মতামত

কেন থামছে না সৌদি আরব আর হুতিদের যুদ্ধ, প্রভাব বাংলাদেশেও

কেন থামছে না সৌদি আরব আর হুতিদের যুদ্ধ, প্রভাব বাংলাদেশেও
অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন

ছুটিতে দেশে এসেছিলেন বগুড়ার শাজাহানপুরের মাদলা গ্রামের শাহেদ আহমদ। ভাই মারা যাওয়ার পর তার দেশে আসা। জেদ্দায় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে প্লাম্বারের কাজ করতেন, ছুটি শেষ হওয়ায় কাজে ফিরছিলেন। রিয়াদে নেমে জেদ্দার ফ্লাইটের জন্য বসে ছিলেন। একই জায়গায় অপেক্ষা করছিলেন কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের হাফেজ মুফতি মোহাম্মদ নাসরুল্লাহ বদরপুরি। তিনি ছিলেন ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের জামিয়া রবিউল উলুম মাদ্রাসার একজন শিক্ষক। তিনি গিয়েছিলেন ওমরাহ করতে।

১০ অক্টোবর বিকেল সোয়া তিনটার দিকে রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩-এ ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়ে। হামলা চালায় ইয়েমেনের হুতিরা। শাহেদ আর নাসরুল্লাহ দুজনেই মারা যান।

সেদিন মোট ১৩ জন মারা গেছেন, আহত তিনশোর বেশি। মৃতদের চারজন সৌদি নাগরিক। বাকিরা বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া আর সুদানের মানুষ। আহতদের মধ্যে বাংলাদেশি ২৪ জন। এর ১৩ জন ওমরাহ করতে গিয়েছিলেন, ১১ জন সৌদিতে কাজ করেন।

রিয়াদ বিমানবন্দরে নিহত ২ বাংলাদেশি

পরদিন আবার একই বিমানবন্দরে হামলা হয়। এবার মারা যান এক পাকিস্তানি।

প্রবাসীদের ঘাড়ে নতুন আরেকটি যুদ্ধ

সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশিরা এ বছর ফেব্রুয়ারি থেকেই ভয়ের মধ্যে আছেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে আঘাত করেছে। তেল শোধনাগার আর নানা স্থাপনা ছিল লক্ষ্য। এসব জায়গায় কাজ করেন অনেক বাংলাদেশি।

এখন দক্ষিণ দিক থেকে আসছে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন। একদিকে ইরান, অন্যদিকে ইয়েমেন। দুই দিকের আগুনের মাঝে আটকে পড়েছেন প্রবাসীরা।

রিয়াদের হামলার এক সপ্তাহ আগেই, ৪ অক্টোবর, পূর্বাঞ্চলের আল খুরাইসে আরামকোর একটি স্থাপনায় হুতি হামলায় মারা যান কুমিল্লার সজিব হোসেন। এক সপ্তাহে তিনজন বাংলাদেশির লাশ ফেরার অপেক্ষায়।


এই আগুন কেবল কাজের জায়গায় থেমে নেই। বিমানবন্দর আর তেলের স্থাপনাই এখন হুতিদের প্রধান লক্ষ্য। দেশে ছুটিতে আসা শ্রমিক, ওমরাহ যাত্রী, সবাইকে এই বিমানবন্দর দিয়েই আসা-যাওয়া করতে হয়। কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে নাগরিকদের সৌদি ভ্রমণে সতর্ক করেছে। আর যাঁরা সেখানে কাজ করেন, তাদের পাঠানো টাকায় দেশে অনেক সংসার চলে। চাকরি ছেড়ে চলে আসার সুযোগ তাদের বেশির ভাগেরই নেই।

যে যুদ্ধে এই মানুষগুলো মারা গেলেন, সেটা শুরু হয়েছিল এগারো বছর আগে।

হুতিদের সঙ্গে সৌদির যুদ্ধ শুরুর ইতিহাস

২০১৪ সালে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয়। হুতিরা উত্তর ইয়েমেনের জায়দি শিয়াদের সশস্ত্র দল। তাদের ঘাঁটি সাদা প্রদেশে।

পরের বছর মার্চে সৌদি আরব কয়েকটি দেশকে নিয়ে জোট বাঁধে। তারা ইয়েমেনের সরকারের পক্ষে যুদ্ধে নামে। সৌদি আরব ভেবেছিল কয়েক সপ্তাহে হুতিদের হটানো যাবে, কিন্ত এগারো বছর পরও হুতিরা সানায় আছে।

ইরান হুতিদের অস্ত্র দেয়, এমন অভিযোগ অনেক দিনের। এ কারণে অনেকে এই লড়াইকে ইরান আর সৌদি আরবের ‘ছায়াযুদ্ধ’ বলেন।

২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়। বড় লড়াই থেমে যায়। তবে হুতিদের এলাকার বন্দর আর সানা বিমানবন্দরে সৌদি আরব কড়াকড়ি রেখে দেয়। হুতিরা একে বলে অবরোধ। খাবার, ওষুধ আর জ্বালানি ঢুকতে সমস্যা হয় এই কড়াকড়ির কারণে।

