তিন বছর ধরে কুক দ্বীপপুঞ্জে আটকা শ্রীলঙ্কার রুচিরা, ফিরতে পারছেন না ভিসা জটিলতায়

ছবি: সংগৃহীত
ছেলের বিয়ে, অসুস্থ মায়ের কাছে ফেরা সবই যেন অনিশ্চয়তায় আটকে গেছে রুচিরা রানাসিংহার জীবনে। নিজ দেশে ফিরতে চান ৫০ বছর বয়সী এই নারী, কিন্তু নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার ট্রানজিট ভিসা না পাওয়ায় গত তিন বছর ধরে প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট্ট কুক আইল্যান্ডসে আটকে আছেন তিনি। দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে প্রয়োজনে হাতকড়া পরিয়ে পাঠানোর অনুরোধও জানিয়েছেন শ্রীলঙ্কার এই নারী।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
রুচিরা নিউজিল্যান্ডে বসতি গড়তে চেয়েছিলেন। সেখানে আশ্রয় চাওয়ার পর তিনি এক অভিবাসন পরামর্শকের পরামর্শ মেনে ওয়ার্ক ভিসার আবেদন করতে সাময়িকভাবে দেশ ছেড়েছিলেন। কিন্তু কুক দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর পর তার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। আর নিউজিল্যান্ড ছেড়ে দেওয়ায় তিনি তার বিদ্যমান আশ্রয়-সংযুক্ত ভিসার শর্তও ভঙ্গ করেন।
এখন নিউজিল্যান্ড তাকে শ্রীলঙ্কায় ফেরার ফ্লাইটের জন্য প্রয়োজনীয় ট্রানজিট ভিসা দিতে অস্বীকার করছে। অস্ট্রেলিয়াও অস্বীকার করেছে। কুক দ্বীপপুঞ্জ থেকে তার যাওয়ার বাকি আন্তর্জাতিক গন্তব্য তাহিতি ও হাওয়াই দুটোর ক্ষেত্রেই ভিসা প্রক্রিয়ার আগে নিউজিল্যান্ডে গিয়ে বায়োমেট্রিক তথ্য দিতে হবে। ফলে তার চলে যাওয়ার কোনো বাস্তব পথ নেই।
রুচিরা বলেন, তার একমাত্র ছেলের বিয়ে নভেম্বরে, আর তিনি সেখানে থাকতে চান। তার মা তাকে নিয়ে এতটাই চিন্তিত যে বারবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, তিনি শুধু বাড়ি ফিরতে চান, তারা যা করতে বলবেন তিনি তাই করবেন।

