গ্রেপ্তারের পর কারাগারে, নাকি রিমান্ডে, আওয়ামী নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে কী হচ্ছে?

ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি করা
গ্রেপ্তারের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের আদালতে হাজির করা হচ্ছে। মামলার ধরন, অভিযোগের গুরুত্ব ও তদন্তের প্রয়োজন বিবেচনায় কাউকে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে, আবার কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দেওয়া হচ্ছে রিমান্ডে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও নাশকতার অভিযোগে দায়ের করা মামলাগুলোতে এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে।
সর্বশেষ ৫ নভেম্বর সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ও অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর দাবি, অভ্যুত্থানের সময় তিনি পতিত সরকারকে সহযোগিতা করেছেন। একই দিনে ঢাকায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য দিলীপ কুমার আগরওয়ালার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। সেদিন সিরাজগঞ্জে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ছয় নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
রাজধানীর মিরপুরে ২ নভেম্বর শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে পুলিশের ওপর হামলা, ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে করা তিন মামলায় ২৬ জনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন ঢাকার আদালত। এর মধ্যে পল্লবী থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় ১৩ জন, বিস্ফোরক আইন ও দণ্ডবিধির মামলায় সাতজন এবং মিরপুর মডেল থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় ছয়জন রয়েছেন। এর আগে ডিবি পুলিশের বার্তায় জানানো হয়, শ্রমিক আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৩৩ কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
একই দিন যশোরের আটটি উপজেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ৪১ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাদের আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ১৭ জনের বিরুদ্ধে আগের দিন যশোর শহরে নিষিদ্ধ যুবলীগের মিছিলে অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাকিদের কেউ নাশকতা ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায়, আবার কেউ গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
এর আগে ২০ অক্টোবর রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় আওয়ামী লীগের তিন নেতাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। তারা হলেন ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোখলেছুর রহমান মিন্টু এবং আটঘরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র শহিদুল ইসলাম রতন। ১৯ অক্টোবর মোহাম্মদপুরের একটি বাসা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরদিন আদালতে হাজির করে তাদের কারাগারে রাখার আবেদন করে পুলিশ।
তবে গ্রেপ্তারের পর সবাইকে সরাসরি কারাগারে পাঠানো হচ্ছে, এমন নয়। গত ২৭ অক্টোবর রাজধানীর পল্টনে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১৪ নেতাকর্মীকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠান আদালত। তাদের বিরুদ্ধে সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছিল পুলিশ।
এ ছাড়া ২৮ অক্টোবর নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেত্রী ফাল্গুনী দাস টনি এবং টুঙ্গিপাড়া উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ওরফে সাজেদুর রহমান সোহানকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় দুই দিন করে রিমান্ডে পাঠানো হয়। তাদের প্রত্যেকের সাত দিন করে রিমান্ড চেয়েছিল পুলিশ।
রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানোর ঘটনাও রয়েছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানে মিছিলের ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড শেষে ২৪ আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
ঢাকায় একই ধরনের মামলায় গ্রেপ্তারের পর প্রথমে কারাগারে পাঠানো এবং পরে রিমান্ড শুনানির নজিরও রয়েছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করলেও সেদিন আদালত তাদের কারাগারে পাঠিয়ে রিমান্ড শুনানির জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করেন।

এ বিষয়ে সে সময় ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) মহিন উদ্দিন বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় আসামিদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং রিমান্ড শুনানির জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে।
এরপর ২২ সেপ্টেম্বর ওই চারজনের মধ্যে একজনের চার দিন এবং অন্য তিনজনের দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত, পলাতক সহযোগীদের গ্রেপ্তার এবং বিস্ফোরক উদ্ধারের জন্য আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহেও ঢাকায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলায় রিমান্ডের ঘটনা ঘটে। ২৩ সেপ্টেম্বর গুলশানে ককটেল বিস্ফোরণ ও নাশকতার অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় ১৫ জনকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠান আদালত। তাদের মধ্যে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ছিলেন।
ট্রাইব্যুনালের মামলায় কারাগারে শতাধিক নেতা
জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বিচারিক কার্যক্রমও এগোচ্ছে। ৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, শাহজাহান খান, ফারুক খান, আব্দুর রাজ্জাক, দীপু মনি, তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও মির্জা আজমসহ সাতজনের বিরুদ্ধে আনা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন। তাদের মধ্যে ছয়জন কারাগারে রয়েছেন। মির্জা আজম পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। পরবর্তী শুনানির তারিখ ২২ নভেম্বর নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
আইন-আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গ্রেপ্তারের পর আসামিকে আদালতে হাজির করা, কারাগারে পাঠানো কিংবা রিমান্ড মঞ্জুরের বিষয়টি মামলার তদন্তের অগ্রগতি, তদন্ত কর্মকর্তার আবেদন, শুনানি ও আদালতের আদেশের ওপর নির্ভর করে। তদন্তের স্বার্থে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হলে পুলিশ রিমান্ড আবেদন করে। আবার ওই পর্যায়ে রিমান্ডের প্রয়োজন না থাকলে কিংবা আদালত আবেদন মঞ্জুর না করলে আসামিকে কারাগারে পাঠানো হতে পারে।
কারাবন্দির সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য
কারা সূত্র, ট্রাইব্যুনাল-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থার তথ্য পর্যালোচনায় আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কারাবন্দির সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। কোনো হিসাবে রয়েছে ১৩১ জন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা, কোনো হিসাবে ১৯২ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি, আবার জুলাই আন্দোলন ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাবন্দির সংখ্যা ২০৩ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারা সূত্রের ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার পতনের পর বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে পাঠানো আওয়ামী লীগের ১৩১ জন ভিআইপি বা শীর্ষ পর্যায়ের নেতা রয়েছেন। তাদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, উপদেষ্টা, সচিব ও বিচারপতিরা আছেন।
কারা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এই সংখ্যা বর্তমানে কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের নয়। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারের হিসাব। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কেউ জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, কেউ অন্য মামলায় আটক রয়েছেন, আবার কারও বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।
জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলন ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০২৬ সালের জুনে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৯২ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি কারাগারে ছিলেন। তাদের মধ্যে ৩৭ জন সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী, ৪৫ জন সাবেক সংসদ সদস্য এবং ১০১ জন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। বাকি ৯ জনের পরিচয় সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি।
এর কয়েক মাস পর, ২০২৬ সালের অক্টোবরের একটি ট্রাইব্যুনাল-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই আন্দোলন ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তখন কারাগারে ছিলেন ২০৩ জন। তাদের মধ্যে ১২ জন ছিলেন শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা।
আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি থাকার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট শত শত ব্যক্তির কারাগারে থাকার কথা বলা হয়।
জাস্টিস মেকার্স বাংলাদেশ ২০২৬ সালের জুনে এক প্রতিবেদনে দাবি করে, মাত্র ১০ দিনের অভিযানে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের এক হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টে বলা হয়েছে, চলতি বছরের অক্টোবর মাসে সারাদেশে রাজনৈতিক, যৌথ ও বিশেষ অভিযানসহ বিভিন্ন অভিযানে আওয়ামী লীগের অন্তত ৩৮৪ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয় নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের পর আদালতের আদেশে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। তবে মামলার ধরন, অভিযোগের গুরুত্ব এবং তদন্তের প্রয়োজনে রিমান্ডের আবেদনও করছে পুলিশ।





