়া রায় বচ্চন ও মাধুরী দীক্ষিতের সঙ্গে তার অভিনয় ছবিটিকে আজও স্মরণীয় করে রেখেছে।
‘স্বদেশ’ (২০০৪) (মোহন ভার্গব): নাসা-র বিজ্ঞানী মোহন ভার্গবের চরিত্রে শাহরুখকে দেখা গিয়েছিল একেবারে অন্য রূপে। শাহরুখ অনুরাগী তো বটেই, অনেক সিনেমাপ্রেমীই একবাক্যে স্বীকার করেন যে এই ছবি তার কেরিয়ারের অন্যতম মাইলফলক! বিদেশের ঝকঝকে জীবন ছেড়ে নিজের দেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামে ফিরে এসে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার গল্প ‘স্বদেশ’। এখানে কোন অতিনাটকীয় নায়কোচিত ভঙ্গি নেই। বরং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক সংবেদনশীল মানুষের চরিত্রে শাহরুখের অভিনয় ছবিটিকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।
‘বীর-জারা’ (২০০৪) (বীর প্রতাপ সিং): ভারতীয় বায়ুসেনার স্কোয়াড্রন লিডার বীর প্রতাপ সিংহ। পাকিস্তানের জারা হায়াত খানের প্রেমে পড়ে জীবনের একটা বড় অংশ কাটিয়ে দেয় কারাগারে। যশ চোপড়ার ‘বীর-জারা’ ছবিতে বীরের চরিত্রে শাহরুখের অভিনয়ে ছিল প্রেম, ত্যাগ এবং অপেক্ষার মিশেল। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পরেও ভালবাসার প্রতি তার অবিচল বিশ্বাস দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। যুবক বয়স থেকে বৃদ্ধ হওয়া— বার বার পর্দার বীরের প্রেমে পড়েন দর্শক।
‘ম্যায় হুঁ না’ (২০০৪) (রাম): ফারাহ খানের পরিচালনায় শাহরুখের অভিনয়। ‘ম্যায় হুঁ না’ ছবিতে শাহরুখ ছিলেন মেজর রাম প্রসাদ শর্মা। সেনা অফিসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সৎ ভাইয়ের সঙ্গে ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর চেষ্টা করে সে। ছদ্মবেশে কলেজের ছাত্র সেজে থাকা, অধ্যাপিকার প্রেমে পড়ার পাশাপাশি অ্যাকশন, কমেডি, আবেগ— সব মিলিয়ে রাম হয়ে উঠেছিল শাহরুখের অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র।
‘ডন’ (২০০৬) (ডন): অমিতাভ বচ্চন অভিনীত জনপ্রিয় ‘ডন’ ছবি পুনরায় তৈরি করেছিলেন ফারহান আখতার। মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শাহরুখ। তার দ্বৈত পরিচয়— ডন এবং বিজয়। এক দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধজগতের ধূর্ত মাথা, অন্য দিকে সাধারণ এক মানুষ। ধূর্ততা, আত্মবিশ্বাস আর রহস্যময় উপস্থিতিতে শাহরুখের ডন হয়ে উঠেছিল দর্শকের কাছে এক আলাদা আকর্ষণ। ছবির সংলাপও জনপ্রিয়তা পায়। অমিতাভ অভিনীত চরিত্রকে নিজের মতো করে পর্দায় ফুটিয়ে তুলে বেশ প্রশংসিত হয়েছিলেন।
‘চক দে! ইন্ডিয়া’ (২০০৭) (কবীর খান): ভারতীয় মহিলা হকি দলের কোচ কবীর খান। একসময় জাতীয় দলের হয়ে খেলা এই খেলোয়াড়কে দেশদ্রোহিতার অপবাদ নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল। পরে মহিলা হকি দলকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নেয় সে। কবীরের কঠোর শাসন, একাগ্রতা এবং দলের প্রতি দায়বদ্ধতা শাহরুখের ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অভিনয় হয়ে রয়েছে। এই ছবির প্রতি পরতে যেন তার চোখ কথা বলেছে। শাহরুখের কর্মজীবনের অন্যতম জরুরি ও উল্লেখযোগ্য ছবি। যেখানে তিনি কোনও রোম্যান্টিক নায়ক নন, অ্যাকশন হিরো নন— কেবল চোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে চলা প্রশিক্ষক।
‘জওয়ান’ (২০২৩) (বিক্রম রাঠৌর ও আজাদ) : অ্যাটলি পরিচালিত এই ছবিতে মূলত দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শাহরুখ খান। এছাড়া চিত্রনাট্যের তাগিদে একাধিক অবতারে দেখা গিয়েছিল তাকে। ক্যাপ্টেন বিক্রম রাঠৌর ও তার ছেলে আজাদ— দুই প্রজন্মের দুই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই, সামাজিক অসাম্য এবং দুর্নীতির প্রশ্নকে কেন্দ্র করে তৈরি ছবিতে তার অ্যাকশন ও আবেগঘন অভিনয় দর্শকের নজর কেড়েছিল। আলোচনায় এসেছিল ছবির গল্প। অনেকেই দাবি করেছিলেন, এই ছবির সংলাপে তার ব্যক্তিগত জীবনের ছায়া আছে।
২০২৩ সালে তিনটি ছবি মুক্তি পায় তার। তবে তার পর থেকে বড়পর্দায় দেখা যায়নি তাকে। তার প্রত্যাবর্তন হবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে। বড়দিনের মরসুমে মুক্তি পাবে বহু প্রতীক্ষিত ‘কিং’। ইতিমধ্যেই ছবিতে তার ‘লুক’ প্রকাশ্যে এসেছে। শুরু হয়েছে আলোচনাও। বাবার সঙ্গে বড়পর্দায় পা রাখবেন তারকা কন্যা সুহানা খানও। অনুরাগীরা অপেক্ষায় আবারও নয়া অবতারে শাহরুখকে পর্দায় দেখার জন্য।