রুচিরা ২০১৮ সালে শ্রীলঙ্কা ছাড়েন। ব্যবসায় লোকসানের কারণে তার ছোট টি-শার্ট কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। ঋণ শোধে হিমশিম খেয়ে তিনি হংকংয়ে গিয়ে প্রবীণ ও শিশুদের সেবাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। তার ভাই বিবিসিকে জানিয়েছেন, রুচিরা তখন প্রচণ্ড আর্থিক চাপে ছিলেন। তার স্বামী ছিলেন মাদকাসক্ত, প্রায় সাত বছর আগে তিনি মারা যান।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে রুচিরা নিউজিল্যান্ডে যান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দুই মাসের ভিজিট ভিসায় এক আত্মীয়ের কাছে ছিলেন। ভিসার মেয়াদ শেষের কাছাকাছি এলে এক অভিবাসন দোভাষী তাকে শ্রীলঙ্কায় ঋণদাতাদের হুমকির কারণ দেখিয়ে আশ্রয়ের আবেদন করতে সাহায্য করেন। তিনি আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে এক বছরের জন্য প্রায় যেকোনো নিয়োগকর্তার অধীনে কাজের অনুমতি দেওয়া একটি ওপেন ওয়ার্ক ভিসা পান। একটি রেস্তোরাঁয় কাজ পান তিনি, যা শেষ পর্যন্ত তার কর্মসংস্থান ভিসার স্পনসর হতে রাজি হয় যা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতি দেবে বলে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু আশ্রয়প্রার্থীরা সাধারণত তাদের আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকা অবস্থায় অন্য ভিসার আবেদন করতে পারেন না, তাই সেটি প্রত্যাখ্যাত হয়।
এরপর তিনি ইমিগ্রেশন অ্যান্ড সেক্রেটারিয়াল সার্ভিসেস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার দাবি, প্রতিষ্ঠানটি তাকে বলেছিল দেশের বাইরে থেকে কর্মসংস্থান ভিসার নতুন আবেদন করা যাবে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক সিলভিয়ান গ্যালান্ট বলেছিলেন, রুচিরা দেশ ছাড়লেই তিনি প্রক্রিয়া শুরু করবেন। তাই আবেদনটি করার সময়টুকু তিনি কুক দ্বীপপুঞ্জে সংক্ষিপ্ত সফরে যান।
কর্মসংস্থান ভিসা আবারও প্রত্যাখ্যাত হয়। আর নিউজিল্যান্ড ছেড়ে দেওয়ায় তিনি বিদ্যমান ভিসার শর্ত ভঙ্গ করেন। নিউজিল্যান্ড কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ভবিষ্যতে তাকে কোনো ভিসা দেওয়া হবে না। রুচিরার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্যালান্ট তার পক্ষে নানা হস্তক্ষেপের দাবি করেছিলেন, এমনকি তৎকালীন অভিবাসনমন্ত্রী ক্রিস পেঙ্কসহ রাজনীতিকদের চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গ্যালান্ট স্বীকার করেন পরিস্থিতিটি তার দোষে হয়েছে এবং বলেন, তিনি আর কিছু করতে পারবেন না বাড়ি ফিরে যাওয়াই রুচিরার জন্য ভালো হবে।
কিন্তু শ্রীলঙ্কার এয়ার নিউজিল্যান্ডের টিকিট হাতে বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাকে বলা হয়, নিউজিল্যান্ড ট্রানজিট ভিসা ছাড়া তিনি ফ্লাইটে উঠতে পারবেন না। নিউজিল্যান্ড ট্রানজিট ভিসার তিনটি আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। কর্তৃপক্ষ বলেছে, তিনি নিউজিল্যান্ড ছেড়ে যাবেন বলে তারা নিশ্চিত নয়। অস্ট্রেলিয়ার ট্রানজিট ভিসার চারটি আবেদনও প্রত্যাখ্যাত হয়।
একটি প্রত্যাখ্যানপত্রে নিউজিল্যান্ড তাকে অন্য পথ খুঁজতে পরামর্শ দেয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই অঙ্গরাজ্য ও ফরাসি পলিনেশিয়ার দ্বীপ তাহিতি দুটোই জানায়, যেকোনো ভিসা প্রক্রিয়ার আগে তাকে বায়োমেট্রিক তথ্য দিতে হবে, আর তা কেবল নিউজিল্যান্ডে সশরীরে গিয়েই দেওয়া যায়। বিকল্প পথগুলোর সব বিবরণ, ছেলের আসন্ন বিয়ে ও মায়ের অবনতিশীল স্বাস্থ্যের কথা জানিয়ে করা তাঁর সর্বশেষ আবেদনটিও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
বর্তমানে কুক আইল্যান্ডসে একটি হোটেলের কর্মীদের থাকার জায়গায় বিনা ভাড়ায় থাকছেন রুচিরা। স্থানীয় বাসিন্দারাও তাকে খাবার ও পোশাক দিয়ে সহায়তা করছেন। হোটেলের একজন পরিচালক তাকে একটি সেলাই মেশিনও দিয়েছেন। সেটি দিয়ে কিছু কাজ করে সামান্য আয় করছেন তিনি।

তবে এসব সহায়তা তার দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক চাপ কমাতে পারছে না। রুচিরা বলেন, এ পরিস্থিতির কারণে তার স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যেকোনো সময় তার কিছু হয়ে যেতে পারে বলে ভয় পাচ্ছেন তিনি।
নিউজিল্যান্ডের অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞ অ্যালিস্টার ম্যাকক্লিমন্টের মতে, রুচিরা অভিবাসন বিষয়ে ভুল পরামর্শ পেয়েছিলেন। প্রকৃত অভিবাসন আইনজীবীর কাছ থেকে এমন পরামর্শ আসার কথা নয়। অনেক তথাকথিত অভিবাসন পরামর্শক ঝুঁকি সম্পর্কে ভালোভাবে না বুঝেই অর্থের বিনিময়ে ভিসার আবেদন করে থাকেন।
বিবিসি ওই পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক সিলভিয়ান গ্যালান্টের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
নিউজিল্যান্ডের অভিবাসন বিভাগ বিবিসিকে জানিয়েছে, রুচিরার ট্রানজিট ভিসার একাধিক আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কারণ, তিনি নিউজিল্যান্ড হয়ে অন্য দেশে যাওয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে ভ্রমণ করবেন এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হতে পারেনি।
এমনকি রুচিরা হাতকড়া পরিয়ে ও নিরাপত্তাকর্মীর পাহারায় পাঠানোর প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। দেশটির অভিবাসনমন্ত্রীর দপ্তরের এক প্রতিনিধি বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থা থাকলেও কোনো ব্যক্তি আশ্রয়ের আবেদন করতে পারেন।
অন্যদিকে, রুচিরার পরিবার তাকে দেশে ফেরাতে শ্রীলঙ্কা সরকারের সহায়তা চেয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবিসিকে জানিয়েছে, কুক আইল্যান্ডস থেকে রুচিরাকে দেশে ফেরাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডে শ্রীলঙ্কার হাইকমিশনের কর্মকর্তারা এবং সংশ্লিষ্ট নিউজিল্যান্ড কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কাজ করছেন।
তবে রুচিরার ভাই, বোনের মানসিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বিবিসিকে বলেন, একবার কথা বলার সময় তার বোন জানিয়েছিলেন, তাকে জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে নিতে না পারলে অন্তত তার মরদেহ যেন দেশে পাঠানো হয়।