যেভাবে আবার সংঘাত শুরু

এ বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি নিহত হন। তাঁর জানাজায় যোগ দিতে হুতিদের একটি দল ইরানের মাহান এয়ারের বিমানে তেহরানে যায়। দশ বছরের বেশি সময় পর এটাই ছিল তেহরান থেকে সানায় প্রথম ফ্লাইট। ইয়েমেন সরকার এর অনুমতি দেয়নি।

১৩ জুলাই দলটি ফিরছিল। বিমান যেন নামতে না পারে, সে জন্য সানা বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলা হয়। ইয়েমেন সরকার হামলার দায় নেয়। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, সরকারের অনুরোধে হামলা করেছে সৌদি আরব। বিমানটি সানায় নামতে না পেরে লোহিত সাগরের পাড়ের শহর হুদাইদায় নামে।

সেদিনই হুতিরা সৌদি আরবের আবহা বিমানবন্দরে হামলা চালায়। হুতি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, উত্তেজনা কমানোর দিন শেষ। ২০ জুলাই হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সাগর আর আকাশপথে অবরোধ ঘোষণা করে।

পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে

৩ সেপ্টেম্বর হুতিরা ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর ওপর হামলা শুরু করে। তারা পশ্চিম উপকূলের কিছু এলাকা দখল করে নেয়। এতে বাব-এল-মান্দেব প্রণালীর কাছে তাদের হাত পৌঁছে যায়। লোহিত সাগরে ঢোকার মুখ এই প্রণালী। বিশ্বের অনেক জাহাজ এ পথে চলে।

সৌদি আরবের তেলের পাইপলাইন আর তেল স্থাপনাতেও হামলা হয়েছে। জবাবে সৌদি বাহিনী ইয়েমেনে শত শত বিমান হামলা চালিয়েছে।

৫ অক্টোবর সৌদি আরবের সহায়তায় ইয়েমেন সরকার নতুন অভিযান শুরু করে। নাম ‘অপারেশন ডন অব ইয়েমেন’। লক্ষ্য সানা ফিরে পাওয়া। পাকিস্তান আর তুরস্ক সৌদি আরবে সেনা পাঠানোর কথা দিয়েছে। এরপরই রিয়াদ, আবহা, জিজান আর নাজরানের বিমানবন্দরে একের পর এক হামলা আসে।

নতুন করে এই সংঘাতে লাভ কার?

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, আরব উপদ্বীপের এই উত্তেজনায় লাভ হবে শুধু ইসরায়েলের। এটা ইরান সরকারের মত।

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট পেপ অনেক দিন ধরে ‘এসকালেশন ট্র্যাপ’ বা সংঘাতের ফাঁদ নিয়ে লিখছেন। তার মতে, সৌদি আরব ইয়েমেনে নিজেই এমন ফাঁদে পড়েছে, যেখানে প্রতিটি হামলা পরের হামলা ডেকে আনে। তিনি মনে করেন, সৌদি বাহিনী মাটিতে লড়ে সানা দখল করতে পারবে না। মিসর ৭০ হাজার সেনা নিয়েও এই পাহাড়ি এলাকায় পারেনি, সৌদি আরবও সাত বছরে পারেনি।

পেপ আরও লিখেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গোপনে ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্য নিচ্ছে। তার ভাষায়, এটা টিকে থাকার লেনদেন, বন্ধুত্ব নয়।

অন্যদিকে সিএনএন লিখেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রও পূর্ব দিক থেকে সৌদি আরবে আঘাত করেছে। হুতিদের পেছনে ইরানের ইন্ধনের কথাও অনেক বিশ্লেষক বলছেন। কে কাকে কোন ফাঁদে ফেলেছে, তা নিয়ে তর্ক চলবে। নিহত হওয়া বাংলাদেশের শাহেদ বা নাসরুল্লাহর পরিবারের কাছে ওইসব তর্কের কোনো মানে নেই।

থামার একটা সুযোগ

রোববার (১১ অক্টোবর) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানকে ফোন করেছেন। সৌদি আরব আর হুতিদের মধ্যে আলোচনা শুরু করাতে সাহায্যের প্রস্তাব দেন তিনি, এটি খুবই ভাল একটা সংবাদ। সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ ফোনালাপের কথা জানিয়েছে, তবে প্রস্তাবে রাজি কি না বলেনি।

২০২২ সালে একটা সমঝোতা কয়েক বছর শান্তি এনেছিল। অবরোধ কিছুটা শিথিল হবে, হামলা বন্ধ থাকবে, এমন একটা চুক্তিতে আবার ফেরা অসম্ভব নয়। জাতিসংঘ আর আশপাশের দেশগুলো যত দেরি করবে, মৃত্যু আর সংঘাতের তালিকায় নাম তত বাড়বে।

রিয়াদের কিং আবদুল্লাহ হাসপাতালের আইসিইউতে এখন শুয়ে আছেন ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের হাফেজ হাসান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাজী নুরুল্লাহ আর প্রবাসী শ্রমিক ওমর ফারুক। পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে মৃতের তালিকা লম্বা হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে পাঠানো রেমিট্যান্সেও প্রভাব পড়বে।

বিষয়:বদরপুরি মুফতি মোহাম্মদ নাসরুল্লাহ বদরপুরি রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা হুতিদের সঙ্গে সৌদির যুদ্ধ শুরুর ইতিহাস হুতিদের হামলা

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…