অন্যান্য খেলা

‘হকি বিশ্বকাপে খেলা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়’

বলছেন জাতীয় দলের ম্যানেজার রাহুল রায়

‘হকি বিশ্বকাপে খেলা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়’

সম্প্রতি ভারতের পাঞ্জাবে এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলে ফিরেছে বাংলাদেশ হকি দল। আসরে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি দলটি। গ্রুপপর্বে চীনের বিপক্ষে ড্র ছিল বাংলাদেশের বলার মতো সাফল্য। তবে দলটিকে নিয়ে বেশ আশাবাদী ম্যানেজার রাহুল রায়। দেশে ফিরে শনিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে আশার ফানুস ওড়ানো বিষয়গুলো তুলে ধরেন তিনি।

রাহুল রায় লিখেছেন, ‘আমি এখন পুরোদস্তুর সাংবাদিক কিন্তু স্পোর্টস, বিশেষ করে হকি আমার হৃদয়ের স্পন্দন। অনেকদিন পর আবার লাল-সবুজের পতাকা, খেলার আগে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ আহ্, কী অসাধারণ এক অনুভূতি!’

‘এর আগে আমি ছিলাম জাতীয় হকি দলের একজন খেলোয়াড়। এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা— পুরো দলের দায়িত্বে। খেলোয়াড়দের অনুশীলন, ম্যাচ প্রস্তুতি, সার্বিক তদারকি, এশিয়ান হকি ফেডারেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা দায়িত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল নতুন, চ্যালেঞ্জিং, একইসঙ্গে ভীষণ উপভোগ্য। মাঠের বাইরে থেকেও যে খেলার সঙ্গে এত গভীরভাবে যুক্ত থাকা যায়, এই অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে।’

‘পাঞ্জাবের জলন্ধরে হকি শুধু একটি খেলা নয়, এটি এক আবেগের নাম। আর সেই আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রথম প্রতিপক্ষ ‘এশিয়ার জায়ান্ট’ ভারত। বর্ণিল উদ্বোধনী আয়োজন, হাজার হাজার স্থানীয় দর্শকের উন্মাদনা আর স্বাগতিকদের প্রবল চাপের সামনে প্রথম ম্যাচেই আমরা কিছুটা বিপর্যস্ত। কিন্তু একটি ম্যাচের পরাজয়ই যে পুরো গল্প নয়, সেটি তখনও আমাদের বিশ্বাস ছিল।’

‘একটি সংগঠন, প্রতিষ্ঠান কিংবা জাতীয় দল যেকোনো ক্ষেত্রেই একটি পরিবার হয়ে ওঠা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটাতে হয়েছে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে। দিনের পুরোটা সময়ই হোটেলে অবস্থান। এমন পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে উজ্জীবিত রাখা, হতাশা কাটিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং সবাইকে একটি অভিন্ন লক্ষ্যে একত্রিত করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।’

‘প্রথম ম্যাচের পর হতাশা ছিল, ছিল মানসিক বিপর্যয়ও। কিন্তু আমরা থেমে থাকিনি। ভিডিও সেশন, নিজেদের ভুল বিশ্লেষণ, পারস্পরিক আলোচনা আর নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ধীরে ধীরে আমরা হয়ে উঠছিলাম একটি পরিবার।’

‘এরপর জাপানের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচ- মাত্র দুই মাস আগে এশিয়ান গেমসে এই জাপানের কাছেই বাংলাদেশ হেরেছিল ৬-১ গোলে। অথচ এবার এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সেই জাপানের বিপক্ষে মাত্র ১-০ গোলের পরাজয়। দারুণ লড়াই, অসাধারণ প্রচেষ্টা, কিন্তু পয়েন্টটা আর পাওয়া হল না! ফলাফল আমাদের পক্ষে না এলেও পরের ম্যাচগুলোতেও ছেলেদের পারফরম্যান্সে আত্মবিশ্বাস ও উন্নতির ছাপ ছিল স্পষ্ট।’

‘চীনের বিপক্ষে ম্যাচ- এশিয়ান গেমসে চীনের কাছে বাংলাদেশের পরাজয় ছিল ৭-১ গোলে। সেই চীনের বিপক্ষেই এবার দুর্দান্ত লড়াই করে ১-১ গোলে ড্র। জয়টা হয়তো আমাদের প্রাপ্য ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত জয় ধরা দিল না। তবুও এই সমতাই ঐতিহাসিক। এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে প্রথমবারের মতো পয়েন্ট অর্জন করল বাংলাদেশ।’

‘এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে এশিয়ার শীর্ষ ছয়টি দল অংশ নেয়। পাকিস্তান অংশগ্রহণ না করায় বাংলাদেশ এই টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ পেয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলই বিশ্বকাপ খেলেছে। সুতরাং প্রতিপক্ষের শক্তি, প্রতিযোগিতার মান এবং আমাদের বর্তমান অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে দলের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা জরুরি।’

‘হকিকে শুধু গোলের ব্যবধান দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রথম ম্যাচের ফলাফল দিয়ে একটি দলের সামগ্রিক প্রচেষ্টা, প্রাণান্তকর লড়াই এবং অর্জনকে উপেক্ষা করাও উচিত নয়। মাঠে ছেলেদের অদম্য চেষ্টা, প্রতিকূলতার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের উন্নতি করার প্রয়াস এসবই আমাদের ভবিষ্যতের ভিত্তি।’

‘সমালোচনা হবেই, গঠনমূলক সমালোচনা হবে, উদ্দেশ্যমূলক সমালোচনা হবে, হয়তো বিদ্রুপাত্মক সমালোচনাও হবে। তবে সমালোচনার পাশাপাশি আমাদের ছেলেদের লড়াই, তাদের সীমাবদ্ধতা, সম্ভাবনা এবং অর্জনগুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একটি দলকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু ভুল ধরিয়ে দিলেই হবে না, তাদের পাশে দাঁড়ানোও জরুরি।’

‘আমি বিশ্বাস করি, একটি দল যখন সত্যিকার অর্থে একটি পরিবার হয়ে ওঠে, তখন তার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ঐক্য, আন্তরিকতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই সাফল্যের পথ তৈরি হয়। সবার সহযোগিতায় বাংলাদেশ হকি একদিন কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের ঠিকানায় পৌঁছাবে, এই বিশ্বাস আমার দৃঢ়।’

‘এই মুহূর্তে বিশ্ব হকির র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ২৮তম। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে ২৪টি দলের অংশগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। সেই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন নিঃসন্দেহে কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়।’

‘স্বপ্ন দেখতে হবে। স্বপ্নের জন্য পরিকল্পনা করতে হবে। আর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, সঠিক দিকনির্দেশনা, নিবেদিতপ্রাণ খেলোয়াড়, দক্ষ সংগঠক এবং হকির প্রতি ভালোবাসায় একতাবদ্ধ একটি পরিবার।’

‘জলন্ধর থেকে মোহালির এই অভিজ্ঞতা আমার কাছে শুধুই একটি টুর্নামেন্ট নয় এটি দায়িত্ব, আবেগ, উপলব্ধি এবং নতুন করে স্বপ্ন দেখার এক অনন্য অধ্যায়। খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার গর্ব এক রকম, আর পুরো দলের দায়িত্ব নিয়ে তাদের সাফল্য-ব্যর্থতার প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গী হওয়া সম্পূর্ণ অন্যরকম অনুভূতি।’

‘আমাদের পথচলা এখানেই শেষ নয়। বরং এখান থেকেই শুরু হোক নতুন অধ্যায়। লাল-সবুজের পতাকা উড়ুক বিশ্ব হকির মঞ্চে। জাতীয় সংগীতের সুরে আবারও গর্বে ভরে উঠুক আমাদের হৃদয়। বাংলাদেশ হকি এগিয়ে যাক। আমাদের স্বপ্ন বেঁচে থাকুক ২০৩০ বিশ্বকাপের পথে।’

বিষয়:এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জাতীয় হকি দলের ম্যানেজার রাহুল রায় হকি হকি বিশ্বকাপ

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…